পার্থসারথি পাণ্ডা:
দুই যুদ্ধদ্যোত ভক্তকে থামিয়ে দিতে দৈববানী হল। ভূমণ্ডল গমগমিয়ে উঠল দেবকণ্ঠে। নীলমাধব বললেন, হে বিশ্বাবসু, তুমি দুঃখ পেও না, তোমার আবাস ছেড়ে যাবার কাল এসে গেছে, নবরূপে জগতে আমার আবির্ভাবের কাল এসেছে। তুমি আমার বর্তমান স্বরূপ রাজাকে সমর্পণ কর। আমি তোমার আবাস ছেড়ে যাচ্ছি বটে, তোমাদের ছেড়ে যাচ্ছি না। তোমার কন্যা ললিতা ও বিদ্যাপতির সন্তানেরা আমার সেবা করবে চিরকাল।
তারপর রাজাকে আদেশ দিলেন নীলমাধবকে নবরূপে দারুমূর্তির মধ্যে প্রতিষ্ঠা করে পুজো করতে। দেবতার আদেশ ভক্তেরা মানবেন না, এ তো হয় না। ফলে, বিশ্বাবসু চোখের জল ফেলতে ফেলতে প্রাণের ঠাকুর তুলে দিলেন রাজার হাতে। তখন মহাসমারোহে রাজা ফিরলেন রাজ্যে। বিদ্যাপতি সঙ্গে নিয়ে এলেন ললিতাকে।
ইন্দ্রদ্যুম্ন রাজ্যে ফিরতেই নীলমাধবের ইচ্ছায় সমুদ্রে ভেসে এলো কাঠ। রাজা সেই কাঠ নিয়ে এলেন ঘরে। কিন্তু তা দিয়ে বিষ্ণুর নবরূপ খোদাই করতে পারেন, এমন শিল্পী কাউকে পেলেন না তিনি। হতাশ হয়ে রাজা যখন হাপিত্যেশ করছেন, তখন বিষ্ণুর আদেশে স্বয়ং বিশ্বকর্মা স্বর্গ থেকে নেমে এলেন। সাধারণ এক ছুতোরের বেশে রাজার কাছে এসে তিনি রাজাকে আশ্বস্ত করলেন যে, ভগবান বিষ্ণুর এমন অপূর্ব রূপ তিনি ফুটিয়ে তুলবেন যা কেউ কখনো দেখেননি। তবে তাঁর একটাই শর্ত, মূর্তি নির্মাণ শেষ হওয়ার আগে অব্দি তিনি থাকবেন একটি বন্ধ কক্ষে, ভুল করেও কেউ সেখানে আসতে পারবেন না। কেউএলেই তিনি মূর্তি নির্মাণের কাজ ছেড়ে তক্ষুনি চলে যাবেন। রাজা কি আর করেন, মেনে নিলেন তাঁর শর্ত।
বিশ্বকর্মা ঘরের দরজা ভেজিয়ে শুরু করলেন মূর্তি নির্মাণের কাজ। ঘরের বাইরে ভেসে আসতে লাগল অবিরাম ছেনি হাতুড়ির ঠুকঠুক আওয়াজ। কিন্তু একদিন হঠাত্ করে সেই আওয়াজ গেল থেমে। রাজা ভাবলেন, রানি ভাবলেন, ব্যাপারটা কী? মূর্তি তৈরি কি তাহলে সম্পুর্ণ? তেমন হলে কথামতো ছুতোর তো এসে খবর দিত! তাহলে কি লোকটা অসুস্থ হয়ে পড়ল! এমন ভাবনা হতেই প্রবল উচাটন হয়ে উঠল মন। অমনি দরজা খুলে দেখতে গেলেন ব্যাপারখানা কি, আর তখনই ঘটে গেল অঘটন। ছুতোর চোখের সামনেই অদৃশ্য হয়ে গেলেন। ঘরের মধ্যে রয়ে গেল শুধু তিনটি মূর্তি। হাত নেই পা নেই আবক্ষ ঈশ্বর। জগন্নাথ, বলদেব আর সুভদ্রা। কিন্তু ছুতোর শিল্পী রচনা করে গেছেন তাঁদের অপূর্ব মোহময় চোখ, সে চোখের দিকে তাকিয়ে আশ যেন মেটে না। মনে হয় ব্রহ্মাণ্ডের অপার রূপ আর রহস্যময়তা ধরা পড়েছে তাতে, অপলক চেয়েও সে রহস্যের ঘোর যেন কিছুতেই কাটে না। রাজারানি বুঝলেন এই অনন্য রূপ ও কলেবরেই ভগবান আবির্ভূত হতে চেয়েছিলেন, এও তাঁরই লীলা।
মন্দিরের রত্নবেদীতে সুভদ্রা, বলরাম আর প্রিয় সুদর্শনকে সঙ্গে নিয়ে জগন্নাথ নাম ধারণ করে দারুব্রহ্ম নারায়ণ অধিষ্ঠিত হলেন। এখানে দেবতা একা নন কিংবা তাঁর বামে হ্লাদিনীও নেই। আছেন কেবল ভাই আর বোন। জগতের নাথ এখানে এইভাবে পারিবারিক সৌভ্রাতৃত্বের উদাহরণ রেখে জগৎসংসারকে শিক্ষা দিলেন। একমাত্র মা দুর্গার আবাহনকাল ছাড়া পরিবার প্রীতির মধ্য দিয়ে বিশ্বপ্রেমের এমন বার্তা আর কোন দেবতার পুজোর সময় আমরা পাইনা।
কালের উপাখ্যানে তিনি যেমন নিছক শবরদের দেবতা হয়ে থাকেননি, তেমনি শুধুই হিন্দুদের দেবতা হয়েও থাকেননি। এমন জগতের নাথ কি ব্যক্তি, সম্প্রদায়, ধর্ম বিশেষের দেবতা হয়ে থাকতে পারেন! তাই বৌদ্ধ অভ্যুত্থানের সময় আদি বুদ্ধ, জৈনদের কাছে আদি তীর্থঙ্কর ঋষভদেব, শাক্তদের কাছে দক্ষিণাকালী, ব্রহ্মবাদীদের কাছে দারুব্রহ্ম, বৈষ্ণবদের কাছে গোলকবিহারী, তন্ত্রসাধকের কাছে ভৈরব—বিভিন্ন সময়ে নানান নামে নানান উপাচারে পূজিত হয়েছেন তিনি। এখনও হন। তাই তাঁর পূজামন্ত্রে আছে সমস্ত ধর্মের অনুষঙ্গ, পূজায় নানান ধর্মের আচার। এভাবেই একইরূপে একইসঙ্গে নানান ধর্মের মানুষের নাথ হয়ে উঠেছেন জগন্নাথ। এমনকি মন্দির কমিটির অনুশাসনে যে সব ধর্ম বা শ্রেণীর মানুষ মন্দিরে প্রবেশের অধিকার পান না, রথযাত্রার সময় তিনি পথে নেমে তাদের দর্শন আর স্পর্শ দিয়ে তাদের ধন্য করে নিজেও ধন্য হতে চান। তাদেরই একজন হয়ে উঠতে চান। বুঝিয়ে দিতে চান ঈশ্বরের পথে সবাই সমান, তাঁর কাছে আসার কোন অনুশাসন নেই, থাকতে পারে না। সমস্তটাই মানুষের বানানো। এখানেই লুকিয়ে আছে প্রভু জগন্নাথের পবিত্র রথযাত্রার মহান তাৎপর্য।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news