Breaking News
Home / TRENDING / কাদেরের সফরনামা: কাবুল থেকে বস্তি, বস্তি থেকে বলিউড

কাদেরের সফরনামা: কাবুল থেকে বস্তি, বস্তি থেকে বলিউড

 পার্থসারথি পাণ্ডা

আব্দুল রহমান ও ইকবাল বেগমের তিন ছেলে শামসুর রহমান, ফজল রহমান ও হাবিবুর রহমান। কিন্তু অদ্ভুতভাবে তিনটি ছেলেই আট বছর বয়সে পর পর মারা গেল। ১৯৩৭ সালের ২২ অক্টোবর জন্ম হয়েছিল তাঁদের শেষ সন্তান কাদের-এর। দাদাদের মৃত্যুর সময় কাদের খুবই ছোট। তাঁর জন্য তখন বাবামার খুব চিন্তা হতে লাগল, এ-ছেলেও অকালে চলে যাবে না তো! বাবা ভাবলেন, ভিটের দোষে তাঁর ছেলেরা অকালে চলে গেল না তো! তেমনটা হলে ছোট ছেলেটিকে বাঁচিয়ে রাখতে এখানে তো আর থাকা চলে না। কিন্তু তাঁরা গরীব মানুষ, গেলে যাবেনই বা কোথায়!

জমজমাট নগর বোম্বাই। সেখানে যেতে পারলে কিছু করেকম্মে অন্তত পেট চালানো যাবে। তাই শেষমেশ স্থির হল ছোট্ট কাদেরকে নিয়ে তাঁরা বোম্বাই যাবেন। কোনরকমে কষ্টেশিষ্টে তাঁরা বম্বে এসে পৌঁছলেন। সেখানে তাঁদের তিনকুলে কেউ নেই। থাকবেন কোথায়? কোথায় আবার, গরীবের ঠিকানা বস্তি। সুতরাং উঠলেন গিয়ে কামাটিপুরা বস্তিতে। বস্তি মানেই মদের ঠেক, জুয়ার ঠেক, জঞ্জালের স্তূপ, নোংরা, খিস্তিখামারি, বেশ্যাদের ব্যবসা, সমাজবিরোধীদের আড্ডা, সকালে বিকেলে খুন। এই রকম একটা পরিবেশে এক চিলতে ঘরে ছোট্ট কাদের বড় হতে লাগলেন।

বাবা আরবি জানতেন, শুরু করলেন ছাত্র জুটিয়ে আরবি পড়াতে। কিন্তু বস্তিতে শিক্ষিত লোকের কদর কোথায়! হাঁড়ির হাল বেহাল হল। অভাব নিয়ে এলো রোজ দিনের ঝগড়া। কাবুলে আর যাই হোক তিন বেলা রুটির অভাব ছিল না। কিন্তু এখানে এসে দেখলেন সেটা যেন স্বপ্ন। বাবা তাঁর আরবি বিদ্যেটুকু নিয়ে না-পারলেন কুলিমজুর হতে, না-পারলেন বিদ্যে বেচে ঘরের অভাব মেটাতে। মায়েরও বাইরে গিয়ে রোজগার করার কোন উপায় ছিল না। ফলে, অভাবকে কেন্দ্র করে মিঞাবিবির দাম্পত্য এমন তেতো জায়গায় গিয়ে ঠেকল যে, দুজনের তালাক হয়ে গেল। তালাক হতেই মামা আর মামা-দাদু হাজির হলেন সেখানে। ছেলেকে নিয়ে একা মেয়েমানুষের বস্তিতে থাকা ভালো দেখায় না, তাই জোর করে আবার মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিলেন তাঁরা। মা প্রথমটায় কিছুতেই দ্বিতীয় বিয়ে করতে চাননি কিন্তু যখন মামা ও দাদু দুজনে বোঝালেন যে, কাদেরের ভবিষ্যতের জন্য বিয়েটা দরকার, তাকে মানুষ করার জন্য টাকা চাই, মাথার ওপর একজন অভিভাবক তো চাই—তখন মা ছেলের মুখ চেয়ে বিয়েতে রাজি হলেন।

