পার্থসারথি পাণ্ডা
দেবতা ও অসুরদের সংগ্রামে অসুর নিধন করতে প্রতিবারই জন্ম হয়েছে নতুন নতুন দেবতার। দেবসেনাপতি কার্তিকের আবির্ভাবও সেভাবেই। সেই জন্মের কাহিনি আমরা পাই রামায়ণ, মহাভারত থেকে শুরু করে শিবপুরাণ, পদ্মপুরাণ, বরাহপুরাণ প্রভৃতিতে। স্বাভাবিকভাবেই নানান কবির হাতে পড়ে, তাঁদের কল্পনার পাখায় চড়ে বিচিত্ররূপ পেয়েছে সে জন্মকাহিনি।
তারকাসুর নামের এক অসুরকে বধ করার জন্য প্রয়োজন ছিল সাত দিন বয়সী শিবপুত্রের। অন্য কেউ তাকে মারতেই পারবে না, এমনটাই বর পেয়েছিল তারকাসুর। এই বরের জোরে সে যখন স্বর্গের দেবতাদের ওপর বাড়াবাড়ি রকমের অত্যাচার শুরু করল, তখন দেবতারা খুব চেষ্টা করলেন শিবকে পুত্র উৎপাদনের জন্য উদ্যোগী করতে। কিন্তু শিব তখন মহাযোগে মগ্ন, কিছুতেই সে ধ্যান আর ভাঙে না। তখন অন্য উপায় না দেখে তাঁর সেই অখণ্ড ধ্যান ভঙ্গ করতে রতি ও মদনদেবকে পাঠানো হল। তাঁদের কামনাময় নৃত্যগীতেও যখন শিবের ধ্যান ভাঙল না, শরীরে রোমাঞ্চ হল না; তখন বাধ্য হয়ে কামদেব শিবের ওপর কামবাণ নিক্ষেপ করলেন। তারই অভিঘাতে শিবের ধ্যান ভেঙে গেল, তিনি ক্রুদ্ধ হলেন, তাঁর তৃতীয় নয়ন খুলে গেল এবং সেখানে থেকে বিধ্বংসী আগুন বেরিয়ে এসে মদনদেবকে ভস্ম করে ফেলল। কিন্তু ততক্ষণে কামের বাণ শিবের শরীরে ক্রিয়া করতে শুরু করেছে, তিনি অসম্ভব কাম তাড়িত হলেন, শুরু করলেন পার্বতীর সঙ্গে রতিক্রিয়া। রতিরঙ্গে কেটে গেল দীর্ঘ বত্রিশ বছর, তবু শিবের মনে হতে লাগল এ যেন পলমাত্র সময়। এদিকে দেবতারা অধৈর্য হয়ে উঠলেন, রতিকর্ম শেষ না হলে পার্বতীর গর্ভ সঞ্চার হবে কেমন করে! গর্ভ না হলে পুত্রের জন্ম হবে কেমন করে! সেই পুত্রের জন্ম না হলে তারকার হাত থেকেও তো নিস্তার নেই। দেবতারা এতটাই ধৈর্যহারা হলেন যে, হর-পার্বতীর রতিকর্মের মাঝে তাঁদের তাড়া দিতে অগ্নিকে দূত হিসেবে পাঠালেন। অগ্নি হাঁসের রূপ ধরে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করে শিবের কানে কানে গিয়ে শিগগির রতিকর্ম শেষ করার কথা বললেন। এতেই শিব-পার্বতীর আবেশ কেটে গেল, দুজন দুজনের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হলেন। তখনই বীর্যস্খলন হল শিবের। শিব সেই বীর্য অগ্নিকে ধারণ করতে বললেন। কিন্তু হংসরূপী অগ্নি তাঁর ঠোঁটে সেই বীর্য ধারণ করেও রক্ষা করতে পারলেন না। তিনি তা নিক্ষেপ করলেন আকাশগঙ্গার বুকে। গঙ্গাও তা ধারণ করতে না পেরে নিক্ষেপ করলেন শরবনে। এই শরবনেই জন্ম হল একটি শিশুর। জন্ম নিয়েই সে খিদের চোটে কেঁদে উঠল। তখন ছ’জন কৃত্তিকা স্নান করছিলেন আকাশগঙ্গায়। তাঁরা ছুটে এলেন শরবনের কাছে, দেখলেন ক্ষুধার্ত