পার্থসারথি পাণ্ডা
ঝোড়ো হাওয়া আর বৃষ্টি ভেজা এক রাতে ‘নিশ্চিত আশ্রয়ের’ খোঁজে ইন্দ্রজিৎ দত্তের সঙ্গে ‘আমরা’ ঢুকে পড়ি একটি পোড়োবাড়িতে। সে বাড়ির দমবন্ধ করা অন্ধকার একটি ঘর, সাজানো গোছানো, কিন্তু রহস্যময়। আমরা যখন ইন্দ্রজিৎ-এর সঙ্গে প্রথম সেই ঘরে ঢুকলাম, তখন সেই ঘরের ভৌতিক ছায়াচ্ছন্নতার মাঝে প্রবল অস্তিত্ব নিয়ে উপস্থিত ছিল নাটকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্র, ‘সময়’—মনোজগৎ এবং সচল দেওয়াল ও হাতঘড়িতে তার দাপট ক্রমশ দৃশ্যমান। সমস্ত আখ্যানজুড়ে সে-ই যেন নিয়তির মতো মধ্যরাত্রি থেকে হাতের তাস ফেলতে ফেলতে কাহিনিকে এগিয়ে নিয়ে যায় ভোরবেলার অমোঘ পরিণতির দিকে। ঘটনাকে, প্রতিটি চরিত্রকে সে যেন সময়বন্ধনীতে বেঁধে ফেলে মুহূর্তের হিসেবে।
লেখার শুরুতে ‘নিশ্চিত আশ্রয়’ কথাটাকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করেছি, একটা প্রশ্ন থেকেই, ‘নিশ্চিত আশ্রয়’ বলে কি সত্যিই কিছু আছে? ঝড়বৃষ্টির রাতে পাহাড়ি রাস্তায় সাধের বিএমডাব্লিও নিয়ে একা ড্রাইভ করে আসতে গিয়ে ইন্দ্রজিৎ-এর গাড়িটা অ্যাকসিডেন্ট করে অচল হয়ে পড়ে, সে নিজেও আহত হয়, এই নির্জনতায় সঙ্গীহীন দুরবস্থায় সামনের পোড়ো বাড়িটাকেই তার আপাতভাবে নিশ্চিত আশ্রয় বলে মনে হয়েছিল। কমিউনিস্ট বাবার নিম্নমধ্যবিত্ত জীবন থেকে উঠে আসা ইন্দ্রজিৎ উচ্চাশা নিয়ে সাধারণ ‘বেচুবাবু’ থেকে পথের কাঁটাদের মাড়িয়ে সরিয়ে একটি বড় কোম্পানির সেলস এগজিকিউটিভ হয়ে উঠে প্রিয় ফ্যামিলি ও নিজেকে একটি নিশ্চিত আশ্রয় দিতে চেয়েছিল। কিন্তু কাহিনি যত এগিয়েছে, ততই স্পষ্ট হয়েছে ‘নিশ্চিত আশ্রয়’ কথাটা ক্ষণিকের আত্মতুষ্টি ছাড়া আর কিছুই নয়। আসলে, ‘প্লে হাউস’ আমাদের সেক্সপিয়র কথিত জীবন রঙ্গমঞ্চের কুশীলবদের আত্মবীক্ষা ও অসহায়তার দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

