পার্থসারথি পাণ্ডা:
শিবের পুজোয় কেমন করে বেলপাতা এলো এবং তা কেমন করে শিবের প্রিয় হয়ে উঠল, তার একটি আশ্চর্য উপাখ্যান শিবপুরাণে আছে। সেই উপাখ্যান শুরুর আগে এই পুরাণে শিবের প্রিয় ফুলদলের নামকীর্তন করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, শ্বেতকরবী, শেফালি, কুন্দ, মল্লিকা, চাঁপা, শিরীষ, নাগকেশর, মুচুকুন্দ, টগর, বজ্রপুষ্প, ধুতরো আর পদ্ম হল শিবের প্রিয় ফুল। তবে এদের মধ্যে তাঁর সবচেয়ে বেশি প্রিয় হল, পদ্ম। কিন্তু পুজোর অর্ঘ্যে যদি কোন ফুল নাও থাকে, তখন শুধুমাত্র একটি বেলপাতা দিয়ে যদি কোন ভক্ত তাঁকে পুজো করেন, তাতেই পরম তুষ্ট হন আশুতোষ শিব। বেলপত্র তাঁর কাছে সমস্ত পুষ্পের চেয়ে, অর্ঘ্যের চেয়ে প্রিয়। এবার বলি শিবপ্রিয় এই পত্রের জন্মকথা…
বৈকুণ্ঠে সেদিন লক্ষ্মীদেবীর মন বড় উতলা হয়ে উঠেছিল। কেন জানি না, বার বার তাঁর একটা কথাই মনে জাগছিল যে, তিনি তো সবসময় স্বামীর সঙ্গেই থাকেন, স্বামী ছাড়া আর কিছুই জানেন না, স্বামীও তাঁকে ভালোবাসেন ঠিকই, তবুও তিনি কি তাঁর সবচেয়ে প্রিয় হয়ে উঠতে পেরেছেন? উতলা মনের সেই ওঠাপড়া নিয়ে তিনি স্বামীর কাছে এলেন, অনন্ত শয্যায় শায়িত বিষ্ণুর পায়ের কাছটিতে বসে পদসেবা করতে শুরু করলেন। পায়ে স্পর্শ পেয়ে বিষ্ণু চোখ খুললেন। চোখ পড়ল লক্ষ্মীর চিন্তাছন্ন মুখের দিকে। তখন তিনি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কিসের চিন্তায় তুমি কষ্ট পাচ্ছ লক্ষ্মী, আমায় খুলে বলো।’
সামান্য দ্বিধায় একটু ইতস্তত করে লক্ষ্মী বললেন, ‘স্বামী আমি জানি আপনি আমায় খুবই ভালোবাসেন। কিন্তু আজ কেন জানি না আমার মন উচাটন হয়েছে, কেবলই মনে হচ্ছে, আর সকলের চেয়ে, সবকিছুর ওপরে আমি কি আপনার সবচেয়ে প্রিয় হতে পেরেছি?’
লক্ষ্মীর কথা শুনে বিষ্ণুর ঠোঁটে ফুটে উঠল পরিচিত সেই স্মিতমধুর হাসি। লক্ষ্মীকে বললেন, ‘মানুষের কাছে প্রাণ যেমন প্রিয়, তুমি আমার কাছে ততটাই প্রিয় লক্ষ্মী। কিন্তু সত্যি বলতে কি, সবার চেয়ে সবকিছুর ওপরে প্রিয় যদি কেউ হন, তিনি হলেন একমাত্র সত্যসুন্দর শিব। তাঁকে যারা ভক্তিভরে পুজো করেন, তাঁরাও আমার কাছে শিবের সমান প্রিয় হন।’
বিষ্ণুর কথা শুনে মাথা নীচু করে লক্ষ্মী কয়েক মুহূর্ত মৌন হয়ে রইলেন, তারপর ছলছল চোখ দুটি তুলে স্বামীকে বললেন, ‘আমি তেমনই এক শিবভক্ত হতে চাই প্রভু, যেমন ভক্ত হলে আমি আপনার সবচেয়ে প্রিয় হতে পারি। আপনি আমায় পথ দেখান স্বামী, বলে দিন কোন ফুলে, কোন মন্ত্রে তুষ্ট হন মহাদেব।’ তখন বিষ্ণু আলতো হাতে লক্ষ্মীর ছলছল চোখ দুটি মুছিয়ে দিলেন। তারপর কানে দিলেন শিবের প্রিয় পঞ্চাক্ষর মন্ত্র ‘নমঃ শিবায়’, আর পুজোর জন্য চয়ন করতে বললেন প্রস্ফূটিত পদ্ম।
বিষ্ণুর নির্দেশে বৈকুণ্ঠে স্বয়ং লক্ষ্মী সোনা দিয়ে নির্মাণ করলেন শিবের লিঙ্গরূপ। রত্নময় মন্দির গড়ে সেই শিবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করলেন। তারপর শুরু করলেন আরাধ্য দেবতা শিবের নিত্যপুজো।
