Breaking News
Home / TRENDING / লকডাউনে পঁচিশে বৈশাখ

লকডাউনে পঁচিশে বৈশাখ

গৌতম কুলসী :

(স্ত্রী মৃণালিনী দেবীকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এক কাল্পনিক চিঠি)

ভাই ছোটবউ-

বহুদিন পর চিঠি লিখছি বলে কিছু মনে করো না যেন। আসলে কিছু কথা তোমায় না জানালেই নয়। জানাবার অবকাশ যদি আর না আসে তাই চিঠিতেই জানিয়ে দিতে চাই। তুমি তো জানোই যে বৈশাখ মাসে আমাকে একবার বঙ্গ ভূমিতে যেতে হয়। ডিসেম্বরে যেমন সান্তা যায় অনেকটা সেরকমই। বৈশাখ মাসে বাঙালিরও তীব্র বাংলা ভাষা পায়। একে পইলা বৈশাখ, বাংলা নতুন বছরের শুরু তার উপর পঁচিশে বৈশাখ আমার জন্মদিন। এসময় আমার না গিয়ে উপায় আছে! লেজেন্ড হলে যা হয় আর কী! দেহতরী তো কবেই ডুবেছে। মনতরী এখনও উজান বেয়ে যায়। তোমাদের অবশ্য এরম আসা যাওয়ার ঝামেলা সহ্য করতে হয় না। তোমরা মারা গিয়ে বেঁচে গেছ। আর আমি মরেও বেঁচে আছি। কেন যে কবিতা লেখার পাগলামি চেপে বসেছিল মাথায়! কবিত্ব আর সংসার এই দুটোর মধ্যে বনিবনা আর কিছুতেই হয়ে উঠল না দেখছি।

যাক গে, এ বছর আমার বং ট্রিপটা বাতিল না করতে হয়! করোনা নামের এক ভাইরাস এমন গোল বাঁধিয়েছে যে দেশজুড়ে লকডাউন চলছে। এই লকডাউনের মাঝে রবিপ্রণাম কতটুকু সফল হবে তা বলতে পারি না। আয়োজকদের তরফ থেকে এখন অব্দি এসে পৌঁছোয়নি কোন নিমন্ত্রণ পত্র। আমিও নিশ্চিত করে কাটতে পারছি না টিকিট। তুমি হয়ত ভাববে, সে আবার কেমন ভাইরাস যার জন্য লকডাউন লেগে যায় দেশে! তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে যে, শান্তিনিকেতনে আমাদের ইস্কুলেও একবার ইনফ্লুয়েঞ্জা হানা দিয়েছিল। সেই সময় তেউরি, নিম, গুলঞ্চ, নিশিন্দা এবং থানকুনি বেটে ভেষজ প্রতিষেধক ‘পঞ্চতিক্ত পাঁচন’ তৈরি করেছিলাম আর প্রত্যেক আশ্রমবাসীকে নিয়মিত খাওয়াতাম। এই করোনা ভাইরাস ইনফ্লুয়েঞ্জার থেকে আরও ভয়ানক, আরও ছোঁয়াচে। অতিমারি এই করোনা ভাইরাসের এখন অব্দি না আছে সেরম ওষুধ না আছে প্রতিকার। সে কারনেই সকলে আরো বেশি চিন্তিত। তুমি অবশ্য এ নিয়ে অযথা চিন্তা করো না। একান্তই যদি পঁচিশে বৈশাখ বাংলায় আসতেই হয় তো ভাবছি নিজের তৈরী করা পাঁচন খেয়েই যাব। এ পথ্য করোনা ভাইরাসের সঙ্গে কিছুটা লড়াই করবে বলেই আমার ধারনা। কবিরাজ না হলেও রাজকবি তো আমি বটে।

Mrinalini Devi - Wikipedia

পরিস্থিতি যে সবসময় অনুকূলে যাবে এমনটা তো নাও হতে পারে ছুটি। প্রতিকূল পরিবেশে প্রাণপণে নিজের কর্তব্য করে যাওয়া ছাড়া মানুষের কিইবা করার আছে। আশা করি সারা পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা মিলে কিছুদিনের মধ্যেই আবিষ্কার করবে করোনা ভাইরাসের প্রতিষেধক।

