পার্থসারথি পাণ্ডা:

গত শতকের গোড়ার দিকে একের পর এক গুপ্ত সমিতি গড়ে উঠেছিল বাংলা এবং ভারতের নানান প্রদেশে। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে সহিংস বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে পরবর্তীকালে এই সমিতিগুলোর বড় রকমের অবদান রয়েছে।
উনিশ শতকের শেষ দিকে ইয়োরোপের নানান দেশে ইংরেজ শাসকের বিরুদ্ধে গড়ে উঠেছিল নানান গুপ্ত সমিতি। শোষক শাসকের বিরুদ্ধে তাদের সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ ভারতের স্বাধীনতাকামী অনেক তরুনকেই উদ্বুদ্ধ করেছিল। মেদিনীপুরের হেমচন্দ্র কানুনগো ছিলেন এঁদেরই একজন।
গুপ্ত সমিতিগুলোর বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ হয়ে উঠেছিল তাঁদের আদর্শ। কিন্তু সেই আদর্শ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য একজন সত্যানন্দের খুব অভাব ছিল। সেই অবস্থায় হেমচন্দ্র যোগ দিয়েছিলেন এসে বারীন ঘোষের অনুশীলন সমিতির সঙ্গে। বারীন ঘোষ তখন জাতীয়তাবাদী পত্রিকা ‘যুগান্তর’ প্রকাশ করে চলেছেন আর তার আড়ালে চালিয়ে যাচ্ছেন অনুশীলন সমিতির কার্যকলাপ। হেমচন্দ্র এসে দেখেছিলেন যে, সমিতির কার্যকলাপ তখন শুধুই প্রচার, সদস্য সংগ্রহ, চাঁদা আদায় এবং দু’একটি রিভলবার সংগ্রহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এতে আর যাইহোক ব্যাপক আকারে আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। দেশের নানান প্রদেশের গুপ্ত সমিতির ভেতরের খবর নিয়ে, সেখানে গিয়ে হেমচন্দ্র বুঝেছিলেন যে, একমাত্র নাসিকের একটি গুপ্ত সমিতি ছাড়া আর কোথাও তেমন কাজের কাজ হচ্ছে না। অধিকাংশ সমিতিই তখন হয় নিছক আধ্যাত্মিকতার, নয়তো ব্যায়াম-লাঠি খেলার আখড়া হয়ে উঠেছে। এতে করে আর যাই হোক দেশোদ্ধার হবে না। নিজেদের অস্ত্রের ভাণ্ডার বাড়িয়ে প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে এগোতে না পারলে বিশাল ব্রিটিশবাহিনীর বিরুদ্ধে বড় রকমের বিপ্লবী আন্দোলন গড়ে তোলা কিছুতেই সম্ভব নয়।
এই রকম এক অবস্থায় হেমচন্দ্র ঠিক করলেন যে তিনি বিদেশে যাবেন এবং সেখানকার গুপ্ত সমিতিগুলোর যোগাযোগ করে তাদের কাজের পদ্ধতি নিজের চোখে দেখে আসবেন এবং বোমা ও নানান অস্ত্রশস্ত্র বানানো শিখে আসবেন। আর এর জন্য তিনি কারও কাছে অর্থ সাহায্য নেবেন না। কারণ, দিকে দিকে গজিয়ে ওঠা অজস্র গুপ্ত সমিতির নেতাদের দেশের নামে চাঁদা আদায় ও প্রবঞ্চনা তাঁকে এ ব্যাপারে বীতশ্রদ্ধ করে তুলেছিল। তাই মেদিনীপুরের নিজের ঘরবাড়ি বিক্রি করে সেই টাকায় ইয়োরোপে পাড়ি দিলেন। প্যারিসে নৈরাজ্যবাদী জোসেফ অ্যালবারট ও এম্মা গোল্ডম্যান আর একজন রহস্যময় অজ্ঞাত পরিচয় রাশিয়ানের কাছ থেকে শিখে নিলেন বোমা তৈরির কৌশল। রুশ ভাষা থেকে অনুবাদ করে নিলেন বোমা তৈরি শেখার বই। তবে সেখানকার গুপ্ত সমিতিগুলো তাঁকে একেবারেই নিরাশ করল, ভারতের গুপ্ত সমিতির কার্যকলাপের সঙ্গে তাদের ঐতিহ্য ও আইডিয়াগত দিক থেকে কোন মিল নেই আর সেখানকার সমিতিগুলো এদেশের মতো গুপ্তও নয়। তিনি ফিরে এলেন দেশে।
দেশে ফিরে তিনি বিপ্লবীদের হাতে হাতে পৌঁছে দিলেন বোমা তৈরির ম্যানুয়াল। নিজে তৈরি করলেন বোমা। তাঁর তৈরি বোমা নিয়েই ক্ষুদিরাম বসু গিয়েছিলেন কিংসফোরডকে হত্যা করতে। যদিও সে হত্যার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল। তবুও বারীন ঘোষের চেষ্টায় ভবানীপুরের একটি বাড়িতে গড়ে উঠল বোমা তৈরি শেখার স্কুল, আর তার শিক্ষক হলেন হেমচন্দ্র। অল্পদিনের মধ্যে স্কুল উঠে গেলেও বাংলার সশস্ত্র বিপ্লবীদের হাতে তিনিই প্রথম তুলে দিয়েছিলেন ব্রিটিশের বিরুদ্ধে লড়াই করার আধুনিক এক উপায়।
বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
https://www.youtube.com/channelhindustan
https://www.facebook.com/channelhindustan
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news