সুখেন্দু বিশ্বাস :
ছিল বেড়াল, হল রুমাল। টানা দু’দিন ধরে ‘শিরদাঁড়া দিয়ে হিমেল স্রোত’ বইয়ে দেওয়ার মতো আতঙ্ক থেকে দৃষ্টি ঘোরাতে সম্পূর্ণ এক নতুন তরজা। তরজার বিষয়বস্তু—সাংবিধানিক অধিকার। কেন্দ্র -রাজ্যর যুক্তরাষ্ট্রীয় পরিকাঠামোর মধ্যে থেকে রাজ্যপাল আর মুখ্যমন্ত্রীর স্বাধিকারের প্রশ্ন। বাংলার রাজনীতিতে এ অবশ্য নতুন কোনও ঘটনা নয়। সেই ১৯৬৭ থেকে শুরু করে ২০১৭। বৃত্তটা যেন সম্পূর্নতার একই চিত্র। ৩৪ বছরের শাসনে বামেরা বরাবর কেন্দ্রের বিরুদ্ধে জেহাদ বজায় রেখেছে। তৃণমূলের রাজত্বেও সেই কেন্দ্র-রাজ্য বঞ্চনার ইতিহাসে দৃষ্টিভঙ্গি একটুও বদলায়নি। নতুন মোড়কে এসেছে মাত্র। রাজ্যপাল যে ‘কেন্দ্রের এজেন্ট’ এ আর নতুন তথ্য কী!
তবে এবারের তরজা নতুন মাত্রা পেয়েছে তার কারণ, রাজ্যপালের অতি সক্রিয়তা। কিন্তু তার অতিসক্রিয়তার পিছনে কারণ তো আছে। আগে জানতে হবে এই কেশরীনাথ ত্রিপাঠি কে? ইনি উত্তরপ্রদেশের পাঁচবারের প্রাক্তন বিজেপি বিধায়ক,প্রভাবশালী প্রাক্তন মন্ত্রী, বিধানসভার প্রাক্তন স্পীকার এবং সর্বোপরি উত্তরপ্রদেশ বিজেপির প্রাক্তন সভাপতি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক ভাল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংহেরও কাছের মানুষ। আদ্যন্ত রাজনীতির লোক। সেই মানুষটি যখন পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যের রাজ্যপাল হিসেবে মনোনীত হয়ে এসে দেখেন, কোনও একটি বিশেষ গোষ্ঠী আক্রান্ত অন্য একটি গোষ্ঠীর দ্বারা এবং প্রশাসন সেখানে নির্বিকার, এমন পরিস্থিতিতে তিনি কী আদৌ চুপ থাকতে পারেন! স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া অনুযায়ী তিনিও পারেননি। আইন শৃঙ্খলার পরিস্থিতি নিয়েও মুখ্যমন্ত্রীকে প্রশ্ন করেছেন। আর তাতেই মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী অসম্মানিত বোধ করেছেন। একবার তো ভেবেছেন পদত্যাগই করে ফেলবেন। সাংবাদিক সম্মেলনে এমনকী বলেও ফেলেন। এমনিতেই ‘সদাহাস্যময় পাহাড়’ সম্প্রতি জ্বলছে। সারদা-নারদা-রোজভ্যালি থেকে তোলাবাজি-সিন্ডিকেট দৌড়াত্ম প্রতিনিয়ত কাঁটার মতো বিঁধছে। তার মধ্যে আবার নতুন উপসর্গ বিরোধীদের ঘোলা জলে মাছ ধরার সব রসদই দিয়ে রেখেছেন।
কিন্তু আসল ঘটনা কী! সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় দ্বাদশ শ্রেনীর এক ছাত্র বিশেষ এক ধর্মের প্রতি কুরুচিপূর্ন, অবমাননাকর পোস্ট করেছিল। যা নিয়ে বসিরহাট মহকুমার বাদুড়িয়া মহকুমার অর্ন্তগত রুদ্রপুরে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। বাদুড়িয়া থানা অভিযুক্তকে ওই রাতেই গ্রেফতার করে। কিন্তু গ্রেফতারের ঘটনার পরেও পরিস্থিতি শান্ত হয় না। এলাকার স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য, এই পোস্টকে কেন্দ্র করেই ওই গোষ্ঠীর প্রচুর বহিরাগত জমায়েত হয় রুদ্রপুরে। তাঁদের দাবি, আইনের শাসন নয়, অভিযুক্তকে তুলে দিতে হবে তাঁদের হাতেই। এরপরে চলে থানা ভাঙচুর, বিপক্ষ গোষ্ঠীর দোকান, বাড়ি ভাঙচুর সহ আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে প্রশাসন কিন্তু কঠোর কোনও ভূমিকা গ্রহন না করে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। এতেই যেন দুষ্কৃতীদের মনোবল দশগুন বেড়ে যায়। ক্রমান্বয়ে এই বিক্ষিপ্ত হামলা ছড়িয়ে পড়ে। দক্ষিণ বসিরহাট, উত্তর বসিরহাট, হিঙ্গলগঞ্জ, মিনাখাঁ, হাড়োয়াসহ দেগঙ্গার একাংশ। পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল থাকায় প্রশাসনের শীর্ষস্তরের টনক নড়ে। কিন্তু ততক্ষণে যে সময় অনেকটাই নষ্ট হয়ে গিয়েছে। প্রশাসন তৎপর ভূমিকা গ্রহন করতে চাইলে তাঁদের ওপরেও আক্রমণ শানায় ওই বিশেষ জনগোষ্ঠী। পুলিশের জিপে আগুন ধড়িয়ে দেওয়া হয়। আক্রমণের হাত থেকে রেহায় পায়নি জেলার এসপি-ও। ঠিক এই সময়ে পরিস্থিতি যখন নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যাচ্ছে তখনই বিএসএফ এবং সেনা তলব করা হয়।
কিন্তু প্রশ্ন তো কিছু থেকেই যায়! ৪৮ ঘণ্টা ধরে আইনের শাসনের বাইরে থাকল কী করে একটা গোটা মহকুমা! প্রশাসকরা কী আদৌ পরিস্থিতির আঁচ করতে পারেননি! নাকি ৪৮ ঘণ্টা ধরে যারা ধর্মের নামে দাপিয়ে বেরালো গোটা মহকুমা জুড়ে তাদের টিকিটি ছোঁয়া যাবে না কোনও এক অদৃশ্য জাদুবলে! প্রচুর-প্রচুর মানুষ শারীরিকভাবে নিগ্রহের থেকেও মানসিকভাবে আজ বেশি বিধ্বস্ত। চোখের সামনে তাঁরা দেখেছে, ঘর, দোকান জ্বলতে। এই ট্রমা থেকে হঠাৎ-ই বেড়িয়ে আসা এক কথায় অসম্ভব। রাজনৈতিক এবং সামাজিকভাবে এর মোকাবিলা হয়তো হবে, চাপানউতোরও হবে। কিন্তু গোটা ঘটনা মোকাবিলায় প্রশাসন যে সম্পূর্ন ব্যার্থ তা হলফ করে বলাই যায়।
(মতামত ব্যক্তিগত)
লাইক শেয়ার ও মন্তব্য করুন
বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news