সুমন ভট্টাচার্য্য

হুগলি জেলার চুঁচুড়ায় সভা করতে গিয়ে মুকুল রায় বলেছেন কংগ্রেস -বিজেপির সঙ্গে সমদুরত্ব নীতি নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার খোয়াব দেখছেন। মুকুলের বক্তব্য, দেশের অ-কংগ্রেসী ও অ-বিজেপি দলগুলির সমর্থন নিয়ে মমতা চাইছেন ৭ আরসিআরের বাসিন্দা হতে। মুকুলের মতে মমতার সে গুড়ে বালি। একই সঙ্গে মমতার এমন অবস্থান নেওয়ার পিছনে আর একটি কারণও উঠে আসছে। রাজ্য রাজনীতির ক্ষেত্রে যা অত্যন্ত তাৎপর্যপুর্ণ।
মমতার কৌশলগত অবস্থানে যে প্রশ্নটি পাক খেয়ে উঠছে তা অবশ্য মুকুল-কেন্দ্রিক। প্রশ্নটি হল মুকুল রায়ের জুজুতেই কী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস এবং বিজেপির থেকে সম-দূরত্ব নিয়ে চলার নীতি নিয়েছেন! কারণ, তৃণমূলনেত্রী ভালই জানেন, তিনি কংগ্রেসের সঙ্গে আঁতাত করলেই পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেস নেতাদের বড় অংশ হাইকমান্ডের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে মুকুল রায়ের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নেবেন। প্রদেশ কংগ্রেসের এই বড় অংশের মধ্যে যেমন দলের রাজ্য সভাপতি অধীর চৌধুরি রয়েছেন, তেমনই কংগ্রেসের অনেক বিধায়কও আছেন। এমনিতেই তৃণমূলের মধ্যে ভাঙন ধরাতে সদা উদগ্রীব মুকুল রায় কংগ্রেসের মধ্যে এই তীব্র মমতা বিরোধী অংশকে সঙ্গে পেয়ে গেলে বাড়তি অক্সিজেন পেয়ে যাবেন। কূশলী রাজনীতিক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এটা জানেন বলেই পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে কংগ্রেস এবং বিজেপির সঙ্গে সম-দূরত্ব নীতি নিয়ে চলতে চাইছেন।
কারণ, আদোতে তৃণমূল মোটেই বিজেপি এবং কংগ্রেসের থেকে সম-দূরত্ব নিয়ে চলছে না। সাম্প্রতিকতম অতীতে ‘তিন তালাক’ বিলের ক্ষেত্রেও তৃণমূল রাজ্যসভায় কংগ্রেসের সঙ্গে হাত মিলিয়েই বিজেপির বিরোধিতা করেছে। শুধু ‘তিন তালাক’ বিলই বা কেন, রাষ্ট্রপতি বা উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও তৃণমূল তো কংগ্রেসের পাশে দাঁড়িয়েই সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে বিজেপি বিরোধী জোট গড়তে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিল। এমনকি সেই সময় এই সর্বভারতীয় বিজেপি বিরোধী জোটে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক শত্রুতা ভুলে তৃণমূলের পাশে সিপিএমও ছিল। অনেকেরই হয়তো মনে আছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে সোনিয়া গান্ধীর বাড়িতে মধ্যাহ্নভোজের আসরে রাহুল গান্ধীর পাশে যেমন বসে ছিলেন সীতারাম ইয়েচুরি, তেমনই সোনিয়ার পাশে ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে। তাহলে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে দূরত্ব রাখার নিতান্তই ছেলে ভোলানো তত্ত্ব কিনা তা সহজেই অনুমেয়।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভালই জানেন, ২০১৯ অবধি তিনি পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখলে অনেকগুলো লাভ। প্রথমত, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল বিরোধী ভোটকে বিভক্ত রাখা যাবে। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গে এবং মুর্শিদাবাদে এই রাজনৈতিক সমীকরণ তৃণমূলকে সুবিধা দিতে পারে। দ্বিতীয়ত, ২০১৯ এর আগে পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে রাজ্যে কংগ্রেসকে আসন ছাড়তে হবে। সেটা ছাড়লে পশ্চিমবঙ্গের ৪২টি আসনে তৃণমূলের হয়ে যাঁরা লড়তে ইচ্ছুক, তাঁদের সঙ্গে দলের দূরত্ব তৈরি হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, ইতিমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গ থেকে লোকসভায় তৃণমূলের ৩৪ জন সাংসদ রয়েছেন। কংগ্রেসকে সেক্ষেত্রে ক’টি আসনই বা তৃণমূল ছাড়তে পারবে? এই জটিলতা এড়াতেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে অধীর চৌধুরীদের সংসর্গ এড়িয়ে চলছেন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং রাহুল গান্ধী, দু’জনেই জানেন তাঁদের একে-অপরের হাত না ধরে উপায় নেই। কারণ, মমতা যদি পশ্চিমবঙ্গ থেকে সব ক’টি আসনও জেতেন, তাহলেও সেই ৪২টি আসন দিয়ে দিল্লিতে সরকার গঠন হবে না। মমতাকে দিল্লিতে বিজেপি বিরোধী সরকার গঠন করতে গেলে কংগ্রেসের হাত ধরতেই হবে। আর কংগ্রেসও জানে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শেষপর্যন্ত তাদের দিকে আসবেনই। তাহলে আপাতত অধীর চৌধুরীদের শান্ত রাখার জন্য রাহুল গান্ধীও বলতে পারেন, তিনি পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন না। এতে কংগ্রেসের মধ্যে যে অংশটি তীব্র মমতা বিরোধী, তাঁদের মুকুল রায়ের দিকে ঢলে পড়া কিছুদিনের জন্যে হলেও ঠেকানো যাবে। দিল্লির কংগ্রেস হাইকমান্ড মনে করছে, এই কৌশল নিয়ে চললে পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে মুকুল রায়ের নেতৃত্বাধীন বিজেপির উত্থান আপাতত ঠেকানো যাবে।
বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
https://www.youtube.com/channelhindustan
https://www.facebook.com/channelhindustan
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news