সৎবাবা কাদেরকে মোটেই পছন্দ করতেন না। এমনকি মা-ছেলের তেমন পরোয়াও করতেন না। ডুংরিতে টেন্টনপুরা গলিতে টেন্টনপুরা মসজিদ। তিনি সেখানকার ইমাম। কিন্তু বিয়ের পরেও মা ইকবাল বেগমের যেই অভাব সেই অভাবই রয়ে গেল, বরং অবস্থা আরও বেহাল হল। নিয়ম হয়ে গেল, সপ্তাহে তিন দিন খাওয়া, তিন দিন উপোষ। একদিন আধপেটা। ছোট্ট কাদের মসজিদে গিয়ে সৎবাবার কাছে গিয়ে ধর্না দেয়, ভিক্ষে চায় দু’টাকা। সপ্তাহের খোরাকি দু’টাকা। সেটা দিতেও বাবার মন চায় না। গুচ্ছের গালাগালি হজম করে তবেই পাওয়া যেত ঐ দু’টাকা। ঐ টাকা দিয়ে কেবল তিন দিনের বাজার করা যেত। আটা, কেরোসিন, চাল, নুন, সামান্য ডাল। ব্যস। এই পরিবেশ, পরিস্থিতি এবং এত অভাবের মধ্যেও একটা আশ্চর্য ব্যাপার দেখা গেল, অন্য সন্তানদের মতো আট বছর বয়স হতেই কাদের মারা গেলেন না, আট পেরিয়ে দিব্যি বেঁচে রইলেন।

ইকবাল বেগম প্রথম স্বামীর শিক্ষাটাকে খুব সম্মান করতেন। তাই শত অভাবেও ছেলেকে স্কুলছুট হতে দেননি। ছেলের পড়াশুনোতে বেশ ভালোই। কিন্তু অভাবের মধ্যে ছেলের মন মাঝে মাঝেই বিদ্রোহ করত। তাই একদিন বস্তির ছেলেরা, যারা কাছের ব্যাগ সেলাইয়ের, ডালের খোসা ছাড়ানোর কারখানায় কাজ করে; তারা যখন এসে বলল, ‘পড়ে ঘন্টা হবে, আমাদের সঙ্গে কারখানায় চল, দিনে তিন-চার টাকা রোজগার করবি, তখন দেখবি খাবার আর অভাব হবে না।’ কথাটা সেই মুহূর্তে অভাবের সঙ্গে লড়তে থাকা ছোট্ট কাদেরের একদম ঠিক বলে মনে হল। পরদিন স্কুলে যাবার বদলে ঘরের কোনায় বইয়ের ব্যাগ ছুঁড়ে দিয়ে কারখানার যাবেন বলে যেই দরজা পেরিয়ে রাস্তায় নামতে যাবেন, এমন সময় পেছন থেকে মা এসে কাঁধে হাত রাখেন। বলেন, ‘আমি জানি তুই কোথায় যাচ্ছিস। তোর তিন-চার টাকার রোজগারে আমার অভাব চিরদিনের জন্য মিটবে না, বাবা। পড়াশুনো করে আমার সেই অভাব মেটাতে তুই পারবি, তোকে পারতেই হবে। তুই পড়।’ মায়ের কথার ওপর আর একটাও কথা বলেননি কাদের। চুপচাপ ঘরে ফিরে কোনায় ফেলে দেওয়া বইয়ের ব্যাগ কাঁধে নিলেন, তারপর বেরিয়ে গেলেন স্কুলের পথে।

ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, গণিত তাঁর খুব ভালো লাগত। নীচু ক্লাসের ছেলেদের সেসব পড়িয়ে ও মায়ের সঙ্গে অভাবের সঙ্গে লড়তে লড়তে একদিন তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে ফেললেন। মাসে তিনশো থেকে সাড়ে তিনশো টাকা মাইনেতে একটি পলিটেকনিক কলেজে পড়াতেও শুরু করলেন। নাটকের প্রতি একটা দুর্বলতা তাঁর বরাবরই ছিল। নিজের লেখা একটি নাটক কলেজের ছেলেদের নিয়ে মঞ্চস্থ করলেন। নাটকের পরিচালক তিনিই। অভিনেতাও। নাটকটি বেশ নাম করেছিল। তাঁর কোন ইন্টারভিউ থেকেই এই নাটকের নামটি জানতে পারিনি। তবে, এই নাটকটাই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।

সেটা ১৯৭১ সাল। নাটকটি নিয়ে তিনি একটি নাট্য প্রতিযোগিতায় অংশ নিলেন। সেখানে জাজ হিসেবে ছিলেন নরিন্দর বেদী, রাজিন্দর সিং ও কামিনী কৌশল। এঁরা সবাই সিনেমার লোক। প্রতিযোগিতায় জয়ী হলেন কাদের। পুরস্কার পেলেন নগদ পনেরশ টাকা। তাঁর নাটক দেখে জাজেরা মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। কামিনী তাঁকে ডেকে বললেন, ‘আপনি এত ভালো লেখেন, সিনেমায় লিখছেন না কেন? আপনার মতো শিক্ষিত লোকদেরই তো সেখানে দরকার।’ নরিন্দর বললেন, ‘আমি ‘জওয়ানি দিওয়ানি’ নামের একটা ছবি করছি, আপনি তার ডায়লগ লিখুন।’ কাদের বললেন, ‘সিনেমার ডায়লগ লিখতে তো আমি জানি না।’ নরিন্দর বললেন যে, ও হাতিঘোড়া কিছু ব্যাপার না। তিনি সব বুঝিয়ে দেবেন। ব্যস, মিঠে গেল। ‘জওয়ানি দিওয়ানি’-র ডায়লগ লিখে কাদের পেলেন পনেরশ টাকা। এভাবেই হিন্দি সিনেমার রাইটার হিসেবে তাঁর এন্ট্রি হয়ে গেল। তবে গ্র্যান্ড এন্ট্রি হল এর কিছুদিন পরেই মনমোহন দেশাইয়ের হাত ধরে।

