পার্থসারথি পাণ্ডা:

জগন্নাথ আসলে জগতের নাথ। আর এই জগতে তো সকল ধর্মের, সকল শ্রেণির মানুষের বাস। তাই তিনি শ্রেণি, ধর্ম নির্বিশেষে সকলের নাথ, প্রভু। প্রভু জগন্নাথ ।
একটি জনশ্রুতি তথা জগন্নাথ কাহিনি থেকে জানা যায়, আদিতে তিনি ছিলেন শবর দেবতা নীলমাধব। শবরসর্দার বিশ্বাবসু ছিলেন তাঁর উপাসক, পূজারী। লোক সাধারণের অগম্য ও অগোচর এক গুহা ছিল তাঁর মন্দির। অপক্ক নৈবেদ্য ছিল তাঁর আহার। কিন্তু এইভাবে নিছক শবরমণ্ডলের দেবতা হয়ে নারায়ণ নীলমাধবের জনশূন্যস্থানে নির্বান্ধব হয়ে থাকতে আর ভালো লাগছিল না তাঁর। তাই রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নকে স্বপ্নে জানালেন তাঁর জনসমক্ষে আসার বাসনা। তখন মন্দির প্রতিষ্ঠা করে ছলে-কৌশলে নীলমাধবকে রাজা নিয়ে এলেন পুরুষোত্তমক্ষেত্রে । মন্দিরের রত্নবেদীতে সুভদ্রা, বলরাম আর প্রিয় সুদর্শনকে সঙ্গে নিয়ে জগন্নাথ নাম ধারণ করে দারুব্রহ্ম নারায়ণ অধিষ্ঠিত হলেন। এখানে দেবতা একা নন কিংবা তাঁর বামে হ্লাদিনীও নেই। আছেন কেবল ভাই আর বোন। জগতের নাথ এখানে এইভাবে পারিবারিক সৌভ্রাতৃত্বের উদাহরণ রেখে জগৎসংসারকে শিক্ষা দিলেন। একমাত্র মা দুর্গার আবাহনকাল ছাড়া পরিবার প্রীতির মধ্য দিয়ে বিশ্বপ্রেমের এমন বার্তা আর কোন দেবতার পুজোর সময় আমরা পাইনা।
রাজার মন্দিরে এসে জগন্নাথ অগণিত ভক্তের মাঝে এলেন বটে, তাই বলে বিশ্বাবসুর শবরমণ্ডলকে তিনি কিন্তু ভুলে জাননি। এই স্নানযাত্রা আর রথযাত্রার মাঝখানের একপক্ষকাল, এই সময়টা জগন্নাথ প্রভু ভাই-বোনের সঙ্গে একান্তে অবসর যাপন করেন। মন্দিরের দ্বার বন্ধ থাকে। এসময় তিনি নিত্যপূজারীদের কাছ থেকে পুজো নেন না। তিনি তখন শুধুই শবরকুলের হাতের সেবা নেন, নিত্য পুজ নেন, আহার করেন। এই একান্ত অবসরটুকুর সব আনন্দ তিনি তার আদিম উপাসক শবরদের মধ্যে বিলিয়ে সমস্ত অবহেলিত মানুষের একজন হয়ে ওঠেন।
কালের উপাখ্যানে তিনি যেমন নিছক শবরদের দেবতা হয়ে থাকেননি, তেমনি শুধুই হিন্দুদের দেবতা হয়েও থাকেননি। এমন জগতের নাথ কি ব্যক্তি, সম্প্রদায়, ধর্ম বিশেষের দেবতা হয়ে থাকতে পারেন! তাই বৌদ্ধ অভ্যুত্থানের সময় আদি বুদ্ধ, জৈনদের কাছে আদি তীর্থঙ্কর ঋষভদেব, শাক্তদের কাছে দক্ষিণাকালী, ব্রহ্মবাদীদের কাছে দারুব্রহ্ম, বৈষ্ণবদের কাছে গোলকবিহারী, তন্ত্রসাধকের কাছে ভৈরব—বিভিন্ন সময়ে নানান নামে নানান উপাচারে পূজিত হয়েছেন তিনি। এখনও হন। তাই তাঁর পূজামন্ত্রে আছে সমস্ত ধর্মের অনুষঙ্গ, পূজায় নানান ধর্মের আচার। এভাবেই একইরূপে একইসঙ্গে নানান ধর্মের মানুষের নাথ হয়ে উঠেছেন জগন্নাথ। এমনকি মন্দির কমিটির অনুশাসনে যে সব ধর্ম বা শ্রেণীর মানুষ মন্দিরে প্রবেশের অধিকার পান না, রথযাত্রার সময় তিনি পথে নেমে তাদের দর্শন আর স্পর্শ দিয়ে তাদের ধন্য করে নিজেও ধন্য হতে চান। তাদেরই একজন হয়ে উঠতে চান। বুঝিয়ে দিতে চান ঈশ্বরের পথে সবাই সমান, তাঁর কাছে আসার কোন অনুশাসন নেই, থাকতে পারে না। সমস্তটাই মানুষের বানানো। এখানেই লুকিয়ে আছে প্রভু জগন্নাথের পবিত্র রথযাত্রার মহান তাৎপর্য।
বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
https://www.youtube.com/channelhindustan
https://www.facebook.com/channelhindustan
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news