রণবীর ভট্টাচার্য :
বছর শুরুতে অনেকে হয়তো ভেবেছিলেন যে এবার রবীন্দ্রজয়ন্তীতে রোদ্দুর রায়কে যথার্থ জবাব দেওয়া যাবে। কিংবা ইউডেমিতে রবীন্দ্রসংগীতের উপর কোন কোর্স শুরু করবেন। কিন্তু ওপরওয়ালার প্ল্যান ছিল একদম অন্যরকম। তাই ঘরে মোবাইলমুখী হয়ে কপালে অজস্র করোনা ক্লান্ত বলিরেখা নিয়ে বসে থাকা ছাড়া সত্যি উপায় নেই। রবি ঠাকুর চলে যাওয়ার পর এরকম কোন রবীন্দ্রজয়ন্তী সত্যি ঘরবন্দি উদযাপন হয়নি। যদিও অনেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় কবিতা, গানের ডালি, চিঠির পাতা নিয়ে আহবান জানিয়েছেন, তবু এবারের যেন বাঁশিতে সুর নেই, পাড়ায় কোন মঞ্চ তৈরি হয়নি, বা জীবনে প্রথম বারের মত কেউ শাড়ি বা পাঞ্জাবী – পায়জামা পড়েনি।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিঃসন্দেহে সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলেন। কয়েক সপ্তাহ আগে যখন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী পঞ্চাশের অধিক দেশকে ওষুধ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তখন অনেকেই সমালোচনা করেছিলেন। যদি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আন্তর্জাতিকতাবাদ নিয়ে ভাবা যায়, বা কিঞ্চিৎ আলোকপাত করা যায়, তাহলে হয়তো এর ব্যাখ্যা করা সম্ভব। কিন্তু তাহলে বর্তমান সরকারের জাতীয়তাবাদ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। আজ বেঁচে থাকলে, এই করোনায় রবি ঠাকুর কি উপদেশ দিতেন? ভুললে চলবে না, বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সময় রবি ঠাকুর বিদেশী দ্রব্য বর্জন করার ডাক দিয়েছিলেন। আজ যদি আমরা চৈনিক দ্রব্য ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সংযম দেখাতে পারি ও সরকার কর্তৃক দেশীয় অর্থনীতির জন্যে সুচারু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাহলে করোনা পরবর্তী সময়ে দেশের ভাগ্যের চাকা বদলাতেই পারে বা আশাবাদী হওয়া যায়।
দেশীয় শিক্ষার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভূমিকা যে অনস্বীকার্য, তা বলাই বাহুল্য। তবে সাম্প্রতিক অতীতে শান্তিনিকেতনের আচার্য ও সমাবর্তন নিয়ে যে বিভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খলা হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে অনভিপ্রেত। তবে অনলাইন শিক্ষা যদি সাবেক শান্তিনিকেতনের মত শিক্ষা গ্রহণে স্বাধীনতা ও শিক্ষার চেতনা দিতে পারে, তা বেশ নতুন তো হবেই। শ্রীনিকেতনের মডেল আজকের মত ব্যবসায় কাজে লাগানো যায় কিনা তাও ভেবে দেখার মতো। এক্ষেত্রে রবি ঠাকুরের একদমই সমসাময়িক আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের ব্যবসা সম্পর্কিত ভাবনা চিন্তা বাঙালির ব্যবসা বিমুখতা কাটাতে অনুপ্রেরণা দিতে পারে। দেশীয় একতা ও বহুত্ববাদের কথা নিয়ে যদি আলোচনা হয়, তাহলে ভুলে গেলে চলবে না, রবি ঠাকুরের আশীর্বাদেই কিংবদন্তি সৈয়দ মুজতবা আলী তার শিক্ষা সম্পন্ন করেছিলেন এই শান্তিনিকেতনের প্রাঙ্গণে, এমনকি তিনি ১৮টি ভাষা শিখে ছিলেন শান্তিনিকেতনের তৎকালীন শিক্ষা কাঠামোতে।
রবি ঠাকুর সবার। এই সর্বজনগ্রাহীতা ট্রাম্প, ইমরান, পুতিনের জমানায় সত্যিই যেন অমিল। কিন্তু কোথাও যেন মানুষ আবার আশা দেখছে শিল্প সান্নিধ্য নিয়ে আর ঘিরে রয়েছে রবীন্দ্র-আলোক। তাই রবি ঠাকুরদের কখনো দরকার হয় না বড় মূর্তি কিংবা মাংসপেশীর আস্ফালন, ওগুলো স্রেফ দরকার হয় অজস্র মিমওয়ালা রোদ্দুর রায়দের। এখানেই বোধহয় ভারততীর্থের শেষ প্রান্তে যুগ যুগ ধরে উদযাপিত হয়ে আসা রবীন্দ্রজয়ন্তীর তাৎপর্য।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news