তোমার মনে থাকার কথা আইফেল টাওয়ার থেকেও তোমায় একটা চিঠি পাঠিয়েছিলাম। এই লকডাউনে বসে তোমায় চিঠি লিখব না তা হয় নাকি! দূরে থাকার প্রধান সুখ হচ্ছে চিঠি- দেখাশোনার সুখের চেয়েও তার একটু বিশেষত্ব আছে। জিনিসটা অল্প বলে তার দামও বেশি। জানো, লকডাউনে কিছু জরুরী পরিষেবা ছাড়া অফিস কাছারি সব বন্ধ। রাস্তাঘাট শুনশান। বাড়ির বাইরে বের হচ্ছে না কেউ। সকলের এখন ডাকঘরের অমলের মত গৃহবন্দি দশা। দিনরাত কেবল একই জায়গায় বসে থাকতে হয়। ডাক্তার যে তাদের বাইরে যেতে বারণ করেছে। খুব দরকারে বাইরে বের হলে মুখে মাস্ক পরে বেরোতে হচ্ছে। বাড়িতে ফিরে বারবার সাবান দিয়ে হাত ধুতে হচ্ছে। অন্যদিকে, কল কারখানা বন্ধ তাই দূষণ গেছে কমে। বহুদিন পর মানুষ আবার পাখির ডাক শুনছে, চোখ মেলে দেখছে নীল আকাশ। গৃহবন্দি মানুষ ফেরিওয়ালার ডাক শুনছে। বেশি পেতে অভ্যস্ত মানুষ কম পেয়েও দিব্যি চালিয়ে নিচ্ছে। লাগামছাড়া বেহিসেবী মানুষ রাশ টানছে, হিসেব কষছে। সব থেকে বড় কথা, মানুষে মানুষে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হচ্ছে। হ্যাঁ, সামাজিক দূরত্ব, এই শব্দ বন্ধনী আমার কাছেও পরিচিত ছিল না ছুটি। এখন বুঝতে পারছি এর মানে। এই পরিস্থিতিতে “বাঁধিনু যে রাখী পরানে তোমার” বলে গান গাওয়া গেলেও “আয় তবে সহচরী, হাতে হাতে ধরি ধরি” করে নাচার অনুমতি প্রশাসন এখন দেবে না।

Mrinalini Devi - Wikipedia

তোমার নিশ্চয়ই জানতে ইচ্ছে করছে যে এই অদ্ভুত লকডাউনের মাঝে পঁচিশে বৈশাখ উদযাপন হবে কীভাবে। এ নিয়ে আমার নিজেরই যে কৌতুহল একদম হচ্ছে না তেমনটা নয়। যদি পঁচিশে বৈশাখের কথায় ধরো, বছরের এই একটা দিনই বাঙালি একটু আধটু রবিপূজো করে। দু তিনদিন আগে থেকে স্কুল পড়ুয়ারা আমার লেখা কবিতা আবৃত্তি রেওয়াজ করে, “আজি এ প্রভাতে রবির কর/ কেমনে পশিল প্রাণের পর”। নতুন নতুন বাংলা শব্দ শেখে তারা। কচি কাঁচারা আলতো আলতো স্বরে আবৃত্তি করে, “মনে করো, যেন বিদেশ ঘুরে/ মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে।/ তুমি যাচ্ছ পালকিতে, মা চ’ড়ে,/ দরজা দুটো একটুকু ফাঁক ক’রে”। বেশ লাগে আমার শুনতে! তাদের ছোঁয়ায় গীতাঞ্জলী গীতবিতান আবার যেন প্রান ফিরে পায়। এই একটা দিনই বাঙালি আমার লেখাতে চোখ বোলায়। আলমারি থেকে ইস্তিরি করা পাঞ্জাবি, তাঁতের শাড়ি বের হয়। ড্রয়ার থেকে মাটির গহনা বের হয়। শ্যাম্পু করা রেশমি খোলা চুল। সমবেত গান গায়, “হে নূতন, দেখা দিক আর-বার জন্মের প্রথম শুভক্ষণ”। এই একটা দিনই আমি কতটা প্রাসঙ্গিক তার বিতর্ক সভা বসে। আমায় নিয়ে আলোচনা হয়। টিভিতে নানান প্রোগ্রাম থাকে। কার না ভাল লাগে বল!

Forum

তারপর তো আবার ধুলো পড়তে শুরু করবে গীতাঞ্জলী গীতবিতানে। রবীন্দ্ররচনাবলী শোকেসে বন্দি হয়ে শোভা পাবে বাঙালির ড্রইং রুমে। ছেলে মেয়েরা বাংলা কম জানলে আবারও গর্বে বুক ভরে উঠবে বাবা মায়ের। শপিং মল মেট্রো রেস্তরাঁতে বাংলার সাথে মিশে যাবে হিন্দী ভাষা। শুনলাম, ফ্ল্যাট সাজাবার উপকরণ হিসেবে আমার লেখা বই গুলোর নাকি কলেজস্ট্রিটে এখনও খুব কাটতি। তুমি শুনলে অবাক হবে, এ বছর শান্তিনিকেতনে দোল খেলা বন্ধ ছিল। বন্ধ ছিল প্রভাত ফেরি। কেউ গায়নি, “ওরে গৃহবাসী, খোল দ্বার খোল, লাগল যে দোল”। “স্থলে জলে বনতলে” লাগেনি দোল। মানুষের মন থেকেই যে রঙ সরে গেছে! রবি তো এখন অস্তাচলে। চাঁদ যে ভাবে গগনে উঠছে, রবিকে অস্তাচলে যেতেই হবে ভাই।

