কিশোর ঘোষ:
(এই থুতু-বৃত্তান্ত আসলে চলতি বছরের ফেলে আসা ৭২তম স্বাধীনতা দিবসে জনৈক চূড়ান্ত ব্যতিক্রমী ও মারাত্মক প্রতিভাবান নেতার জ্বালাময়ী ভাষণ। লুকিয়ে লিপিবদ্ধ করা।)
ভাইসব,
আজ স্বাধীনতা দিবস কথাটা ভুল। মনে রাখবেন আমাদের রোজই স্বাধীনতা দিবস। প্রতি মুহূর্তে। নিজের হাতে স্বাধীনতা তুলে নিলেই স্বাধীনতা দিবস। রাজপাল যাদবের মতো ছোট ছোট স্বাধীনতার মুহূর্ত দিয়ে বুঝতে হবে আপনাকে, যে স্বাধীনতা আসলে অমিতাভ বচ্চনের মতো ঢ্যাঙা, মানে বড় ব্যাপার। বিজ্ঞ নেতারা বলেন, ১৯৪৭-এর আগে আমাদের রোটি-কাপড়া-মকানের স্বাধীনতা ছিল না। সে তো ছিলই না। কিন্তু আজ প্রশ্ন তুলব, ব্রিটিশ আমলে গরিব ভারতবাসীর, আধনাঙ্গা ভারতবাসীর থুতু ফেলার স্বাধীনতাও কি ছিল?
না, সেটুকুও ছিল না। অথচ আজ আম-আদমি যেখানে ইচ্ছে থুতু ফেলতে পারে। ভাইসব, থুতু জিনিসটাকে ছোট ভাববেন না। স্বাধীনতা প্রসঙ্গে থুতু ফেলার কথা টেনে আনছি ভেবেচিন্তে। কেন? কারণ আমরা সকলে স্বাধীনতার মানে সবচেয়ে বেশি খুঁজে পেয়েছি শিয়ালদা বা হাওড়ার মতো জনবহুল স্টেশনে গিয়ে। সেখানে যে যেখানে ইচ্ছে থুতু ফেলতে পারেন। ফেলেনও। ট্রেন থেকে নেমে, ভিড়ের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে জনৈক ডেলি প্যাসেঞ্জারের যখন হঠাৎই খুব থুতু পায়। সে ওমনি ওয়াক শব্দ তুলে একথোকা নাল নামিয়ে দেয় প্লাটফর্মে। আহা, কী অপূর্ব স্বাধীন দৃশ্য! ভদ্রলোক যদি পানাসক্ত হন, তবে তিনি যে টকটকে লাল রঙের থুতু ফেলে থাকেন, তা দেখে আমার মনে পড়ে—কত মানুষের রক্তের বিনিময়ে আজকের স্বাধীনতা পেয়েছি আমরা! যাঁরা পাব্লিক প্লেসে থুতু ফেলা, সিগারেট বিড়ি খাওয়া নিয়ে আপত্তি তোলেন, আমি তাঁদের বলব—পাব্লিক প্লেসেই তো পাব্লিক তাঁর স্বাধীন কাজটি করবে। তাই নয় কি?