প্রতিদিন সকালে লক্ষ্মী সরোবরে গিয়ে নিজের হাতে চয়ন করেন প্রস্ফূটিত পদ্ম। তারপর পবিত্র গঙ্গার জলে পরম নিষ্ঠায় সেই পদ্মগুলি ধুয়ে, সেগুলো গুণতে বসেন। পর পর তিনবার গুণে পুজোর থালায় সাজিয়ে নেন একশোটি পদ্ম, তার থেকে একটি কম না, বেশিও না। সেই একশো পদ্মের অর্ঘ্য দিয়ে চলতে লাগল বিষ্ণুঘরনী লক্ষ্মীর নিত্য শিব পুজো। এভাবেই কেটে গেল পুরো একটা বছর। এলো বৈশাখ মাস।
সেদিন বৈশাখের শুক্লপক্ষের তৃতীয়া। প্রতিদিনের মতো পদ্ম চয়ন করে, ধুয়ে, গুণে, থালায় সাজিয়ে পুজোয় বসেছেন লক্ষ্মী। তাঁর চোখ বন্ধ, তিনি ধ্যানস্থ। সেই সুযোগে ভক্তকে পরীক্ষা করার জন্য শিব পুজোর থালা থেকে দুটি পদ্ম হরণ করে নিলেন। ধ্যানের পর লক্ষ্মী যখন অঞ্জলি দিতে শুরু করলেন, তখন হঠাত তাঁর চোখে পড়ল পুরো একশোটি পদ্ম তো নেই। দুটি পদ্ম কম রয়েছে। ইস, পুজোয় বসার আগে গণনায় এতবড় ভুল হয়ে গেল! এখন পুজো সম্পূর্ণ হবে কি করে! কাউকে আরও দুটি পদ্ম সরোবর থেকে আনতে বলবেন নাকি? তাই বা কি করে হয়, নিজের হাতে চয়ন করা পুষ্পে পুজোর যে ব্রত শুরু করেছেন, তা ভঙ্গ করবেন কি করে? আবার পুজোর মাঝে নিজের আসন ছেড়ে পুষ্প চয়ন করতে গেলেও তো শিবের অপমান হবে! এখন উপায়? ব্যাকুল লক্ষ্মী যখন কোনদিকেই কোন দিশা খুঁজে পাচ্ছেন না, তখন তাঁর মনে পড়ে গেল বিষ্ণুর একটি কথা। তিনি একবার লক্ষ্মীর স্তন দুটিকে তুলনা করেছিলেন যুগল পদ্মের সঙ্গে। ভগবান বিষ্ণুর কথা কখনও মিথ্যে হয় না। তাই সেই পদ্মসদৃশ স্তনদ্বয় উৎসর্গ করেই পুজো সম্পূর্ণ করতে চাইলেন লক্ষ্মী এবং তক্ষুনি বাম স্তন কেটে অঞ্জলি দিলেন শিবকে। তাঁর এই বলিদান দেখে শিবের খুব অনুশোচনা হল। মনে হল, পদ্ম দুটি হরণ না করলেই ভালো হত! তাই, ভক্তের প্রসন্নতা নিয়ে লক্ষ্মী যখন তাঁর ডান স্তন কাটতে উদ্যত হলেন তখন মহাদেব আর চুপ করে থাকতে পারলেন না, সম্মুখে আবির্ভূত হয়ে সেকাজে বাধা দিলেন তাঁকে। বললেন,‘মা গো, আমি আশুতোষ শিব, আমি অল্পেই তুষ্ট হই মা। তোমার স্ত্রীঅঙ্গ ছেদন করে আমায় তুমি অনুতপ্ত করেছ। প্রসন্নও করেছ। বল মা, তুমি কি বর প্রত্যাশা কর?’
লক্ষ্মী শিবকে স্তবে তুষ্ট করে বললেন, ‘হে ভগবান, দিতে হলে, আমায় এই বর দিন, যাতে আমি আমার স্বামীর সবচেয়ে প্রিয় হতে পারি।’
শিব তখন মৃদু হেসে বললেন, ‘তাই হবে, মা। আমার আশীর্বাদে তোমার অঙ্গও তুমি ফিরে পাবে। তবে, তোমার বলিদানের কথা কেউ কোনদিন ভুলতে পারবে না। কারণ, তোমার ঐ অঙ্গ থেকে ধরায় জন্ম হবে ‘বেল’ নামক বৃক্ষের। তার পত্র হবে আমার ত্রিনয়ন। তার ফল হবে তোমার অঙ্গের অনুরূপ। তোমার ‘শ্রী’ নাম স্মরণ করে লোকে এই বৃক্ষকেও ‘শ্রী’ বলে ডাকবে, আর তার পাতাকে বলবে ‘শ্রীপত্র’, ফলকে বলবে ‘শ্রীফল’। যতদিন ধরায় চন্দ্র-সূর্য থাকবে, এই বৃক্ষও ততদিন থাকবে। এর পত্রে পূজা পেয়ে আমি হব পরম তুষ্ট।’
শিবের অনুগ্রহে সেই বৈশাখের তৃতীয়া তিথিতে পত্রপুষ্প ও ফল সহ বেলবৃক্ষের জন্ম হল মর্ত্যে, হয়ে উঠল শিব পূজার অচ্ছেদ্য অর্ঘ্য।
বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
https://www.youtube.com/channelhindustan
https://www.facebook.com/channelhindustan
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news