শিশুটিকে, অপূর্ব তার রূপ; তাকে দেখে তাঁদের মনে বাৎসল্য জেগে উঠল, তাকে স্তন্যপান করানোর জন্য সকলেই একসঙ্গে অধীরা হলেন। তাঁদের সবার ইচ্ছে পূর্ণ করতে শিশুটি ছ’টি মাথা উদ্ভূত করল। ছয় মুখ দিয়ে সে একসঙ্গে ছয় কৃত্তিকার স্তন্যপান করে তাদের ধন্য করল। শিশুটি এই ছয় কৃত্তিকা দ্বারা লালিতপালিত বলে তার নাম হল ‘কার্তিকেয়’ বা ‘কার্তিক’। ছয় মুখে তাদের স্তন্য পান করেছিল বলে তার নাম হল ‘ষড়ানন’। শরবনে জন্ম হয়েছিল বলে তার নাম হল ‘সারস্বত’। এমনতর তার আরও অনেক নাম রয়েছে।

মৎস্যপুরাণ ও অগ্নিপুরাণে কার্তিকের যে বর্ণনা পাওয়া যায় তাতে, তিনি কখনও দুই হাতযুক্ত, কখনও ছয় ও বারো হাতবিশিষ্ট এবং এক ও ছয় মুখবিশিষ্ট। এভাবেই তাঁর প্রতিমা নির্মাণের কথা বলা হয়েছে সেখানে। মৎস্যপুরাণে আবার স্পষ্ট করেই বলা আছে যে, গ্রামে পুজো করতে হলে কার্তিক প্রতিমা হবে দুই হাতবিশিষ্ট, শহরে চার হাতবিশিষ্ট এবং মহানগরে বারো হাতবিশিষ্ট হতে হবে। এইসব হাতে শস্ত্র হিসেবে থাকবে—শক্তি, পাশ, খড়্গ, শর, শূল, অভয়, ধনুক, পতাকা, মুষ্টি, তর্জনী, তাম্রচূড়। তাঁর গায়ের রঙ হবে সোনা উত্তপ্ত করলে যে বর্ণ হয়, তেমনি। কার্তিকের জন্মের পর পরই তাঁকে বড় হয়ে যেতে হয়েছে। পিতা শিব তাঁকে সেনাপতির পদ ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি হয়েছেন দেবসেনাপতি। গরুড় তাঁকে ময়ূর দিয়েছেন বাহন হিসেবে ব্যবহার করার জন্য। তিনি এইভাবে অস্ত্রে-অলংকারে সাজসজ্জায় সজ্জিত হয়ে তারকাসুরকে বধ করে দেবতাদের স্বস্তি দিয়েছেন। ‘মহাভারত’ অনুসারে কার্তিক কিন্তু চিরকুমার নন, জন্মের ছ’দিনের দিন তিনি বিয়ে করেছিলেন দক্ষের এক কন্যা দেবসেনাকে। এই দেবসেনাই পরবর্তীকালে হয়ে ওঠেন আমাদের ষষ্ঠী দেবী। আর এই মহাভারতের গল্পসূত্র থেকেই দোরে দোরে কার্তিক ফেলে খুনসুটি করার যে প্রবণতা, তার জন্ম। এবার আসি সে-প্রসঙ্গে…
মহাভারতের গল্পে কার্তিকের এক নাম ‘স্কন্দ’। তিনি যে ছয় কৃত্তিকার দ্বারা লালিত-পালিত হন তাঁরা প্রত্যেকেই ঋষিপত্নী। কিন্তু ঋষিরা কার্তিককে মেনে নিতে পারেননি, কৃত্তিকাদের সঙ্গে অন্য পুরুষের সম্পর্ক থেকে কার্তিকের জন্ম হয়েছে সন্দেহ করে কৃত্তিকাদের তাড়িয়ে দেন তাঁরা। বিতাড়িত কৃত্তিকাদের মায়ের সম্মান দেন কার্তিক এবং নিজের পূজা প্রচারের কাজে লাগান। প্রচারের কাজটা হয় একটু বাঁকা পথে। তিনি কৃত্তিকাদের বলেন যেসব ছেলেমেয়েদের বয়স ষোল পার হয়নি তাদের নানারকম অনিষ্ট করতে। সেইসঙ্গে নিজের অনুগত যেসব ‘গণ’ কিম্বা ‘অপদেবতা’ ছিল তাদের আদেশ দিলেন গর্ভস্থ ভ্রুণ নষ্ট করতে। তাদের সম্মিলিত আক্রমণে সংসারে