সৈকত ঘোষ:
ফাস্ট ফুডের জমানায় সবকিছুই দু-মিনিটের ম্যাগি হয়ে যায়। আমরা পাগলের মতো খুঁজে বেড়াই হিট-রেসিপি। তারপর চেনা ছকে ঠিকঠাক অ্যাসেমবেলড করলেই কেল্লা ফতে।
তাহলে যেটা দাঁড়াচ্ছে—নতুন র্যাপারে চেনা গল্প, ঝাঁ-চকচকে প্রেজেন্টেশন, বিদেশি লোকেশনে একটা মাখোমাখো রোম্যান্টিক গান তারপর ইন্টারভেলের পর ঝিম কাটাতে প্রেমে লেংগি খাওয়া বাঙালির প্রিয় স্যাড সং। আর হ্যাঁ, সুযোগ বুঝে একটা মাস্ত আইটেম নাম্বার গুঁজে দিলেই ছবি হাইটেক থুড়ি হটকেক। তবে শেষে একটা ধামাকাদার ক্ল্যাইমাক্স, হয় বালতি বালতি ইমোশন নয় হিরোইক মেলোড্রামা মাস্ট। হাতে গরম হিট ফর্মুলা রেডি। আর অগত্যা এসব না হলে ফেলিনি বার্গম্যান গোদার কুরোসোয়া হয়ে ঋত্বিকে ইতি। মোটামুটি এই হল গিয়ে বাঙালির ভাল সিনেমার গোড়ার কথা।
না, ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত এসব কিছুই করতে চাননি। নিজে সফল মেধাবী সুরকার হয়েও তার প্রথম ছবি থেকে সচেতন ভাবেই গানকে বাদ দিয়েছেন। নিজের সবচেয়ে বড় শক্তিকে এভাবে সরিয়ে রেখে পরিচালক ইন্দ্রদীপ আমাদের বুঝিয়ে দেন, সস্তা গেম খেলতে তিনি আসনেনি। এবং আর্ধেক যুদ্ধও বুঝি জিতে যান। আসলে চেনা ছক ভেঙে বাংলা ছবি তৈরিতে মন দেন। তাই এক নতুনর ভাষার সাক্ষী হই আমরা। সিনেমা মানে তো কেবল গল্প বলা নয়, সিনেমা নিজেই এক এনটিটি। আর সেই পার্সপেক্টিভ থেকে তাঁর কেদারায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেন আইডি।

কেদারা আসলে নিজের মধ্যে নিজেকে খুঁজে বেড়ানোর আখ্যান। না শেষ হওয়া কবিতার মতো ম্যাজিক রিয়াল। এ ছবির প্রত্যেকটা ফ্রেম ভীষণভাবে জীবন্ত। পরতে পরতে লেগে থাকা মুগ্ধতার শিলালিপি। শুরুটা একটি বাড়িকে কেন্দ্র করে। সেই বাড়িতে থাকা একজন নিঃসঙ্গ মানুষের দহনকে কেন্দ্র করে ছবি এগোয়। নরসিংহ চরিত্রে কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় আরও একবার প্রমাণ করেন যে মেথড অ্যাক্টিংকে কোন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব। কেষ্ট চরিত্রে রুদ্রনীল জাস্ট অসাধারণ। এমন সহজাত অভিনয় বহুদিন মনে থাকবে। ছোট চরিত্রে বিদীপ্তা এবং মৌসুমী নিজেদের জাত চিনিয়েছেন।
সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি অরিজিৎ সিংহ-এর ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক এবং শুভঙ্কর ভরের সিনেমাটোগ্রাফি। প্রতিটা দৃশ্য যেন এক-একটা কবিতার লাইন। শ্রীজাতর গল্প ছবির মেরুদণ্ড। যেখানে পাওয়া গেল প্রথাগত গল্প বলার ধাচাকে অস্বীকার করে নবনির্মিত বহুরৈখিক কেন্দ্রহীনতার লেয়ার। তাই জীবনের অ্যালফাবেটসগুলো অন্তর্বাহিনী নদীর মতো বয়ে চলে কেদারার অলিন্দ থেকে নিলয়ে। এ ছবিতে জাম্পকাটের ব্যবহার, নরসিংহের বর্তমান এবং অতীতে যাতায়াত অনেকটা বাল্বের ফিলামেন্টের মতো।
পুরো ছবি জুড়ে নরসিংহের ছেলে বুবলাইকে না দেখা গেলেও তার উপস্থিতি অনুঘটকের মতো কাজ করে। একজন শিল্পীর যন্ত্রণা, তার ভাললাগা ক্যালাইডোস্কোপের মধ্যে দিয়ে এক অদ্ভুত ইলিউশন হয়ে দেখা দেয়। নরসিংহের মধ্যে একদিকে তার ছেলেবেলা অন্যদিকে প্রিয় ঠাকুমার জীবন্ত উপস্থিতি, একদিকে তারা-ভরা আকাশ অন্যদিকে স্বপ্নের সঙ্গে রিয়ালিটির ইন্টারকোর্স জন্ম দেয় ম্যাজিক রিয়ালিজমের। আর এই না হয়ে ওঠা কবিতার মতো ছিপি খোলা বিষাদই মাস্টারস্ট্রোক। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ডিরেক্টর আমাদের চেতনাকে হ্যামার করে যান। এক অদ্ভুত ঘোর, স্বমেহনের পর এক অলীক অপ্রাপ্তি।
যা আসলে এ ছবির সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news