সুমন ভট্টাচার্য : 
কুলদীপ নায়ার
অমৃতসর স্বর্ণ মন্দিরে প্রণাম করে প্রসাদ নেওয়ার জন্য এগোচ্ছি। যে কোনও গুরুদ্বারেই সাধারণত দুর্দান্ত হালুয়া পাওয়া যায়। আর অমৃতসর স্বর্ণ মন্দিরে একদম খাঁটি ঘিয়ের যে হালুয়াটা পাওয়া যায়, তা বোধহয় একদম অমৃত। ওই হালুয়ার দিকে আমার চিরকালের আকর্ষণ। কিন্তু বছর তিনেক আগে সেই হালুয়ার ডেকচির দিকে যেতে গিয়ে দেখি এক দীর্ঘদেহী বৃদ্ধ সামনে বসে আমার মতই হালুয়া খাচ্ছেন। চেহারাটা দেখেই চেনা মনে হওয়াতে যেচে গিয়ে আলাপ করলাম। এমনিতে আমার মতো সাধারণ কলমচিকে তাঁর চেনার কথা নয়, কিন্তু পারিবারিক সূত্রে তাঁর সঙ্গে একটা যোগাযোগ ছিল বলে সাহস করে এগিয়ে যেতে পেরেছিলাম। কিন্তু কি অনাবিল ব্যবহার, কি উষ্ণ আলিঙ্গন। মনে হল না তিনি ভারতবিখ্যাত কুলদীপ নায়ার, আর আমি কলকাতা থেকে আসা এক সাধারণ সাংবাদিক।
এই হচ্ছেন কুলদীপ নায়ার। ভারতীয় সাংবাদিকতায় অন্যতম কিংবদন্তী। যিনি প্রয়াত হওয়ার পরে আর এক বিখ্যাত সাংবাদিক, শেখর গুপ্তা মনে করিয়ে দিয়েছেন কুলদীপই হচ্ছেন সেই রিপোর্টার, যিনি প্রথম নিউজরুমের তথাকথিত ‘এডিটর’-দের টপকে সম্পাদকের চেয়ারে বসেছেন। কিন্তু কুলদীপ নায়ার তো শুধু সাংবাদিক বা সম্পাদক নন, একাধারে ‘পিস অ্যাক্টিভিস্ট’, কূটনীতিক, আবার রাস্তায় নেমে আন্দোলনের সংগঠক। তাঁর মৃত্যু তাই ভারতবর্ষে যতটা আলোড়ন তুলেছে, ততটাই শোকস্তব্ধ পাকিস্তানও। পাকিস্তানের মানবাধিকার আন্দোলনের নেত্রী আসমা জাহাঙ্গীরের ট্যুইটটা দেখুন, শেষ কবে কোন ভারতীয়র জন্য পাকিস্তানের কোনও বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী এই ধরনের মন্তব্য করেছেন, জানা নেই। আসমার মন্তব্যে অবাক হওয়ার কিছু নেই। সাংবাদিকতার পাশাপাশি সারা জীবন ধরে কুলদীপ যেটার চেষ্টা করে গিয়েছেন, সেটা হচ্ছে ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকুক। সেই কারণেই প্রতি বছর ওয়াঘা সীমান্তে গিয়ে প্রদীপ জ্বেলেছেন, সীমান্তের দু’পাশে শান্তিকামী মানুষদের নিয়ে আলোচনা চালিয়ে গিয়েছেন।
কুলদীপ নায়ার এটা পারতেন বলেই তো তিনি-ই আসলে নয়াদিল্লি আর ইসলামাবাদের মধ্যে ‘হট লাইন’ ছিলেন। দু’দেশের যে কোনও রাষ্ট্রনায়কই জানতেন, অন্য পক্ষের কাছে কোনও বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য স্টেটসম্যান পত্রিকার এই প্রাক্তন সম্পাদকই যথেষ্ট। যিনি গান্ধীকে দেখেছেন, জিন্না যাঁকে পছন্দ করতেন, সেই কুলদীপ নায়ার যে ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে সেরা ‘গুডউইল’ অ্যাম্বাসাডর হবেন, তাতে আর অবাক হওয়ার কী আছে?
সোজা কথা সোজা ভাবে বলতে পারতেন, তাতে শাসক যতই অসন্তুষ্ট হন না কেন। সেই জন্যই জরুরি অবস্থার বিরোধিতা করেছিলেন, আবার বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংহের সরকার যখন তৈরি হয়, তখন তাঁকেই লন্ডনে ভারতের রাষ্ট্রদূত করে পাঠানো হয়েছিল। রাজ্যসভার সদস্য হয়েছেন, বিভিন্ন ইস্যুতে প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছেন, কিন্তু কোনও দলই কোনও দিন তাঁর বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলতে পারেনি। কুলদীপ নায়ার সম্ভবত সেই প্রজন্মের শেষ সাংবাদিকদের একজন, যাঁদেরকে রাজনীতিকরা খুঁজতেন, রাজনীতিকদের দরজার বাইরে অনুগ্রহ প্রত্যাশায় তাঁদের বসে থাকতে হতো না।
বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
https://www.youtube.com/channelhindustan
https://www.facebook.com/channelhindustan
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news