পার্থসারথি পাণ্ডা 
১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্টেও কাশ্মীর ছিল স্বাধীন দেশীয় রাজ্য। রাজা ছিলেন হরি সিং। তিনি তখন জল মাপছিলেন কোন দিকে যাবেন, পাকিস্তানে, না ভারতে; নাকি স্বাধীন রাজ্য হিসেবেই কাশ্মীরের অস্তিত্ব বজায় রাখবেন? তবে সেখানকার ন্যাশনাল কনফারেন্সের প্রভাবশালী নেতা শেখ আবদুল্লার বরাবরের দুর্বলতা ছিল ভারতে যোগ দেওয়ার। কিন্তু এই নিয়ে যখন টালবাহানা চলছে তখনই পাকিস্তান পুস্ত সেনাদের অনুপ্রবেশ ঘটাতে শুরু করল কাশ্মীর দখলের ষড়যন্ত্র করে, এতে হরি সিং এর টনক নড়ল। তিনি দেখলেন তাঁর সামনে সমূহ বিপদ, পাকিস্তান তলে তলে কাশ্মীর দখল করে নিতে চাইছে, এটা ঘটলে তাঁরই অস্তিত্বের সঙ্কট। ফলে তিনি ভারতের শরণাপন্ন হলেন। সাহায্য চাইলেন। তখন ‘ইন্সট্রুমেন্ট অব অ্যাকসেস’ চুক্তিপত্রে সই করে ভারতকে অধিকার দিলেন কাশ্মীরে সেনাস্থাপনের এবং কাশ্মীরকে স্বশাসিত রাজ্য হিসেবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হতে দিলেন। সেটা ২৬ অক্টোবর, ১৯৪৭।
স্বাধীনতার পর পরই দুটো নতুন দেশ যুদ্ধে মাতল, অনুপ্রবেশের ইস্যু নিয়ে, কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে, যাকে বলা হয় প্রথম ভারত-পাক যুদ্ধ—এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলল এই যুদ্ধ, অধিকৃত কাশ্মীর পুরো উদ্ধার হল না, যুদ্ধ শেষ হল। কিন্তু কাশ্মীর সমস্যা, সেনা অনুপ্রবেশের সমস্যা থেকেই গেল। কাশ্মীরের প্রতি পাকিস্তানের লোভের যথেষ্ট কারণ আছে, কাশ্মীর মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় ধর্মের আবেগে ধুনো দিয়ে এই অঞ্চলটিকে প্রবলভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে, ভারতকে সন্ত্রস্ত করে রাখা যাবে, এখান থেকে ভারতের ওপর নজরদারি রাখা আর চাপ সৃষ্টি করা যাবে ভালোভাবে; পাকিস্তানের সিন্ধুপ্রদেশের জলের জোগান দেয় যে নদীগুলো তা সমস্তই ভারতের এই অঞ্চল থেকে উদ্ভূত হয়ে পাকিস্তানের এই অঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে, তাই এই অঞ্চলটিকে দখল করে নিতে পারলে কূটনৈতিকভাবে জলের জন্য ভারতের সঙ্গে সমঝোতা করতে হবে না; তাছাড়া পৃথিবীর পর্যটন মানচিত্রে কাশ্মীরের গুরুত্ব অপরিসীম, অর্থনৈতিক দিক থেকে এ অঞ্চল দখলে আনতে পারলে এদিক থেকে প্রচুর আয় সম্ভব। মূলত এইসব কারণেই বারে বারে পাকিস্তান ভারতের সঙ্গে যুদ্ধের উস্কানি চালিয়ে গেছে এবং চালিয়ে যাচ্ছে।
১৯৯৯ এর কারগিল যুদ্ধের আগে আরও তিনবার ভারত পাক যুদ্ধ হয়ে গেছে। ১৯৯৮ এ ভারত দ্বিতীয়বারের জন্য পরমাণু পরীক্ষায় সফলতা লাভের কয়েকদিনের মধ্যেই পাকিস্তান পরমাণু পরীক্ষা করল এবং কাশ্মীরের কার্গিল অঞ্চলে অনুপ্রবেশ করল। এখান থেকেই কার্গিল যুদ্ধ, সেই যুদ্ধ মাস দুই চলল, শেষ হল ২৬ জুলাই ১৯৯৯। এই যুদ্ধের সময় লক্ষনীয়ভাবে যেটা দেখা গিয়েছিল, সেটা হল সেনার মনোবল আরও বাড়িয়ে দেওয়ার কাজে, যুদ্ধের খরচ তোলার কাজে বলিউডের সক্রিয় অংশগ্রহণ। জলসা করে টাকা তুলে সরকারের সামরিক খাতে দেওয়া থেকে শুরু করে বলিউডের স্টারদের সেনা ছাউনিতে গিয়ে সেনাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা, সময় কাটিয়ে আসা—এসব তখন হামেশাই লক্ষ্য করা গেছে। শুধু তাই নয়, কার্গিল যুদ্ধের বিজয় গৌরব ও এই যুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে তৈরি হতে লাগল একের পর এক ছায়াছবি।