তাই সেইসব ডেলি প্যাসেঞ্জারদের পক্ষেও আমি দাঁড়াতে চাই ভাইসব, যারা ভিড় ট্রেনে লুডো, তাস চর্চার জন্য অনেকটা জায়গা দখলে নেন। যার ফলে অন্যদের ‘সামান্য’ অসুবিধা হয় বটে, কিন্তু মনে রাখতে হবে— এও আসলে নিজের অধিকার বুঝে নেওয়ার জেহাদ। অতএব বিপ্লবীদের মতো ভয় না পেয়ে ধূমপান করুন যত্রতত্র। কারণ এই ঘটনা স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিকের ব্যক্তিগত অধিকারের ‘গনগনে’ উদাহরণ। যাঁরা বলেন এতে করে ট্রেনে আগুন লেগে বিপদ হতে পারে, তাঁদের বলব— মনে রাখবেন, একদিন সবাইকেই মরতে হবে। রাখে হরি মারে কে…! অতএব ওসব ফালতু টেনশন নেবেন না। তাছাড়া মহাপুরুষরা বলে গেছেন, জীবনকে হুলিয়ে উপভোগ করার সুযোগ নষ্ট করাই পাপ। রেলপুলিশ ধরলে তাকেও এই আধ্যাত্মিক উপলব্ধি শেয়ার করুন। তবে থুতু ফেলতে সে ভয় নেই ভাইসব, টিকিট না কাটলে পুলিশে ধরে, লাইন টপকালে ধরে, মুখে মালের গন্ধ থাকলেও ধরে, কিন্তু থুতু ফেলল ধরে না। অথচ এই ঘটনা ১৯৪৭-এর আগে করলে নির্ঘাত জরিমানা হত আপনার। সাড়ে তিনদিন জেল হলেও কিছু বলার ছিল না। তার উপর সাহেবের বুটের লাথি ছিল ফ্রি। মেরে পেছন লাল করে দিতে লালমুখো সাহেব। কিন্তু আনন্দের কথা হল, সেই দুঃখের দিন আজ আর নেই। কারণ ভারতের হাজার হাজার স্বাধীনতা সংগ্রামী নিজেদের জীবন দিয়ে আমাদের যেখানে সেখানে কফ-কাশি-থুতু ফেলার অধিকার দিয়ে গেছেন। এই প্রসঙ্গে স্বাধীনতার একটা টাটকা খবর শেয়ার করি।

কদিন আগে ছবি সহ সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল সাধারণ মানুষের থুতুতে নাকি হাওড়া ব্রিজের প্রকাণ্ড ইস্পাতের বিমগুলির বিশেষ ক্ষতি হচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে আমরা এমন পরিমাণে এমনি-থুতু, পান-গুটকা-থুতু ফেলেছি যে রাক্ষুসে ইস্পাতও নাকি ক্ষয়ে যাচ্ছে। বিশ্বাস করুন, এই খবর পড়ে আমার আনন্দ নাচতে ইচ্ছে করছিল। কেন? কারণ ওই হাওড়া ব্রিজ যারা বানিয়েছিল তারা আমাদের দুশো বছর পরাধীন করে রেখেছিল। অতএব, যাঁরা হাওড়া ব্রিজে থুতু ফেলেছেন, তাঁরা প্রকারন্তরে ইংরেজ শাসকের মুখে থুতু ফেলেছেন। বড় কাজ করেছেন, ভালো কাজ করেছেন ভাইসব। সংগ্রামী অভিনন্দন জানাই। মনে রাখবেন, এই মনোভাবই প্রকৃত স্বাধীন আবেগের প্রকাশ। শুনতে উদ্ভট লাগছে তো? ভাবছেন এসব কী আবোলতাবোল বকছি। না, ভাইসব আবোলতাবোল বকছি না আমি। এই ঘটনাগুলির পাশাপাশি তথাকথিত উন্নত দেশের সাধারণ নাগরিকের দুঃখের কথা বললেই বুঝতে পারবেন, কতটা সত্যি বলছি আমি।
এই তো, কদিন আগে আপনাদের আশীর্বাদে ইউরোপ বেড়াতে গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে বুঝলাম, যে সে দেশের মানুষ স্বাধীন হয়েও স্বাধীন না। তাই তাঁদের সামান্য থুতু ফেলতেও মাইলের পর মাইল হাঁটতে হয়। আমাদের দেশে রাস্তায় ডাস্টবিনের দেখা মেলে না আর সেখানে রাস্তার পাশে ‘থুতুপাত্র’ পর্যন্ত রেখেছে সরকার। তার গায়ে আবার নক্সা করে লেখা—স্পিট হিয়ার। জানলাম যে ওই সরকারি পিকদানি ছাড়া বেচারাদের অন্য কোথায় থুতু ফেলার অধিকার নেই। জিনিসটা দেখে আমি