‘সময়’ ছাড়াও পোড়ো বাড়িটিতে আর একজন চরিত্র আছেন, তিনি পিণাকী সামন্ত, রিটায়ার্ড জাজ। তিনি ইন্দ্রজিত-কে আতিথ্য দেন। মোমবাতির এক চিলতে আলোয় ঘরটিকে তিনি আরও রহস্যময় করে তুললে ঝোড়ো হাওয়ার মতো আরও তিনটি চরিত্র ঘরে এসে ঢোকে—ডিফেন্স লইয়ার বিষ্ণুপদ ঘোষ, জেইলার গৌতম এবং পাবলিক প্রসিকিউটর ব্রহ্মতোষ হাজরা। তাঁদের কথাবার্তা ও আলাপচারিতায় এক অলৌকিকতার শিহরণ ঠাণ্ডা স্রোত হয়ে বয়ে যায় শিরদাঁড়া বেয়ে সমস্ত প্রেক্ষাগৃহে। তার ঘোর থাকতে থাকতেই জানা যায় নিদারুণ এক খেলার কথা। বিচার বিচার খেলা; তাতে রায় দেবার জন্য জাজ আছেন, শাস্তি কার্যকর করার জন্য জেইলার আছেন, পাবলিক প্রসিকিউটার আছেন, ডিফেন্স লইয়ার আছেন, শুধু নেই অপরাধী; সেটাই হতে হবে ইন্দ্রজিৎকে। তাকে সাবধান করা হয়, এটা খেলা হলেও এর পরিণাম কিন্তু এগিয়ে যাবে রূঢ় বাস্তবের দিকে। তখন অপরাধ প্রমাণিত হলে যা শাস্তি দেওয়া হবে, তাই মেনে নিতে হবে অপরাধীকে। তবুও এটাকে নিছকই একটা খেলা ভেবে নিয়ে এই খেলায় যোগ দিতে ইন্দ্রজিৎ খানিকটা দোনাচলের পর অবশেষে রাজি হয়ে যায়। কারণ, তার বিশ্বাস, জীবনে সে কোন অপরাধই করেনি।
শুরু হয় খেলা। এই খেলাটাই এক সময় দাঁড় করিয়ে দেয় ইন্দ্রজিৎকে আত্মসমীক্ষার আয়নার সামনে। এই আয়নাটার সামনে কখনই মুখোমুখি দাঁড়ায়নি এর আগে উচ্চাশার ফানুস ওড়াতে থাকা ইন্দ্রজিৎ। এবং আমরাও। লেখার শুরুতে ‘আমরা’ শব্দটা তাই বিশেষভাবে চিহ্নিত করেছিলাম। আমরাও এই কাহিনির পরোক্ষ পাত্র হয়ে উঠি এখান থেকে, আমাদেরও শুরু হয় আত্মবিশ্লেষণ। আপাত নিরপরাধী আমরাও কি আসলেই কোন-না-কোনভাবে অপরাধী নই! ইন্দ্রজিতের মতো বা তার কাছাকাছি?
কাজ বাঁচাতে ইউনিয়ন লিডারকে ফাঁসানো, বসের স্ত্রীর সঙ্গে পরিকল্পনামাফিক পরকীয়া সম্পর্ক তৈরি করে পরোক্ষভাবে বসকে খুন করা সমস্তই উঠে আসে ইন্দ্রজিতের স্বীকারোক্তিতে। স্বীকারোক্তি ও আত্মবিশ্লেষণের নেশা পেয়ে বসে তাকে। যতটা উঠেছে, ততটাই নেমেছে। নতুন করে নিজেকে চেনে সে। আশ্চর্য সমাপতনে এদিনই তার জন্মদিন!

