সুমন ভট্টাচার্য :
প্রশ্ন ১: জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ে বাইরের লোক ঢুকিয়ে ভাঙচুর, হাঙ্গামা কতটা যুক্তিযুক্ত হয়েছে?
উত্তর: একদমই নয়। যে কোনও ধরনের হিংসা বা ভাঙচুর সমর্থনযোগ্য নয়। বিশ্ববিদ্যালয় বা যে কোনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সম্মান রক্ষা করা সবসময়ই উচিত।
প্রশ্ন ২: জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ঘটনার পিছনে বামেদের প্ররোচনা ছিল কিনা?
উত্তর: অবশ্যই। জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ে গন্ডোগোল তৈরি করার পিছনে বামেদের প্ররোচনা ছিল। সেমিস্টার রেজিস্ট্রেশনের জন্য যে প্রক্রিয়া ছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়ন এবং বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলি তাতে বাধা দিচ্ছিল। সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা সেমিস্টারের জন্য রেজিস্ট্রেশন করতে পারছিল না।
প্রশ্ন ৩: বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলি যেভাবে রেজিস্ট্রেশনে বাধা দিচ্ছিল, সেটাকে ভাঙতে এবিভিপি অন্য কোনও পদ্ধতি নিতে পারতো কিনা?
উত্তর: অবশ্যই চেষ্টা করা যেত। বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে আগ্রহী ছাত্র-ছাত্রীদের সেমিষ্টার রেজিস্ট্রেশনের জন্য অন্য কোন পদ্ধতি নেওয়া যেত যাতে সরাসরি সংঘাত এড়ানো যেত।
জেএনইউ-এর ঘটনাকে যদি এভাবে কাটাছেড়া করার চেষ্টা করি, তাহলে মনে হবে রবিবার রাতে দিল্লির এই ঐতিহ্যশালী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যা হয়েছে তা শুধু দুঃখজনকই নয়, অনঅভিপ্রেত। এবং এই যে দেশ জুড়ে ওঠা প্রতিবাদ, এটাকে অনায়াসেই এড়ানো যেত। শুধুমাত্র এবিভিপি নেতৃত্বের ‘অনভিজ্ঞতা’র জন্য এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার নিরিখে বলতে পারি, বামপন্থীদের তৈরি করা ফাঁদে পা দিয়ে এবিভিপি আবার ক্ষনিকের জন্য হলেও এসএফআই বা বামপন্থীদের প্রচারের আলোয় নিয়ে এসেছে।
নিজের ব্যক্তিগত মতামত এবং রাজনৈতিক বিশ্বাসের জায়গা থেকে মনে করি, অতীতে সিপিএম বা তাদের ছাত্র সংগঠন এসএফআই কোথায় কি ‘গুন্ডাগিরি’ করেছিল, অতএব এখন তার ‘জবাব’ পাচ্ছে, এই ধরনের বক্তব্য বা বিবৃতিও বিজেপি নেতৃত্বকে রাজনৈতিকভাবে কোনও মাইলেজ দেবে না। কারণ দেশের বড় অংশেই বামপন্থীদের কোনও প্রভাব নেই, পশ্চিমবঙ্গ এবং ত্রিপুরা, যা একসময় লালদূর্গ বলে পরিচিত ছিল, সেখানেও এখন বামপন্থীদের দূরবীন দিয়ে খুঁজতে হয়। ভোটের হিসাবে তো বটেই, সাধারণ হিসাবেও বামপন্থীরা এখন প্রান্তিক শক্তি। পরিষ্কার করে বলতে গেলে দেশের বৃহৎ অংশের মানুষের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত। তাহলে যে রাজনীতি বা রাজনৈতিক দর্শন, ইতিমধ্যেই প্রত্যাখ্যাত এবং প্রান্তিক, তাদের অতীতের ভুল টেনে এনে নিজেদের কোনও ‘ভূল’কে আড়াল করা যাবে না।
কোথায় এবিভিপি বা বিজেপির ভুল হয়েছে বা হচ্ছে? একটি গণতান্ত্রিক কাঠামোয় বিরোধীস্বর থাকবেই বা থাকা উচিতও। হতেই পারে সেই স্বরটি প্রান্তিক বা একেবারে ক্ষীনস্বর। কিন্তু তাকে সমাজ বা রাষ্ট্র থেকে একেবারে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টাটা স্তালিন অনুসরণ করতে পারেন, আজকের চিন অনুসরণ করতে পারে, কোনও গণতান্ত্রিক দলের জন্য সেটা পদ্ধতি হতে পারে না।
