রণবীর ভট্টাচার্য
আজ থেকে ঠিক ৬৮ বছর আগে, অর্থাৎ ১৯৫২র ২৩শে জুলাই স্বাধীন ভারতের কেডি যাদব প্রথম ভারতীয় হিসেবে ব্যাক্তিগত বিভাগে হেলসিংকি অলিম্পিকে পদক জেতেন। এতগুলো বছর পেরিয়ে এসেছে ভারত – এর মধ্যে লিয়েন্ডার পেজ, সুশীল কুমার, অভিনব বিন্দ্রা, যোগেন্দ্র কুমার, পিভি সিন্ধু, মেরি কমের মত অজস্র উজ্জ্বল নাম রয়েছে যারা হকি বা ফুটবলের মত দলগত খেলা নয়, ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে অলিম্পিকে মেডেল জিতেছে গর্বিত করেছেন দেশকে। কিন্তু সাড়ে পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চির খাসাবা দাদাসাহেব যাদব ওরফে কেডি যাদব কিন্তু স্বাধীন ভারতের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করে শুধু কুস্তিতে ব্রোঞ্জ নিয়ে আসেন তাই নয়, ভারতের ক্রীড়া জগতকে এক লহমায় পৌঁছে দেন সারা বিশ্বের কাছে। কিন্তু এই দেশ কি মনে রেখেছে তাকে?

বঞ্চনা, গঞ্জনা, মন খারাপ – এগুলো ভারতবর্ষ কেন তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর খেলাধুলোর অঙ্গ হয়েই ছিল স্বাধীনতার অনেক বছর পর অবধি। মহারাষ্ট্রের সাতারার কুস্তিগীর পরিবারে জন্ম হওয়া কেডি মাত্র পাঁচ বছর বয়সে শিখতে শুরু করেন কুস্তির প্যাঁচ। স্কুলের স্পোর্টস থেকে সাফল্যের যাত্রা শুরু। বাবুরাও বালাওয়াডে আর বেলাপুরি গুরুজীর তত্ত্বাবধানে আধুনিক কুস্তির রীতিনীতি শিখে ফেলেন। তবে কুস্তির রিং এর বাইরের লড়াই বোধহয় বেশি কঠিন ছিল কেডি যাদবের। ১৯৪৮ সালের ফিনল্যান্ড অলিম্পিকে ষষ্ঠ হয়ে শেষ করেন। অনভিজ্ঞতার সাথে প্রকট ছিল পর্যাপ্ত অনুশীলনের অভাব। তারপর আরো চার বছরের অপেক্ষা। কেডি কি প্রথম তিন থাকতে পারবে পরের অলিম্পিকে?

আজকের ভারতের মতো নেহরুর ভারতে সেই সময় খেলাধুলো নিয়ে কোন প্ল্যান তৈরি ছিল না। তাই প্রতিযোগীদের নিজেদের টাকার জোগাড় করতে হতো অলিম্পিকে যেতে হলে। সেই সময়ে বোম্বের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন মোরারজি দেশাই, যিনি পরবর্তীকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। কেডি যাদব তার কাছে অর্থ সাহায্যের জন্য গেলে, মোরারজি দেশাই অলিম্পিকের পর আসতে বলেন। তবে কিছুটা অবাক করে দিয়েই কেডির সমস্যার সুরাহা করতে এগিয়ে আসেন পাতিয়ালার মহারাজা। তবে দুঃখের হল যে দেশীয় রাজনীতির যাঁতাকলে পরে কেডি যাদবকে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী নিরঞ্জন দাসকে দু-দুবার হারাতে হয়। সারা পৃথিবীতে কোন মেডেলজয়ী প্রতিযোগীকে এরকম পরিস্থিতির মধ্যে যেতে হয়েছে কিনা জানা নেই!
কেডি আগের বারের মতো এবারেও কুস্তির বেন্টমওয়েট বিভাগে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। দিনে ২৫০-৩০০ পুশ আপ আর ১০০০ বার ডন বৈঠক করলেও উচ্চ তার জন্য বিদেশিদের থেকে পিছিয়ে ছিলেন কেডি। অনেকেই বলেন যে ক্লান্ত না হলেও হয়ত সোনাজয়ী শোহাচি ইচিকে হারিয়ে দিতে পারতেন! তবে ব্রোঞ্জ জিতে আসার পর গ্রামের মানুষের কাছে রাজকীয় সম্বর্ধনা পেয়েছিলেন। যেখানে রেল স্টেশন থেকে তার বাড়ি পৌঁছতে লাগত ১৫ মিনিট, সেইদিন লেগেছিল পাক্কা সাত ঘণ্টা। ১০০র চেয়েও বেশি গরুর গাড়ি এসেছিল শুধুমাত্র কেডি যাদবকে নিয়ে যাবে বলে।
জীবদ্দশায় কোন সম্মান পাননি। পুলিশে চাকরি করেছেন দীর্ঘদিন, ১৯৮৩ অর্থাৎ ভারতীয় ক্রিকেট টিমের বিশ্বকাপ জেতার বছরে চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার হিসেবে। তার পরের বছর দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান তিনি। অনেকেই প্রশ্ন করেন যে ১৯৫২ র হেলসিংকি অলিম্পিকে পদক জেতার পর কেন ১৯৫৬র মেলবোর্ন অলিম্পিকে যাননি তিনি। সত্যি কথা হল, সম্পূর্ণ প্রস্তুতি থাকলেও গুরুতর হাঁটুর চোটের জন্য ইচ্ছে থাকলেও অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করা হয়নি তার।
ওনাকে পদ্মশ্রী দেওয়া হয়নি, মৃত্যুর পর অর্জুন পুরস্কার দিলেও স্থানীয় মহারাষ্ট্র সরকার তারা নামাঙ্কিত একাডেমী বানানোর জন্য জমি প্রদান করেননি। বছর কয়েক আগে তার পরিবার জমি কেনার জন্য সেই ১৯৫২র ব্রোঞ্জ মেডেল বিক্রি করার কথা বলেছিল। আজ হাতে গোনা ভারতীয় কেডি যাদবের কৃতিত্বের কথা জানেন। তবে ভারতের খেলার ইতিহাস কিন্তু ২৩শে জুলাই মনে রেখে দেবে খাসাবা দাদাসাহেব যাদবের জন্য।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news