দেবক বন্দ্যোপাধ্যায়
ঈষাণিকা ভোরাই :
মমতার পরে ভবিষ্যতে দলের কাণ্ডারী হিসেবে অভিষেককে মেনে নিতে চাইছে না দল।
নেতৃত্বের উত্তরাধিকার হিসেবে ডুমুরজলার সভায় অভিষেকের নাম ঘোষণার পরেই গুঞ্জন শুরু হয়েছে দলের মধ্যে। মমতার পর কে? গত কয়েক দিনে হঠাৎ করেই এই প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে।
ডুমুরজলায় মমতা অভিষেকের সঙ্গে শুভেন্দুর নাম বলেছেন ঠিকই কিন্তু তাতে কাজের কাজ কিছু হয়নি। নেতা-কর্মীদের আর বুঝতে বাকি নেই যে শুভেন্দুর নাম বলাটা নেহাতই চক্ষুলজ্জা। অন্তত দলের যে সব নেতা-কর্মীরা মুখ খুলছেন তারা এভাবেই ক্ষোভ দেখাচ্ছেন। তাদের বক্তব্য, শুভেম্দুকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান দেওয়ার থাকলে অনেকদিন আগেই দেওয়া হত! দলের মধ্যে গুমরে ওঠা ক্ষোভ আঁচ করে নিতে অবশ্য দেরি করেন নি মমতা।
২ তারিখ ডুমুরজলায় ছাত্র-যুব সমাবেশের মঞ্চে তৃণমূল নেত্রীর ইঙ্গিতেই মোটামুটি স্পষ্ট হয়ে যায় দলে ভাইপোর স্থান ঠিক কোথায়! তৃণমূলের প্রথম সারির অনেকেই ক্ষুব্ধ হন দলনেত্রীর এই ঘোষণায়। তবে মুখ ফুটে সে কথা প্রকাশ্যে বলার সাহস করে উঠতে পারেননি কেউই। সুত্রের খবর দলের এই অভ্যন্তরীণ অসন্তোষের খবর যথাসময়েই পৌঁছায় তৃণমূলনেত্রীর কানে। মুকুলের বিজেপি যাত্রার পরে এখন যে ধরণের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাতে কোনও রিস্ক নিতে চাননি মমতা। সোমবার শিলিগুড়ির কাঞ্চনজঙ্ঘা স্টেডিয়ামে উত্তরবঙ্গ ছাত্র যুব সম্মেলনের মঞ্চে নিজেই ঢোঁক গেলেন দলনেত্রী। জানিয়ে দেন, “তৃণমূল কংগ্রেস একটা যৌথ পরিবার। এখানে একা কেউ নেতৃত্ব দেয় না, জেলা সভাপতি ব্লক সভাপতিরাও নেতৃত্ব দেয়”। তবে যখনই কাউকে খাটো করে দেখানোর বা কাউকে সংবাদমাধ্যমের সামনে হেয় করার প্রয়োজন হয়েছে, তখনই এইসব ব্লক সভাপতিদের তুলনা টেনে এনেছেন মমতা। কখনও গৌতম দেব, কখনও লক্ষণ শেঠ বা সম্প্রতি রাজ্যপাল। কাউকে হেয় করার জন্যে মমতার কাছে সব সময় তৈরি থেকেছে তুলনা, সেই তুলনাটি হলেন সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রেখে চলা ব্লক সভাপতি। প্রশ্ন উঠছে, নিচুতলার নেতা-কর্মীরা যদি সম্পদই হবে তাহলে এতদিন কথায় কথায় তাদের ছোট প্রতিপন্ন করলেন কেন সুপ্রীমো! মমতা এদিনও বলেছেন, “কর্মীরাই দলের সম্পদ। তারাই দলকে এগিয়ে নিয়ে যায়।” শুধু নিজে নয়, অভিষেককে দিয়েও বলিয়েছেন তিনি। অভিষেক বলেছেন, “আমাদের দলে ২, ৩, ৪ নম্বর বলে কিছু হয়না। প্রথম আসনটিতে রয়েছেন দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আর তারপরেই রয়েছেন আপনারা অর্থাৎ কর্মীরা”।
যদিও এই ধরণের কথার কোনও সারবত্তা খুঁজে পাচ্ছেন না দলীয় কর্মীরা। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় তাঁরা দেখেছেন, দল ক্ষমতায় আসার পর এক শ্রেণীর নেতা-কর্মীর জীবন যাপনের মান রকেটের মত উর্দ্ধমুখী, আর এক শ্রেণী, যাঁরা সর্বস্ব দিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসকে আজকের অবস্থায় এনেছে, তারা যে তিমিরে ছিল এখনও সেই তিমিরেই! এই ভাবেই আক্ষেপ করছেন হুগলি, হাওড়া, দুই ২৪ পরগণার বহু কর্মী, নিচু তলার নেতা। তাঁরা প্রশ্ন তুলছেন, কর্মীরা সম্পদ নাকি এক শ্রেণীর নেতা-নেত্রীর সম্পদ বৃদ্ধি করার নিমিত্ত দাবার বোড়ে!
অন্যদিকে প্রশ্ন উঠছে অভিষেককে কেন মেনে নিতে পারছে না দল? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত আত্মপ্রত্যয়ী নেত্রীকে কেন নিজের কথা নিজেকেই ফিরিয়ে নিতে এল! তা’ও আবার নিজেরই দলের মধ্যে!
ডুমুরজলার সভায়, যে সভায় মমতা নিজের উত্তরাধিকার ঘোষণা করেছেন, সেই সভাতেই মমতা এমন কিছু কথা বলেছেন যার মধ্যে সম্ভবত এই প্রশ্নগুলির উত্তর রয়েছে।
মমতা বলেছেন, কর্মীদের মধ্যে থেকেই নেতা জন্মায়। কর্মীরা প্রশ্ন করছেন, অভিষেক কর্মী ছিলেন কবে! অভিষেক আক্ষরিক অর্থেই আকাশ থেকে টপকে পড়া নেতা। চাপিয়ে দেওয়া নেতা। ইন্দিরা গান্ধিকেও ধাপে ধাপে ছোট থেকে বড় বিভিন্ন নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা দিতে দিতে তৈরি করেছিলেন নেহরু। রাহুলকেও সাধারণ সম্পাদক হয়ে কংগ্রেসে কেরিয়ার শুরু করতে হয়েছে। নেহরু বলতেন, কেউ কেউ জন্ম থেকেই মহান হন, কেউ মহত্ব অর্জন করেন, আর এমনও কেউ আছেন যাদের মাথায় মহত্ব চাপিয়ে দেওয়া হয়। অভিষেককে এই তিন নম্বর দলেই ফেলছে মমতাকে বাদ দিলে যে দলটা পড়ে থাকে সেই তৃণমূল কংগ্রেস। তবে মমতা যেহেতু প্রবল, প্রবলতরভাবে দলে বিরাজ করছেন তাই এখনও কেউ মুখ খুলছে না। তবে মুখ না খুললেও নেতা-কর্মীদের উষ্মার তেজই এত প্রখর যে মমতাকে ঢোঁক গিলে নিজের কথা ফেরাতে হল। ‘কর্মীরাই ভবিয্যৎ’ জাতীয় স্তোকবাক্য যে এখন আর বাংলা সিনেমাতেও চলে না তা কর্মীরাও জানেন।
মুকুল রায় দল ছাড়ার পর অনেকগুলি কোর কমিটি বা বর্ধিত কোর কমিটির বৈঠক হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে তবু মমতা কেন বুঝতে পারলেন না এমন একটি ঘোষণা করার সঠিক সময় এটা নয়!
মুকুল দল ছাড়ার পর একটি অতি নীরব বিপ্লবও সম্ভবত হয়ে গেল দলের মধ্যে।
যেখানে নেতা-কর্মীদের চাপে মমতাকে নিজের কথা নিজেকেই গিলে ফেলতে হল।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news