প্রেসিডেন্সি, যাদবপুর বা জেএনইউ-এর প্রতিবাদীস্বরকে আপনাকে চিনতে হবে এবং একইসঙ্গে উপেক্ষা করতেও শিখতে হবে। এই তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গেই কিছুটা যোগাযোগ এবং দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রত্যক্ষ রাজনীতি করার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, এই সব ‘এলিট’ প্রতিষ্ঠানের ছাত্র আন্দোলনের বা রাজনীতির বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিসরের সঙ্গে কোনও যোগাযোগও নেই, বা তারা কোনও প্রভাব ফেলতেও পারে না। আমার বক্তব্যকে যাঁদের চ্যালেঞ্জ করার ইচ্ছে, তাঁরা একবার কানাইয়া কুমারের সংসদীয় রাজনীতিতে পারফরমেন্সটা বিচার করে দেখতে পারেন। জেএনইউ-এর আগের সবচেয়ে আলোচিত, বিতর্কিত এবং গোটা দেশজুড়ে পরিচিত নাম বিহারের বেগুসরাইতে নির্বাচনে লড়তে গিয়ে যতটা প্রচার পেয়েছিলেন, ভোট তার কাছাকাছিও পাননি। বিজেপির গিরিরাজ সিংহকে চ্যালেঞ্জ জানানো তো দূরের কথা, এমনকি আরজেডি প্রার্থীর পিছনেও শেষ করেছিলেন। তাহলে আমি জেএনইউ ছাত্র সংসদ নির্বাচন বা সেখানে কি হচ্ছে, সেটা নিয়ে এত গুরুত্ব দেব কেন?
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ‘হোক কলরব’ আন্দোলন বা প্রাক্তনীদের মিছিল, তৃণমূলকে কতটা বিড়ম্বনায় ফেলতে পেরেছিল বা ২০১৬-র নির্বাচনে তার জন্য তৃণমুলকে কটা আসন হারাতে হয়েছিল? যাদবপুর বা জেএনইউ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে পারে, সেখানে গন্ডোগোল হলে নিউইয়র্ক টাইমস বা বিবিসি স্টোরি করতে পারে, কিন্তু বৃহত্তর রাজনীতিতে বা ভোটবাক্সে তার কি কোনও প্রভাব পড়ে? জ্যোতি বসু এটা জানতেন বলে এই ধরনের ‘এলিট’ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘প্রতিবাদী স্বর’ বা বিরোধী ছাত্র সংগঠন ক্ষমতায় থাকলেও সেটাকে গুরুত্ব দিতেন না, সেটা দখল করার জন্য প্রমোদ দাসগুপ্তের মডেলও অনুসরণ করতেন না। বসু, যিনি যতটা না কমিউনিষ্ট ছিলেন, তার চেয়ে বেশি বোধহয় ‘সোশ্যাল ডেমোক্রাট’ ছিলেন, জানতেন গণতন্ত্রে কতটা নিজের দখলে রাখতে হয়, এবং কতটা ছাড়তে হয়।
বিজেপি এবং আরএসএসকে এই বিদ্যেটি রপ্ত করতে হবে। তা না হলেই জেএনইউতে হামলার মতো ঘটনা ঘটে যাবে এবং গোটা বিশ্বে তা নিয়ে আলোচনা হবে। যে ঘটনা আপনার ভোটবাক্সে কোনওরকম প্রভাব ফেলে না, তা আপনি ঘটতে দেবেন কেন? দল হিসেবে বিজেপি এবং সংগঠন হিসাবে আরএসএস-এর অবশ্য ক্ষমতা বা প্রশাসনের সাথে সম্পর্ক বেশিদিনের নয়। তাই হয়তো ‘সোশ্যাল ডেমোক্রাট’দের মতো করে সরকার বা প্রশাসন চালানোর অভিজ্ঞতাও তারা অর্জন করেননি। ভারতের মতো বহুমাত্রিক দেশে সরকার এবং প্রশাসন চালাতে গেলে এই পদ্ধতিটি শিখে নেওয়া জরুরি।
পূনশ্চ: জেএনইউ কান্ডের প্রতিবাদে দিল্লি থেকে মুম্বাই, হায়দরাবাদ থেকে অক্সফোর্ড, সব জায়গায় প্রতিবাদ মিছিলের ছবি প্রগতিশীল সংবাদপত্রগুলির প্রথম পাতায় দেখলাম। একমাত্র বামশাসিত রাজ্য কেরলে কোনও মিছিলের ছবি দেখলাম না। কেরালা কি তাহলে আর প্রগতিশীল নেই? না সিপিএমের কেরল লবি আবার বাঙালিদের বয়কট করেছে?
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news