কিশোর ঘোষ

কিছুদিন আগের কথা। আমার এক বন্ধু, যে কিনা সুমনের গানের আমার চেয়েও বড় ভক্ত, হঠাৎ বলল—জেনে রাখ, এই সুমন আর সেই সুমন এক না।
—সেই সুমন আর এই সুমন বলতে?
—শোন না, আমার কাছে খবর আছে।
—কী খবর?
—সেই সুমন গিটার কাঁধে ‘কতটা পথ পেরলে পরে পথিক হওয়া যায়’ গাইতে গাইতে ব্যক্তিগত এল ডোরাডোর খোঁজে কোথাও একটা চলে গেছে।
—কোথায় গেছে?
—হতে পারে সাঁওতাল পরগনা। ইউরোপের কান্ট্রি সাইডেও চলে যেতে পারে।
মোদ্দা কথা আমার ওই বন্ধুর বক্তব্য হল আজকের ‘পলিটিক্যালি কারেক্ট’ কবীর সুমন আর এক সময়ের অতি প্রতিভাবান, মানবমুক্তির জয়গান গাইতে আসা জিনিয়াস সুমন চট্টোপাধ্যায় এক মানুষ নয়।
সত্যি বলতে আমারও যে এমন সন্দেহ মাঝেসাঝে হয় না তা নয়। হবে না কেন, নয়ের দশকে যিনি গাইতে এসেছিলেন, যিনি কথায়-সুরে বদলে দিয়েছিলেন বাংলা গানের ভূত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ। যিনি জলজ্যান্ত অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছিলেন শুধু গানের মানুষদের কাছেই নয়, এমনকী আমাদের মতো কবিতা লিখিয়েদেরও। তিনিই যদি আজ শঙ্খ ঘোষকে ব্যঙ্গ করে অনুব্রত মণ্ডলের পক্ষ নিয়ে কবিতা লেখেন তখন আর কী ভাবতে পারি তাঁর সম্পর্কে! যে সুমন লিখেছিলেন ‘আমি চাই মানুষের হাতে রাজনীতি হবে ভীষণ জব্দ’, সেই আজ উল্টো লাইন লিখে চলেছেন অদৃশ্য কালি-কলমে—রাজনীতিরই হাতে সুমন হচ্ছেন ভীষণ জব্দ! এখানে জানিয়ে রাখা ভালো, আমি একসময়ের ‘গানওলা’র পাতি নিন্দা করতে বসিনি।
আসলে মনে আভিমান জমেছে অনেক। শিল্পী সুমনের ভক্ত হিসেবে আর পাঁচজনের মতোই খানিক দিশাহারা বোধ করছি। সে কথাই বোঝানোর চেষ্টা করছি আজ। ভাবুন তো, একটা সময় যে মানুষটার গান শুনতাম বলে পাড়ার বন্ধুরা চাটতো। বলতো, কী শুনিস? গান না কবিতা! এমনকী এককালে যাঁর গান শুনতাম চুরি করে… কারণ আমার ঘরে তখন টেপ-ক্যাসেট নেই। খুটতুতো দাদার গান শোনার যন্ত্রটির দখল নিতাম দুপুরে, যখন ওদের ঘরের কেউ কোনও কারণে নেই। ওইভাবেই ‘বসে আঁকো’, ‘ইচ্ছে হলো’, ‘ঘুমোও বাউন্ডুলে’র সঙ্গে আলাপ। তাছাড়া আমাদের বড় হওয়ার পাশেও তো ছিলেন।
১৯৯২ সাল। এইচএমভি থেকে বার হল ‘তোমাকে চাই’। তখন হাইস্কুলে সবে। তবু না বুঝেও ভালো লাগা! তারপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কাছে যাওয়া ওই সব মহিরুহ গানের। আসলে সুমন এমন কিছু গান নিয়ে এসেছিলেন যা কেবল বড় হওয়ার পাশে ছিল না, যা আমাদের জেনারেশনকে শিখিয়েছিল জীবনকে কীভাবে বড় করে দেখতে হয়। এর উপর নয়ের দশেকের শেষ এবং পরবর্তী শতাব্দীর শুরুতে শূন্য দশকের আমরা যখন কবিতা লিখতে এলাম, তখন সুমন ছিলেন আমাদের অনেকেরই নেপথ্য গুরু। ঠেকের ভাষায় বললে—‘গুরুদেব পাবলিক’। কীভাবে সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত হওয়া যায় তো তা ওই লোকটাই শিখিয়েছিল চোখে আঙুল দিয়ে। সব মিলিয়ে সুমন চট্টোপাধ্যায় দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া রুচিশীল বাঙালি জীবনে স্বপ্নের মতো করে এসেছিলেন। যেন গিটার-অস্ত্র কাঁধে নয়া অবতার! কিন্তু এই লোকটা কে?
কবীর সুমন নামের ন্যাড়ামাথা এই লোকটা? কথায় কথায় ইনশা আল্লা বলা অতি বিনয়ের ভান করা লোকটা কে? এই মানুষটাকে চিনি না আমরা! আমাদের সুমন তো ছিল আত্মভোলা, খ্যাপা মানুষ। সে তো ছিল আরশি নগরের বাউল। আয়না ছড়াত দিকবিদিকে, যে আয়না-গানে ঝামেলায় পড়ত মুখোশধারী সমাজ। আর এই সুমন?
এ লোক পলিটিক্যালি কারেক্ট। যখন দলের সঙ্গে বনিবনা হয় না তখন গালাগাল দেয় নচেত ‘দিদির ভাই’। এমনকী এই সুমন বার বার বোঝাতে চায়, যে সে একশ শতাংশ মুসলমান। এই সুমন আসিফার জন্য গলা ফাটান কিন্তু দিব্যার বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে আমতা আমতা উত্তর করেন। অর্থাৎ যে সুমন ধর্মান্ধতাকে ঘৃণা করতেন তিনিই আজ জাত পাত দেখে প্রতিবাদে নামছেন! অতএব, আমার ওই বন্ধুই ঠিক।
সুমন আসলে দুটো মানুষ। একজন স্বপ্ন গড়ার, একজন স্বপ্ন ভাঙার কারিগর। একজন সুমন চট্টোপাধ্যায়—সেই অতি অতি অতি প্রতিভাবান সহজিয়া গানের মতোন মানুষ, শিল্পী হিসেবে শিল্পই ছিল যাঁর ধর্ম, তিনি হয়তো সত্যি পাড়ি দিয়েছেন কোনও এক অজানায়—হয়তো বাস্তবিক ব্যক্তিগত এলডোরাডোর খোঁজে ‘কত মানুষ মরার পর মানুষ জানবে শেষে’ গাইতে গাইতে হেঁটে চলেছেন তিনি ‘উত্তর আসবে না’ জেনেও…। যার সঙ্গে চূড়ান্ত বিচ্ছেদ হয়ে গেছে আজকের লোকটার—যাকে দেখি টিভিতে, কাগজে। যার নাম কবীর সুমন। যিনি একজন অতি সাধারণ সুবিধাবাদী স্বার্থান্বেষী রাজনীতিবিদ বৈ অন্য কিছু না।
বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
https://www.youtube.com/channelhindustan
https://www.facebook.com/channelhindustan
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news