অবাক হয়েছি বুঝে সঙ্গে থাকা বিদেশি বন্ধু বললেন, পিকদানির ব্যবস্থা নাকি মূলত তৃতীয় বিশ্ব থাকে আসা নাগরিকদের জন্য। ওর কথায়, আমাদের নাকি অকারণে বেশি বেশি থুতু পায়। ভেবে দেখলাম সে কথা ভুল না। কেন কারণে অকারণে দাঁড়িয়ে-বসে-শুয়ে কেবলই থুতু ফেলতে ইচ্ছে করে আমাদের, তা এক রহস্য? এই বিষয়ে গবেষণা হওয়া উচিত। যাক গে, এখন সে কথা হচ্ছে না। আসল কথা হল, মাইল খানিক ঠেঙিয়ে থুতু ফেলা কেন ভাইসব? চিপসের প্যাকেটটা ডাস্টবিনেই ফেলতে হবে কেন? ফলের খোসাটাও… এ কি একধরনের পরাধীনতা নয়? কিন্তু আমাদের এখানে ওইসব চ্যাংড়ামো নেই। স্বাধীন ভারতে কফ-কাশি-থুতুই হোক কিংবা ময়লা আবর্জনা, তা যার যেখানে খুশি ফেলার অধিকার আছে ভাইসব।
আমাদের বউ-মেয়েদের, জেঠিমা-কাকিমাদের অধিকার আছে সকাল সকাল আগের দিনের জমা ময়লার প্যাকেটটা রাস্তায় ছুড়ে ফেলার। অনেকে আবার বুদ্ধি করে পুকুরে ফেলেন। ভেবে দেখেছি, এতে করে তারা একধরনের সমাজসেবা করে চলেছেন অজান্তে। কারণ রাস্তায় ফেলা ময়লা ভর্তি প্যাকেট দাঁতে ছিড়ে পাড়ার নেড়িটা খাবার পায়। তাছাড়া পঞ্চায়েত ও পুরসভার সাফাই কর্মীদের কাজ থাকবে না যদি না রাস্তা ময়লা করি আমরা। অন্যদিকে দিনের পর দিন পুকুরে ময়লা ফেলে মা-কাকিমারা আত্মীক সাহাহ্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন প্রমোটার ভাইদের দিকে। কারণ ময়লায় মজা পুকুরটিকে সহযেই বুজিয়ে বহুতল আবাসন তোলা যায়।
ভাইসব, স্বাধীনতা এক পরম শব্দ। কিন্তু সেই শব্দের প্রকৃত ব্যবহার ভারতবাসীরাই কেবল করে আসছেন বিগত ৭২ বছর ধরে। তাই আজও আমরা রাস্তার পাশে চেন খুলে দাঁড়িয়ে পড়তে পারি। প্রকৃতির অমোঘ ডাকে সাড়া দিতে কেন যেতে হবে সুলভ শৌচালয়ে? কেন? বাথরুম পায়খানা করতে কেন পয়সা দিতে হবে আমাদের? আমরা কি আজও পরাধীন? কই, কুকুর বেড়ালকে তো রাস্তায় পটি করতে বাধা দেওয়া হয় না! মানুষও তো প্রকৃতির সন্তান। এভাবেই কি প্রকৃতির সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে না মানুষের?
ভাইসব আজ এই পর্যন্তই। ভেবে দেখবেন ভাইসব। শেষে শুধু বলব, নিজের অধিকার দেখাতে ভুলে যাবেন না। মন ভরে থুতু ফেলুন, প্রাণ ভরে ধূমপান করুন, মল থেকে বেরিয়ে মুত্রত্যাগ করুন, যা খুশি তাই করুন এবং ভোট দিন নিয়ম করে। কারণ আপনি একটি স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক। জয়হিন্দ। বন্দেমাতরম।
*****
লেখক পরিচিতি: জন্ম ১ জুন, ১৯৭৮। প্রথম পরিচয় কবিতায়। ২০০৯ সালে প্রকাশিত কিশোরের কাব্যগ্রন্থ ‘উটপালকের ডায়েরি’। পাঠকের পছন্দ হওয়ায় এই বইয়ের তিনটি এডিশন হয়। বইটি পুরস্কৃত হয়, এই বইয়ের কবিতা অনুবাদ হয়। আরও নানা কাণ্ড। অন্য দুই কবিতার বই ‘সাবমেরিন’ ও ‘শূন্যের পাঁচ’। এইসঙ্গে গল্প এবং নানা স্বাদের গদ্য লেখক হিসেবেও হালে পাঠকমহলে কতকটা পরিচিত। সম্প্রতি এই লেখকের গদ্যগ্রন্থ ‘স্বপ্নদেশ থেকে স্বপ্নদোষ অবধি’ প্রকাশিত হয়েছে। কিশোর সিনেমার জন্য গানও লিখে থাকেন মাঝেমধ্যে।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news