 

মনমোহন দেশাই ‘রোটি’ নামের একটি ছবি বানাবেন। তার ক্লাইম্যাক্স লিখতে হবে। ভালো রাইটার চাই। ততদিনে নরিন্দর বেদীর আরও একখানা ছবি ‘বেনাম’ লিখে বেশ নাম করেছেন কাদের খান। তিনি যোগাযোগ করলেন কাদের খানের সঙ্গে। সরাসরি বললেন, ‘দেখো, তোমরা খানরা ডায়লগ লিখতে পারো না। শের-শায়রির ফোয়ারা ছোটাও। আমার ওসব একদম চাই না, আমার এমন ডায়লগ চাই, যা শুনে লোকে তালি দেবে। পারবে এমন ডায়লগ লিখতে?’ কাদের বললেন, ‘যদি পারি?’ মনমোহন বললেন, ‘তাহলে তোমায় মাথায় করে রাখব।’ ব্যস, চ্যালেঞ্জটা নিয়ে নিলেন কাদের। পরদিন ক্লাইম্যাক্স লিখে হাজির হলেন মনমোহনের কাছে। তিনি তখন পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলছিলেন। তাঁর ভরসা ছিল না, কাদের পারবেন। তাই একটু অবজ্ঞা নিয়েই হালকা গালাগালি দিয়ে খেলা ছেড়ে ক্লাইম্যাক্স শুনতে বসলেন। কাদের শোনালেন। শুনে মনমোহনের এতো ভালো লাগল যে, আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন। বাড়ির টিভি, হাতের সোনার ব্রেসলেট দিয়েও তাঁর যেন উচ্ছ্বাস মেটে না। বললেন, ‘কত টাকা নিবি বল?’ কাদের বললেন, ‘আগের ছবিটা লিখে তো একুশ হাজার পেয়েছিলাম।’ শুনেই মনমোহন বললেন, ‘ধুর, মনমোহনের রাইটার কখনও একুশ হাজারে কাজ করে না। তোকে দেব এক লাখ একুশ হাজার।’ মনমোহনের জন্য লিখেই খ্যাতির শীর্ষে উঠেছিলেন গোল চিত্রনাট্যকার কাদের খান। লক্ষ্মী ও সরস্বতী দুজনেই প্রসন্ন হয়েছিলেন।

বলিউডে তিনিই প্রথম স্ক্রিপ্ট পড়ে রেকর্ড করে দেওয়ার প্রথা চালু করেছিলেন। তাঁর পাঠ শুনে যতি, বিরতি ও চরিত্র বুঝে ডায়লগ ডেলিভার করতে খুব সুবিধে হত অভিনেতাদের। অমিতাভের যেসব ছবির স্ক্রিপ্ট তিনি লিখেছেন, সেগুলোতে তাঁর পাঠ শুনে সেভাবেই ডায়লগ বলতেন অমিতাভ।

ছোটবেলার বস্তিজীবনের লড়াই, চোখের সামনে নানান রঙের চরিত্র দেখার অভিজ্ঞতা, স্কুলকলেজের শিক্ষা সব মিলিয়ে সিনেমার পরিপূর্ণ ও সার্থক লেখক হয়ে উঠতে পেরেছিলেন কাদের খান। লেখার জন্য বেশকিছু পুরস্কারও পেয়েছেন। লেখা ছাড়াও অসংখ্য ছবিতে তিনি কমিক-ভিলেন নানান ধরণের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। সেও এক বিস্তারিত লেখা ও গবেষণার বিষয়।

Spread the love

Check Also

মুখ্যমন্ত্রীর দফতরের দুই গাড়ির চালক কোভিড আক্রান্ত

চ্যানেল হিন্দুস্তান ব্যুরো। এবার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দফতরের দুই গাড়ির চালকের দেহে পাওয়া গেল নভেল …

গত ৮ বছরে ভারতে কমেছে ৭৫০টি বাঘ, চিন্তায় বন দফতর

চ্যানেল হিন্দুস্তান ব্যুরো: ভারতে বাঘের সংখ্যা ক্রমশ কমছে। গত আট বছরে ভারতে প্রায় ৭৫০টি বাঘ …

মোদীর কাছে ‘গুজরাতি খিচুড়ি’ খেতে চাইলেন অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী

চ্যানেল হিন্দুস্তান ব্যুরো: আজ প্রথমবার অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসনের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!