২০০৩ সালে সওয়া চার ঘন্টার একটি ছবি তৈরি হল। নাম, ‘এল ও সিঃ কারগিল’। পরিচালক – জে পি দত্তা। ছবিটিতে ‘অপেরেশন’ বিজয়ে ভারতীয় সেনার লড়াই ও আত্মত্যাগের অনবদ্যগাথা তুলে ধরা হয়েছে। শুধু তাই নয়, এতে ব্যবহৃত হয়েছে কার্গিল যুদ্ধের ফুটেজ এবং বফরস কামান, যে কামান দিয়ে সম্ভব হয়েছিল পাকিস্তানী সেনাদের পিছু হঠানো এবং পরাজিত করা। যুদ্ধের এক বছর আগে পরিচালক জে পি দত্তা তৈরি করেছিলেন ‘বর্ডার’ ছবিটি। এতে তিনি দেখিয়েছিলেন ১৯৭১ এর ভারত-পাক যুদ্ধে ভারতীয় সেনার আত্মত্যাগের কাহিনী। ১৯৭১ এর সিমলা চুক্তিতে যে ‘এল ও সি’ লঙ্ঘন না করার কথা পাকিস্তান বলেছিল, সেই চুক্তিরই তারা চাওরম অপমান করেছে ১৯৯৯এ। এদিক থেকে ‘বর্ডার’ আর ‘এল ও সিঃ কার্গিল’ ছবি দুটি একসূত্রে গাঁথা।
অভিনেতা সানি দেওলের অভিনীত এই সময়কালের ছবিগুলোতে দেশভক্তি ও ভারতীয় সেনার বীরগাথার কথা উঠে এসেছে। তিবে সানির ছবিগুলোতে মূলধারার বাণিজ্যিক ছবির ফর্মুলা মেনে নায়ক একাই একশো, সেনার সমবেত লড়াই সেখানে পিছনে পড়ে যায়। তবু, এই যুদ্ধের পর ২০০২ সাল নাগাদ রিলিজ করে তাঁর ‘মা তুঝে সালাম’ ছবিটি। এতে তাঁর ‘দুধ মাঙ্গো তো ক্ষীর দেঙ্গে, কাশ্মীর মাঙ্গো তো চির দেঙ্গে’ প্রবলভাবে জনমানসে জনপ্রিয় হয়েছিল।

২০০৩ এ ‘ধূপ’ নামে একটি ছবি মুক্তি পায়। কার্গিল শহীদের একটি পরিবারের কথা বলে হয়েছে এ ছবিতে। শহীদের প্রতি সরকারী অনুদান এবং লাল ফিতের ফাঁসে সেই অনুদান আটকে থাকায় পরিবারের যন্ত্রণার কথা বলা হয়। যেখানে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে সমস্যার সমাধান ঘটে। এখানে যুদ্ধ ও যুদ্ধ পরবর্তী আর এক যুদ্ধের কথা বলা হয়েছে।

যেসব বলিউড তারকা সেনাদের কাছে ছুটে গিয়েছিলেন কার্গিল যুদ্ধের সময়, তাঁদের মধ্যে একজন রবীনা ট্যন্ডন। তিনি সেখানে তিন দিন ছিলেন। এই তিনদিনের অভিজ্ঞতা তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেছিল সেনার এই লড়াই নিয়ে ছবি প্রযোজনা করতে। তিনি বানিয়েছিলেন ‘স্টাম্পড’। এতে ভারতীয় সেনার যুদ্ধক্ষেত্রে পাকিস্তানকে হারানোর লড়াই আর ভারতীয় ক্রিকেটারদের মাঠে পাকিস্তানকে হারানোর লড়াই মিলেমিশে এক জাতীয়তাবোধের কাছে এক হয়ে গিয়েছিল।
আর একটা ছবির কথা বলতে হয়, সেটা হল ফারহান আখতারের পরিচালনায় ‘লক্ষ্য’ ছবিটি। সেখানে হিরোর অগোছালো জীবনের মানে খুঁজে পায় গিয়ে ভারতীয় সেনার অনুশাসনের মধ্যে পড়ে, দেশের জন্য বাঁচা ও দেশের হয়ে লড়াই করার মধ্য দিয়ে। এই ছবিরও প্রেক্ষাপট কার্গিল যুদ্ধ।
সাম্প্রতিক কালে অভিনেতা পঙ্কজ কাপুর পরিচালনা করেছেন ‘মৌসম’ (২০১১) ছবিটি। এতে বলা হয়েছে কার্গিল যুদ্ধের সময়ের এক এয়ার ফোরস অফিসারের জীবন ও আত্মত্যাগের গল্প।

দেশ ভাগ নিয়ে, স্বাধীনতা আন্দোলন নিয়ে ভারতীয় ভাষায়, বলিউডে হিন্দিতে অনেক ছবি হয়েছে, সেসব ছবির নানান দৃষ্টিকোণ, তারই পাশাপাশি কার্গিল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মিত ছবিগুলোও সেই দৃষ্টিকোণের বৈচিত্র্যে অনবদ্য। সমৃদ্ধ।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news