আমার লেখার থেকে আমার জীবন নিয়ে আমার সম্পর্ক নিয়ে মানুষের আগ্রহ এখন অনেক বেশি। এখানে সবই বিকোয়। শুধু রবি ব্র্যান্ডটা থাকলেই হল। আমি তো এক্সপেরিমেন্ট বিরোধী নই, আর কেউ না জানলেও তুমি জান যে কত খুঁটিনাটি নিয়েই সারা জীবন কতই না এক্সপেরিমেন্ট করে গেলাম। আমাকে কেউ মানুষ ভাবে না, ভাবে ঠাকুর। রবি ঠাকুর। তাই দেহতরী ডোবার পরে লোকে আমার চুল দাড়ি ছিঁড়েও রেহাই দেয়নি। ভাই ছুটি-তোমাকে তো আগেই বলেছি, মনকে যথেচ্ছ খুঁতখুঁত করতে দিলেই সে আপনাকে আপনি ক্ষতবিক্ষত করে ফেলে। আমাদের অধিকাংশ দুঃখই স্বেচ্ছাকৃত। তবু এ কথাগুলো না বলে গেলে কেমন যেন শান্তি পাচ্ছিলাম না।

SMARAKA GRANTHA: Mrinalini Devi (contd-6)

কেন জানি না মনে হচ্ছে এবার হয়ত সত্যি বদলে যাবে পঁচিশে বৈশাখের আমেজ। সভা সমিতির জায়গায় ভার্চুয়াল রবিপ্রনাম চালু হল বলে। সমবেত গানের বদলে সবাই যে যার সুখকর অবস্থান থেকে অনলাইনে গান গাইবে, “এসো হে বৈশাখ, এসো এসো/ তাপসনিশ্বাসবায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে”। হয়ত কিছুদিন পর রবিপ্রনামের অ্যাপও বাজারে আসবে। গুগুল প্লে তে গিয়ে ডাউনলোডও করা যাবে। সেটিতে ক্লিক করলেই মিস্টার টেগর সাব কা পিক ভি আ জায়েঙ্গে। এখন তো আমার সমস্ত লেখা গুগল প্লে স্টোরে পাওয়া যাচ্ছে। কী স্টোর তুমি ঠিক বুঝতে পারলে নাতো! আরে আমিও বুঝতাম নাকি! বছরে এক আধবার আসার সুবাদে এইসব আধুনিক টেকনোলজির সাথে একটু অভ্যস্ত হয়েছি বলতে পার। ওটা হল একধরনের অ্যাপ। কম্পুটার কিংবা মোবাইলে আমার লেখার অনলাইন লাইব্রেরি। তাও ভাল, টেকনোলজির সুবাদে যদি কিছু লোক এই মানুষটাকে মনে রাখে!

 

যাক অনেক কথা লিখে দিলাম। তোমাকে না জানিয়ে মনে এতটুকু শান্তি পাচ্ছিলাম না। তোমাকে ছাড়া কাকেই বা জানাব বল। এই চিঠিটা পেয়ে যদি একটা উত্তর দাও তা হলে বোধ হয় কলকাতা থেকে ফিরে এসে পেতেও পারি। ভার্চুয়াল হোক কিংবা অনলাইন, পঁচিশে বৈশাখ কেমন কাটল সবিস্তারে পরের চিঠিতে লিখব। বাচ্ছাদের আমার হয়ে অনেক হামি দিয়ো-আর তুমিও নিও।

তোমার রবি

তথ্যসূত্র
১। ভাই ছোটবউ-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (সম্পাদনাঃ অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য ও অপর্ণা ভট্টাচার্য)
২। রবিজীবনী-প্রশান্ত কুমার পাল
৩। বাইশে শ্রাবণ- নির্মল কুমারী মহালানবিশ
৪। চিঠিপত্র- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৫। ডাকঘর- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Spread the love

Check Also

Big Breaking: হুমায়ুনকে ওয়েসির ‘ফিলার,’ কী উত্তর দিলেন তৃণমূলের বিধায়ক

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় হুমায়ুনকে ওয়েসির ফোন! দল তাঁকে শো-কজ করেছে। তিনি সেই শো-কজের উত্তরও দিয়েছেন। তাতেও …

রাহুলের পাইলট প্রোজেক্ট, মুর্শিদাবাদ কংগ্রেসে আধিপত্য হারাতে পারেন অধীর

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে রাহুল গান্ধির নতুন উদ্যোগে মুর্শিদাবাদের কংগ্রেস রাজনীতিতে খর্ব হতে পারে অধীর …

আমি আসছি! নাম না করে শুভেন্দুকে শাসালেন আনিসুর

চ্যানেল হিন্দুস্থান, নিউজ ডেস্ক: নাম না করে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারিকে শাসালেন আনিসুর রহমান। একদা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *