পার্থসারথি পাণ্ডা
কবিদের রচিত গদ্যে যে জটিল বাক্যবিন্যাস, হাইফেন কন্টকিত দুস্তর পাঠপ্রক্রিয়া থাকে; জয় গোস্বামীর গদ্য একদম তার বিপরীত। ছোট ছোট বাক্য দিয়ে তিনি বাকপ্রতিমা রচনা করেন ঝরঝরে গদ্যে। যেমন, ‘সেইসব শেয়ালেরা’ উপন্যাসটি শুরু হয়েছে এভাবে–
‘সে যায়। না, সে আসে।’
—এরকমই হ্রস্ববাক্যের মধ্য দিয়ে তিনি তৈরি করেন আখ্যানের রহস্যময়তা, পাঠককে টেনে নিয়ে যান তার রহস্যময় রসের গভীরে। তাঁর আখ্যানে হয়তো সেই অর্থে ঘটনার ঘনঘটা নেই, কিন্তু প্রতিটি চরিত্রের মনোলোকের অন্দরে এক প্রচণ্ড উত্থানপতন চলতে থাকে, যাতে থাকে কাব্যসরস গদ্যের এক আশ্চর্য সুবাস। এটাই পাঠককে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রাখে সমস্ত আখ্যানের সাথে। গদ্যের এই চলন একেবারেই তাঁর নিজস্ব। তবুও এই সহজ চিত্রময় বাকপ্রণালির দিক থেকে তাঁর সঙ্গে শুধু তুলনা করা চলে একজন কবিরই, তিনি সুভাষ মুখোপাধ্যায়।

রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর পূর্ববর্তী কবিদের কথা যদি বাদও দিই, তবুও বাংলা সাহিত্যে কবিদের লেখা বিখ্যাত উপন্যাসের সংখ্যা নেহাত কম নয়; জীবনানন্দের ‘সুতীর্থ”, ‘মাল্যবান’, ‘কল্যাণী’; শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘কুয়োতলা’, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘হাংরাস’, ‘অন্তরীপ বা হ্যানসেনের অসুখ’ সেই ধারারই প্রতিভূ। এখন যেটা দেখার সেটা হল, আপাদমস্তক কবি জয় গোস্বামী গত শতকের নয়ের দশকে যখন কবিখ্যাতির মধ্যগগনে তখনই হঠাৎ করে উপন্যাস বা অন্যান্য গদ্যরচনার দিকে ঝুঁকলেন কেন? সেই গদ্যের আঙিনায় নতুন কী নিয়ে এলেন তিনি, যা তাঁর পূর্ববর্তী লেখকদের রচনায় আমরা পাইনি?
জয় গোস্বামীর উপন্যাস রচনার নিজস্ব এক শৈলী আছে, সেটা কারো সঙ্গে মেলে না। একটি সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন যে, আগে থেকে আগাপাশতলা ভেবে প্লট রচনা করে তারপর উপন্যাস লিখতে তিনি বসেন না। তাঁর উপন্যাস শুরু হয় শূন্য থেকে। লিখতে লিখতে কাহিনির জন্ম হয়, চরিত্রেরা এসে জোটে; তারপর সবটা মিলিয়ে এগিয়ে যায় পরিণতির দিকে। চরিত্রেরা উঠে আসে তাঁর পরিচিত জগৎ ও জীবন থেকে, কখনও হয়ে ওঠে তাঁর আত্মজীবনীর অংশ। যেমন, রাণাঘাটের ফেলে অাসা ইস্কুলের প্রধান শিক্ষক জগবন্ধু বাবু চরিত্র হয়ে হাজির হন ‘মনোরমের উপন্যাস’-এ। আখ্যানের পরতে পরতে ভিড় করে তাঁর ফেলে অাসা মফস্বলের মধ্যবিত্ত জীবনের পরিসর। কিন্তু এসব তো লেখক মাত্রেই হয়ে থাকে, লেখকের স্মৃতিসত্তাই তো ভিড় করে তাঁর লেখায়, এ আর নতুন কী? আসলে নতুনত্বটা হল উপস্থাপনায়। তাঁর প্রতিটি উপন্যাসের মধ্যে একটা যোগসূত্র নিয়ে হাজির হয় একই চরিত্র বা স্মৃতি-সংকেত, সেটাই যেন ইঙ্গিত দেয় তাঁর সমস্ত আখ্যান মিলিয়েই যেন বয়ে চলেছে এক অখণ্ড জীবনের ধারাবাহিক স্মৃতিকথা। সবটা মিলিয়েই নির্মিত হয় এক নিটোল অতীত। সেই অতীত হামেশাই ধরা দেয় জনপ্রিয় হিন্দি বা বাংলা গানের কলিতে, এই ফর্মটা গত শতকের শেষ দশক এবং এই শতকে তাঁর প্রকাশিত নানান কবিতাতেও বন্দিশ হিসেবে আমরা দেখতে পাই।

কবিতা দিয়ে তিনি অনেক গল্প লিখেছেন। সেই ‘মালতীবালা বালিকা বিদ্যালয়’ থেকে শুরু করে ‘যারা বৃষ্টিতে ভিজেছিল’র দীর্ঘ ইতিহাস। তাঁর মন চাইছিল গদ্যের সঙ্গে সখ্যতা, গদ্য ও পদ্যের মাঝে নিজেকে নিয়ে নিরীক্ষার অবসর। এই পর্বেরই পূর্ণ রূপ আমরা পাই ‘গোঁসাই বাগান’ -এ এসে। এই পর্বে তিনি যেন হাতে ধরে অামাদের শিখিয়ে দিলেন কবিতা কেমন করে পড়তে হয়, কেমন করে কবিতাযাপন করতে হয়। ‘গোঁসাই বাগান’ তাঁর কবিতা নিয়ে আলোচনাময় গদ্যমালা। জীবনানন্দ ‘সমারূঢ়’ কবিতায় অক্ষম পিচুটি চোখের যে কবিঘাতী কাব্যসমালোচকের কথা বলেছেন, তারই বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে জয় গোস্বামী আমাদের শিখিয়ে দেন কবিতার আলোচনা কেমন করে করতে হয়, কী করে তা পাঠকের মর্মমূলে পৌঁছে দিতে হয়, কেমন করে খুঁজে নিতে হয় কবিতার অস্তিরেখাগুলিকে। অালোচকের যে অনেক দায়, অনেক দায়িত্ব! তাই তাঁর সেই কবিতার বাগানে সকলের সমান প্রবেশাধিকার, অগ্রজ বরেণ্য কবি থেকে নবীন প্রতিভা সকলের। সবাই তাঁর কাছে পান সমান মনোযোগ, সমান গুরুত্ব। এই শিল্পময় আপামর উদারতা তাঁর আগে আর কারও কাছ থেকেই আমরা পাইনি।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news