ভাস্কর মান্না:

সমস্যা ছিল এবং সেই সমস্যার কথা জানাও ছিল। কিন্তু সমাধান হয়নি। তাই ফলাফলও উল্টো হয়েছে।
খড়গপুর সদর উপনির্বাচনে ২০ হাজার ৮৫৩ ভোটে জয়ী হয়েছেন তৃণমূল প্রার্থী প্রদীপ সরকার। অথচ মাস ছয়েক আগে লোকসভা ভোটে এই আসন থেকেই ৪৫ হাজার ১৩২ ভোট এগিয়ে ছিলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ। কিন্তু ছ’মাসের মধ্যে কী এমন হল? যাতে করে নিজেদের চেনা ময়দান ছেড়ে দিতে হল বিজেপিকে? এনআরসি ইস্যু বাকি দুটি আসনের ক্ষেত্রে কাজ করলেও, এখানে সেটা ছিল না। এখানে ছিল শুধু একটা সমস্যা। প্রার্থী নিয়ে সমস্যা। আর এবার সেই সমস্যার কথাই স্বীকার করলেন বিজেপির রাজ্য নেতৃত্ব।

দিল্লির সংসদ চত্বরে দাঁড়িয়ে মেদিনীপুরের সাংসদ দিলীপ ঘোষ স্বীকার করেন খড়গপুর সদরে প্রার্থী নিয়ে দলের মধ্যেই সমস্যা ছিল। আর সেই সমস্যার প্রতিফলন দেখা গেল ভোটের বাক্সে। অর্থাৎ দলীয় নেতাদের মধ্যেই মনোনীত প্রার্থী ছিলেন না বিজেপির প্রেমচাঁদ ঝা। প্রেমচাঁদের বিরুদ্ধে নির্দল প্রার্থী হন বিজেপির পুরনো কর্মী প্রদীপ পট্টনায়েক। শুধুমাত্র দলের অন্দরেই না, জনমানসেও বিরূপ প্রতিক্রিয়া ছিল প্রেমচাঁদের বিরুদ্ধে। বিজেপির এই প্রার্থীর নামে জমি কেলেঙ্কারি সহ একাধিক অভিযোগ রয়েছে এলাকায়। তাঁর নামে মামলা ঝুলছে কলকাতা হাইকোর্টেও। এমনকি তৃণমূল প্রার্থী প্রদীপ সরকারের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতাও এলাকায় অপরিচিত নয়। তবে প্রেমচাঁদের থেকে প্রদীপের ভাবমূর্তি এলাকায় যথেষ্ট স্বচ্ছ।

একসময় প্রেমচাঁদের সহযোগী ছিলেন প্রদীপ। তবে ২০১৬ সালের পর থেকে দূরত্ব বাড়ে প্রদীপ ও প্রেমচাঁদের মধ্যে। এই উপনির্বাচনের আগে ফের প্রদীপের সঙ্গে প্রেমচাঁদের সম্পর্ক সামনে আসে। একটি ভিডিওতে দেখা যায় অর্থ সংক্রান্ত কোনও এক বিষয়ে তাঁদের মধ্যে রফাসূত্র চলছে। প্রেমচাঁদের বিরুদ্ধে এত অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও, তাঁকেই প্রার্থী করা হয় শুধুমাত্র দিলীপ ঘোষের ঘনিষ্ঠ বলে। তবে প্রেমচাঁদের জয় নিয়ে প্রথম থেকে সন্দিহান ছিল বিজেপি নেতৃত্ব। আর এসবেরই সুযোগ নিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী।

২০১৯ লোকসভার নিরিখে এই আসনে সামান্য কিছু ভোট বেড়েছে বাম কংগ্রেস জোটের। এই জোট ততটা ফলপ্রসূ হয়নি। কিন্তু বিজেপির পুরো ভোট ব্যাঙ্কটা গিয়েছে তৃণমূলের ঝুলিতে। আর তা নিয়েই ধন্দে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। উপনির্বাচনের নামে তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে বোঝাপড়া রয়েছে, এই অভিযোগে তুলে কলকাতার রাস্তায় মিছিল করেন কংগ্রেস নেতৃত্ব। কংগ্রেসের এই অভিযোগ কতখানি সত্য, তা বিচার্য বিষয়। তবে খড়গপুরে তৃণমূলকে সুবিধা পাইয়ে দিতে প্রেমচাঁদের যে গা-ছাড়া মনোভাব ছিল, তা নির্বাচনের দিনই সংবাদমাধ্যমের কাছে পরিস্কার হয়ে যায়।

নির্বাচনের দিন প্রেমচাঁদের গতিবিধিও ছিল নাটকীয়। খড়গপুর পুরসভার বুথের ভেতরে আয়না লাগানো রয়েছে, এই খবর সংবাদমাধ্যমে জানতে পেরে সস্ত্রীক ঘটনাস্থলে আসেন প্রেমচাঁদ। ওই বুথে ভোটও দেন। কিন্তু এই ঘটনায় একটুও বিচলিত হননি তিনি। এমনকি খড়গপুর সদরে ২৭০টি বুথ থাকলেও, ভোট পরিদর্শনে নিজের ১০-১২টি পকেট এলাকা ছাড়া সেভাবে কোথাও যাননি প্রেমচাঁদ। কখনও ডাবের জলে চুমুক বা কখনও খড়গপুর স্টেশন এলাকায় মানুষের সঙ্গে আলাপচারিতার মাধ্যমে কিছুটা সময় অতিবাহিত করেই ক্ষান্ত থাকেন তিনি। বুথের ১০০ মিটারের মধ্যে অনৈতিক জমায়েত দেখেও প্রতিবাদ না করে, ওই জমায়েতে থাকা তৃণমূল কাউন্সিলরের সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় করেন। মাঝে কিছুটা সময় পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনলেও, সেই অভিযোগের তীব্রতা খুবই কম ছিল। পাশাপাশি নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সামান্যতম গণ্ডগোলের অভিযোগও সামনে আসেনি। সবকিছু বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে যেন একটা ম্যাচ ফিক্সিং চলছে।

আর এ সবের ফায়দা সুকৌশলে তুলে নেয় তৃণমূল। একদিকে দিলীপ ঘোষকে পুলিশি নজরদারিতে রেখে অবাধে নিজেদের কাজ চালিয়ে গিয়েছে শাসকদল। সেদিন দিলীপ ঘোষ কার্যত ঘরে বসেই কাটিয়ে দেন পুরোটা সময়। ব্যালটে যে তৃণমূল মাত্র ৪টি ভোট পেয়েছে, সেই তৃণমূল ইভিএমে ঝড় বইয়ে দিয়েছে। আর তৃণমূলের এইসব রণনীতি পরিচালনা করেন শুভেন্দু অধিকারী। অর্থাৎ বলাই যায়, খড়গপুরের সমস্যা প্রেমচাঁদ জেনেও সমাধান করেনি রাজ্য নেতৃত্ব। তার মাশুল দিতে হয় ভোটের বাক্সে। তাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষায় বললে বলা যায়, খড়গপুরে পরাজিত হয়েছে বিজেপি, হেরে যায়নি!
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news