পার্থসারথি পাণ্ডা
পঞ্জিকার যেমন তিথিক্ষণের দু’রকম সিদ্ধান্ত—সূর্য সিদ্ধান্ত, দৃকসিদ্ধান্ত এবং দুই মত গোস্বামী মত আর ভটচায্যি মত; তেমনি বাংলা বানানের ক্ষেত্রেও নানান বিধি— আনন্দবাজার পত্রিকার বানানবিধি, বাংলা আকাদেমি বানানবিধি, সংসদ বানানবিধি। আবার বাংলাদেশে বাংলা একাডেমির নিজস্ব বানানবিধিও রয়েছে। তাল ঠুকে তাঁরা চলেছেন তাঁদের মতো, বঙ্গবাসী নিজের মতো।
প্রথমসারির পত্রিকায় বাংলায় এমনকিছু কর্পোরেট বিজ্ঞাপন ছাপা হয়, এমন কিছু চিকিৎসা ও ওষুধ সংক্রান্ত বিজ্ঞাপন ছাপা হয়, সেইসব বিজ্ঞাপন লেখকেরাও আবার তৈরি করে ফেলেছেন নিজস্ব বানানবিধি। তাঁরা পূর্বোক্ত চারটি প্রতিষ্ঠানের কোনটিরই ধার ধারেননা, বলতে কি, বাংলা ভাষাটিরই তেমন ধার ধারেন না। ভাষার শ্রাদ্ধেই তাঁদের আহ্লাদ।
এস বি আই, ১ জুলাই ২০১৭-তে একটি পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞাপনে জানাচ্ছে তাদের ডিজিট্যাল লেনদেনে অগ্রগতির কথা। আসুন, ভাষাটি পড়ে দেখি—‘ক্যাশ ট্রান্সফার থেকে ক্যাশলেশ বিনিময়ে।/ অতীতের হাতছানি থেকে চটপটে অ্যাপে।/ তোমার যাওয়ার ব্যাঙ্কের থেকে ব্যাঙ্ক যা তোমার কাছে আসে।/ সময়মত স্টেটমেন্ট থেকে মোবাইল অ্যালার্টে।’ প্রথম দুটো লাইন বোঝা যায়। কিন্তু, শেষের দুটোর মানে এবং ভাষা কোনটাই বোঝা যাচ্ছে কি?
২০১৭-তেই ১২ জুলাই একটি জনপ্রিয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েছিল এয়ারটেল। তাতে তারা গ্রাহককে সম্বোধন করে লিখছে, ‘যখন আপনি আমাদের সঙ্গে একটা সম্পর্কতা শুরু করায় একটা প্রমিস বানান, তখন এটা শুধুমাত্র আমরা আমাদের রাখায় ন্যায্য হয়।’ মানে কি???
দ্বিতীয় বিজ্ঞাপনটা নিয়ে খানিক কানাঘুষো হয়েছিল। তখন কানে এসেছিল, গুগল ট্রান্সলেটরের কথা। গুগল ২০০৬-এ গুগল ট্রান্সলেটর নামের একটি অনলাইন সার্ভিস চালু করে। ২০১১-তে সেখানে বাংলা ভাষায় অনুবাদের পরিষেবা চালু হয়। এর সাহায্যে তখন অন্য ভাষা থেকে বাংলায় বা বাংলা থেকে অন্য ভাষায় কিছু কিছু বাক্যাংশ অনুবাদ করা যেত। একে ঠিক অনুবাদও বলা যায় না, বরং প্রোগ্রামে স্টোর করা কতকগুলো শব্দ মিলিয়ে বাক্যের মতো দেখতে একটা কিছু খাড়া করার খেলা বলা যেতে পারে। তারপর ২০১৭-তে এসে গুগলের পক্ষ থেকে দাবি করা হল, গুগল ট্রান্সলেটর এবার নাকি অনায়াসেই প্যারার পর প্যারা সুন্দরভাবে অনুবাদ করতে পারবে। সুতরাং, খবর শুনে ঝাঁপিয়ে পড়ল কর্পোরেট দল, সরকারি প্রোষিত কিছু সংস্থা। মাইনে দিয়ে ছাইপিন্ডি লিখতে ট্রান্সলেটর রাখতে হবে না, মাস শেষে ব্যাটার মাইনে গুনতে হবে না; এমন সুযোগ কেউ ছাড়ে! কাজেই, তাঁদের খোঁয়াড়ে গুগল ট্রন্সলেটরের অশ্বডিম্ব প্রসব শুরু হল। সেই ডিমের ওমলেট প্রথম সারির সংবাদপত্রের প্রথম পাতা জুড়ে আমাদের সামনে হাজির হতে লাগল। এতে ভাষাটার যে পিণ্ডি চটকানো হল, তাতে অবাঙালি এম ডি’র কি-ই বা এসে গেল!
কিন্তু আমাদের এতে এসে যায়। কারণ, ভাষাটা আমাদের মাতৃভাষা। এই ভাষাটির জন্যই আমাদের পূর্বপুরুষ লড়াই করেছেন, জীবনটাকে তুচ্ছ ভেবেছেন। তাই তাকে পড়ে পাওয়া চৌদ্দ আনা ভেবে বসলে শুধু আমাদের ভাষার অপমান নয়, ঐতিহ্য ও জাতিরও অপমান।
গুগল ট্রান্সলেটর দিয়ে ফেসবুকের ভিনদেশি বন্ধুর ভিন-ভাষায় লেখা টেক্সট বাংলা অনুবাদ করে পড়া যেতেই পারে, কিন্তু তাকে দিয়ে ক্রিয়েটিভ কিছু করানোর সময় এখনও আসেনি।
বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
https://www.youtube.com/channelhindustan
https://www.facebook.com/channelhindustan
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news