কাহিনির প্রতিটি চরিত্রের ভারতীয় পুরাণ ছোঁয়া নাম বিশেষ ইঙ্গিতবহ। ইন্দ্রজিৎ যেন গ্রিক ট্রাজেডির নিয়তিতাড়িত নায়ক। তার সাধ ও আহ্লাদের ফানুস নিভতে শুরু করে গাড়ির অ্যাসিডেন্টের মধ্য দিয়ে, মোবাইলটাও কাজ করে না। এমন একটা অসহায় অবস্থায় নিয়তি যেন তাকে টেনে নিয়ে আসে নির্জন বাড়িটায়, বাইরের পৃথিবীর যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন এই নির্জনতায় না এলে আত্মার মুখোমুখি হওয়া যায় না, আত্ম-উপলব্ধি হয় না। কিন্তু সব রত্নাকর তো আর বাল্মীকি হতে পারে না! তাই ট্রাজেডির নায়কের মতোই আত্মবীক্ষায় দীর্ণ হতে হতে তাকে এগিয়ে যেতে হয় অমোঘ পরিণতির দিকে। মাসাহিরো সিনোদার ‘ডাবল সুইসাইড’ ছবির মতোই ছায়াময় চরিত্রেরা প্ররোচিত করে এগিয়ে দেয় ইন্দ্রজিতকে অমোঘ এক পরিণতিকে মেনে নিতে । একটা সময় মনে হয় এরা ছায়াময়, নাকি আমাদের চেতনারই এক একটি স্তর! চেয়ার থেকে চেয়ারে তাদের স্থান বদল এক অদ্ভুত ইঙ্গিতময় মায়ার সৃষ্টি করে, বুঝিয়ে দেয় অপরাধী আর বিচার আসলে অবস্থান বদলের মায়া। সেই মায়ার মাঝে চারের দশকে তালাত মেহমুদের গাওয়া ‘চাঁদের এতো আলো’ এবং ছয়ের দশকে লতার গাওয়া ‘আজিব দাস্তাঁ’ গান দুটির নাটকীয় প্রয়োগ কাহিনিতে অন্য এক মাত্রা এনে দেয়। তবে নাটকের শেষে এসে ‘আমরা’ ধাক্কা খায়, ইন্দ্রজিৎ-এর শেষ বিচার মাথা পেতে নেবার আর্তিটা আমাদের ভাবায়, কিন্তু কাঁদায় না। তার বিশ্রাম নিতে গিয়ে অনন্ত বিশ্রামের দিকে এগিয়ে যাওয়ার যে পথ, তাতে তার পরিণতি আমাদের চমকিত করে, সেদিকে এগিয়ে যেতে প্রলুব্ধ করে না। সেই নিয়তিতাড়িত নেতির দিকে না-নিয়ে যাওয়ার জন্যই কি ইন্দ্রজিৎ-এর যন্ত্রণা ও আর্তি থেকে আমাদের ধীরে ধীরে সরিয়ে চমকের দিকে নিয়ে যাওয়া হল? হয়তো।

মঞ্চের সামনের রহস্যময় আলোকিত অংশের পিছনেই যে অন্ধকার, তা আরও রহস্যময়। সেই রহস্য থাকা এবং না-থাকার অনিশ্চয়তায় মোড়া। সেই অন্ধকার থেকে প্রথম জাজ আসেন, তারপর খাবার আনা হয়, দড়ি এবং হাতুড়িও আসে, মনে হয়েছিল সেখানেও রয়েছে আশ্রয়ের অন্যতর কক্ষ; কিন্তু ইন্দ্রজিৎ যখন শেষ বিশ্রামের আশায় সেখানে গেল তখনই বোঝা গেল যে, তা আসলে নিকষ অন্ধকারের চরম নিরাশ্রয় ছাড়া আর কিছুই নয়। পরিচালক কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায় এভাবেই উপলব্ধির নানান পরত বুনতে বুনতে অসাধারণ এই নাটকটি নির্মাণ করেছেন। তাঁর ছবির মতোই তাঁর নাটকের এই পরতগুলো মনের মধ্যে একটা মুগ্ধতার আবেশ, একটা ঘোর তৈরি করে, যা থিতিয়ে উঠতে লাগে দীর্ঘ একটা সময়।
রাসবিহারী শৈলুষিক-এর এই ‘প্লে-হাউস’ আসলে সুইস সাহিত্যিক ফ্রেডরিক ডুরেনম্যাটের ‘আ ডেনজারাস গেম’ (১৯৫৬) উপন্যাসের বাংলা নাট্যরূপ। বিদেশি গল্পের বংলা রূপান্তর বেশ কঠিন, কিন্তু সেই কঠিন কাজটাই সুন্দরভাবে করেছেন পদ্মনাভ দাশগুপ্ত। নাটকের পরবর্তী শো ৭ ডিসেম্বর, মিনার্ভা থিয়েটারে।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news