পার্থসারথি পাণ্ডা :
চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের পরের ঘটনা।
তখন চট্টগ্রামের সব যুবক-তরুনই পুলিশের চোখে সন্দেহজনক, বিপ্লবী। কয়েক হাজার তরুন-যুবক। তাদের হাতে হাতে দেওয়া আছে নানান রঙের সরকারী পরিচয়পত্র, সেসব সবসময় সঙ্গে রাখতে হয়, পুলিশ যখন তখন দেখতে চায়। যাতে বাইরের যুবক এসে এলাকায় ডেরা বাঁধতে না পারে তাই এই ব্যবস্থা। পুলিশের ধারণা, যুবক মানেই হল মাস্টারদা সূর্য সেনের চ্যালা।
পুলিশ যখন হন্যে হয়ে মাস্টারদাকে খুঁজে মরছে, তখন বেশ কিছু উৎসাহী যুবক যোগ দিল মাস্টারদার দলে। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন, জালালাবাদের যুদ্ধের সৈনিক, মাস্টারদার ছায়াসঙ্গী বিপ্লবী পলাতক আসামী বীরেন দে’র ওপর ভার পড়ল নতুন ছেলেদের অস্ত্রশিক্ষা দেবার। ভার দিলেন স্বয়ং মাস্টারদা।
বীরেন নির্জন পাহাড়তলিতে ছেলেদের নিয়ে এলেন রিভলবার চালানো শেখাতে। একটি ছেলের রিভলবারে তিনি নিজেই গুলি ভরছিলেন। ছেলেটি হাত রেখেছিল ট্রিগারে। বীরেন খেয়াল করেননি। ছেলেটির অপটু-অশিক্ষিত হাত আর নতুন অস্ত্রচালনা শেখার উন্মাদনায় চাপ পড়ে যায় ট্রিগারে। বেরিয়ে আসে গুলি। গুলিটা কাঁধ ফাটিয়ে দেয় বীরেনের। বসে পড়েন তিনি। নতুন ছেলেরাসব এই আকস্মিক দুর্ঘটনায় ভয় পেয়ে যায়। মারাত্মক জখম হয়ে যাওয়া জায়গাটা থেকে দারুণ বেগে রক্তক্ষরণ হতে থাকে বীরেনের। তিনি ছেলেদের বার বার অনুরোধ করে বললেন—মাথায় গুলি করতে। এতে সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মৃত্যু হবে। এই জখম অবস্থায় তাঁকে নিয়ে টানাটানি করলে দলের বিপদ হবে!
ছেলেরা পারেনি তাঁকে মাথায় গুলি করে মেরে ফেলতে। কোনরকমে তারা বীরেনকে এক গোপন ডেরায় নিয়ে আসে মাস্টারদার কাছে। অত্যধিক রক্তক্ষরণে বীরেনের তখন অবস্থা একেবারেই খারাপ। তখনও জ্ঞান আছে। হাত বাড়িয়ে মাস্টারদার পায়ের ধুলো নিয়ে যন্ত্রণার মুক্তির জন্য সায়নাইড চাইলেন। কিন্তু প্রিয়সঙ্গীর হাতে সায়নাইড তুলে দিতে পারেননি মাস্টারদা। তাঁর অসহায়তা হয়ে আরও মারাত্মক— বীরেনের জন্য কিছুই করে উঠতে না পারার অসহায়তা। ফেরারী আসামী বীরেনকে না হাসপাতালে, না কারও বাড়িতে রেখে চিকিৎসা করানোর কোন উপায় নেই, পুলিশের হাতে ধরা সে পড়বেই, তখন অত্যাচারে অত্যাচারে বীরেনের প্রান দুর্বিষহ তো হবেই, দলেরও অস্তিত্বের সঙ্কট ঘনিয়ে আসবে। এই মানসিক দোলাচলতার মাঝে এলাকার এক দাগী চোর এগিয়ে এসেছিল বীরেনের ভার নিতে। তার নাম গগন ঘোষ। অনেক বার চুরি করে জেল খেটেছে সে। এলাকায় লোকে দুয়ো দুয়ো করে তাকে। আজ সেই মানুষটাই এগিয়ে এলো। নিজের পেটের প্রয়োজনে চুরি ছাড়া আর তো কারোর জন্য কিছু করেনি সে, চোখের সামনে এই শিক্ষিত-গুণী মানুষগুলোকে দেশের জন্য সবকিছু বিলিয়ে দিতে দেখে তারও ইচ্ছে যদি সামান্যতম এঁদের কাজে লাগা যায়…
দলের ছেলেদের নানা লোকের নানা মত। অধিকাংশই গগনকে বিশ্বাস করতে পারছে না। তার মতো চোর-ছ্যাঁচড় যে পুলিশের পুরস্কারের লোভে এই কাজ করছে না, তাই বা কে বলতে পারে! কিন্তু লোকটাকে দেখে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়েছিল মাস্টারদার। তাছাড়া তাঁর উপায়ও ছিল না। প্রিয়সঙ্গীর মুখে সায়নাইড তুলে দেওয়া বা পুলিশের সামনে এগিয়ে দেওয়ার চেয়ে চোরের হাতে তুলে দেওয়া ঢের ভালো।
বীরেনকে রাতের অন্ধকারে রেখে আসা হল গগনের ঘরে। এলাকায় একঘরে হওয়া গগনের ঘরের খবর কেউ জানল না। পুলিশও কোনদিন ভাবতে পারল না যে, চোর গগন বিপ্লবীদের সহায় হতে পারে। গগন ও গগনের স্ত্রী অক্লান্ত সেবায় বীরনকে সুস্থ করতে চাইল। কিন্তু বীরেনের ঘা তখন বিষিয়ে গেছে। অনেক দূর থেকে গোপনে ডাক্তার এনেও কিছু হল না। বীরেন মারা গেলেন। তবে, মারা যাবার আগে যে ছেলেটির জন্য তাঁর দুর্ঘটনা ঘটেছে তাকে অপরাধী করে দূরে ঠেলে দেওয়া নয়, ভালোবেসে দলে রাখার জন্য অনুরোধ জানিয়ে গেলেন মাস্টারদার কাছে আর গগন ও তার পরিবারের কাছে জানিয়ে গেলেন অসীম কৃতজ্ঞতা। স্বাধীনতা ইতিহাসের পরতে পরতে বীরেনের মতো, গগনের মতো, গগনের নাম-না-জানা স্ত্রীর মতো অসংখ্য মানুষের ত্যাগ জমে আছে। আজ স্বাধীনতা দিবসের দিন তাই শুধু শীর্ষ নেতাদের ছবিতে মালা দেওয়ার দিন নয়, এই আড়ালে থেকে যাওয়া মানুষগুলোর পায়ে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ার দিন…
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news