মানুষ পুত্রকন্যা হারিয়ে হাহাকার করে উঠল। আর ঠিক তখনই প্রচারিত হল যে, কার্তিকের পুজো করে তাঁকে তুষ্ট না করলে এইসব বিঘ্ন নাশ হবে না, অপুত্রক পুত্র পাবে। এখান থেকেই সন্তানকামী ও সন্তানের মঙ্গলপ্রার্থী গেরস্তের কাছে পূজনীয় হয়ে উঠলেন কার্তিক। সন্তানের শুভাশুভের অধিষ্ঠাতা দেবতা হয়ে ওঠার জন্যই অনেক পরবর্তীকালে (কবে থেকে, কার্তিকই জানেন!) স্পর্শকাতর গেরস্তের দোরে কার্তিক ফেলে তাঁকে বিপাকে ফেলার প্রবণতাও শুরু হল। কারণ, দোরে কার্তিক পড়লে তাঁর পুজো না-করে বিসর্জন দিলে বা উপেক্ষা করলে যদি সন্তানসন্ততির ক্ষতি হয়, সেই আশঙ্কা থেকেই ‘দোরে কার্তিক পড়লে পুজো করতেই হবে’—এমন ধারণার জন্ম। দেবসেনাপতি থেকে সন্ততিদের রক্ষাকারী দেবতা হয়ে ওঠার পর কার্তিকের পত্নীও ধীরে ধীরে সন্তানের শুভাশুভের অধিষ্ঠাত্রী দেবী ষষ্ঠী হয়ে ওঠেন। সেটা হয়েছিল প্রায় আঠেরো শো বছরেরও আগে, কারণ, তখনকার যৌধেয় মুদ্রায় একইসঙ্গে কার্তিক ও ষষ্ঠীদেবীর মূর্তি আঁকা আছে।

এসব তো গেল রামায়ণ, মহাভারত ও পৌরাণিক যুগের কথা। সেখানে না হয় কার্তিকের একটা জন্মকাহিনি পেলাম, উদ্ভবের গল্প পেলাম, রূপের বর্ণনাও পেলাম। তার আগে? তার আগে যে বৈদিক যুগ, সেখানে কার্তিক বলতে কাকে বোঝানো হত? আসলে, বেদে তিনি ছিলেন অগ্নিরই আর এক রূপ। সামবেদে অগ্নির এক শিখা বোঝাতে ‘শিখী’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। পরবর্তীকালে শব্দের অর্থ পরিবর্তনের নিয়মে ‘শিখী’ শব্দে ‘ময়ূর’ বোঝানো হতে থাকে। সেই সময় কালের মধ্যে অগ্নি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কার্তিক এক নতুন দেবতা হয়ে ওঠেন (পুরাণে তাই তাঁর জন্ম কাহিনিতে আমরা অগ্নির উপস্থিতি দেখতে পাই), এবং ময়ূর হয়ে ওঠে তাঁর বাহন। বৈদিক যুগে যে ‘শিখী’ বা শিখায় ভর করে অগ্নি উদ্দীপিত হত, পরবর্তীকালে সেই ‘শিখী’ বা ময়ূরে ভর করেই কিন্তু কার্তিক জগতে পরিভ্রমণ করেন। অর্থের পরিবর্তন হলেও ব্যঞ্জনায় কিন্তু মিল আছে! কালের আখরে কার্তিকের ভাবমূর্তি বার বার পরিবর্তিত হয়েছে, সংস্কৃত সাহিত্যের যুগে তিনি চোরদের দেবতা হয়ে উঠেছিলেন। এক্ষেত্রে তিনি গণেশের জায়গা নিয়েছিলেন। চালাক গণেশ তাঁকে বার বার ঠকিয়েছেন, সেই বিয়ের জন্য ব্রহ্মাণ্ড পরিভ্রমণ থেকে চোরদের দপ্তর গছিয়ে দেওয়া অবধি সবকিছুতেই। এতে মন্দের ভালো একটা হয়েছিল। এই গোবেচারাপনার জন্যই উনিশ শতকের বাবুকালচার ছুৃঁয়ে একজন নিপাট বাঙালি ভদ্রলোকের প্রতিভূ হয়ে উঠতে পেরেছেন এবং সমানভাবে পূজনীয়ও থাকতে পেরেছেন কার্তিক।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news