লাবণ্যপ্রভা বন্দ্যোপাধ্যায় :
এই বছরের জানুয়ারি সব বছরের মতনই ছিল ধূসর আর ঠান্ডা। প্রতিবার শীতে জমে যেতে যেতে কেমন মন খারাপ লাগে। এমন একটা শীত পড়ে এখানে। মনখারাপের আর বিষণ্ণতার। কিন্তু এই বছরটা আমার কাছে অন্য বছরগুলির থেকে একটু আলাদা ছিল কারণ তিন বছর পর নিজের জন্মস্থান কলকাতায় যাবার প্ল্যান করছিলাম। সে অনুযায়ী জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে টিকিট বুক করাও হলো। সেই সময়ই প্রথম মারণ ভাইরাসটার নাম কানে এলো। কোভিড ১৯। তখনও বুঝতে পারিনি এর কী প্রভাব পড়তে চলেছে আমাদের ওপর। জার্মান খবরের কাগজে একটি আর্টিকেলে পড়লাম চিনের উহানে খুব সম্ভবত বাদুড়ের মাংস থেকে এই ভাইরাসটি বাজার ও শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে এটা মনে আছে যে ইউএন একটি প্রেস কনফারেন্স করে বলল এটি প্যানডেমিক নয় তাই এ নিয়ে ইউরোপের ভয় পাবার কোনও কারণ নেই। ১৩ই ফেব্রুয়ারি কলকাতায় পৌঁছে দেখলাম এয়ারপোর্টে নানা সতর্কতা। অনেক মাস্ক পরা সহযাত্রীও ওই লম্বা উড়ানে পেলাম। ৪ মার্চ জার্মানি ফিরে এসে শুনলাম ইতালির ভয়াবহ অবস্থার কথা। জার্মানির মানুষের কাছের দেশের এই খবর ভয় পাইয়ে দিল, তারা সর্তক হতে শুরু করল। ১৩ মার্চ হঠাৎ করেই স্কুলগুলো বন্ধ করে দেওয়া হল, কবে খুলবে তার কোনও নির্দিষ্ট সময় না জানিয়েই।

১৪ তারিখে কাছের সুপারমার্কেটে বাজার করতে গিয়ে প্রথম বুঝতে পারলাম সামনের দিন গুলো কঠিন হতে চলেছে। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রে ঠাসা তাক গুলো একদম খালি। দুধ , ময়দা, জীবাণুনাশক আর টয়লেট পেপার কিছু নেই। কী করে যেন পালটে গেল সব। এই বন শহর আমার চেনা নয়। জার্মান নিউজ চ্যানেল গুলো সারাক্ষণই কোভিড ১৯ নিয়ে নানা সর্তকতা ও সাবধানতা সংক্রান্ত খবর প্রচার করতে শুরু করল। ইউনিভার্সিটি থেকে ইমেল-এ সেমিস্টারের দেরি তে শুরু হবার খবর পেলাম। যেটা ২ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়ার কথা ছিল সেটা আপাতত ১৮ দিন পিছিয়ে দেওয়া হলো। আমাদের চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেল তাঁর দীর্ঘ সময়কালে খুব কমই নাগরিকদের উদ্দেশে নিউজ চ্যানেলে ভাষন দিয়েছেন। কিন্তু কদিনের মধ্যেই টিভির পর্দায় উপস্থিতিতে বোঝা গেল জার্মানিতে করোনার কঠিন সময় চলছে। তিনি জোর দিলেন সোশ্যাল ডিসটেনন্সিং, বয়স্ক মানুষদের বিশেষ সুরক্ষাতে । খাদ্য ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে চিন্তা করতে না বললেন , এক সঙ্গে অনেক জিনিস কিনতে বারণ করলেন। জোর দিলেন পরিবারের সদস্যদের পরস্পরের যোগাযোগে , নেট বা চিঠিপত্রের মাধ্যমে কাছাকাছি থাকতে বললেন। ঠিক তার দু’দিন বাদেই তাঁর চিকিৎসক করোনা আক্রান্ত হওয়ায় মার্কেল সেলফ আইসোলেশনে চলে গেলেন ।

এই ঘটনা জার্মানদের আরও সর্তক করে দিল। জার্মানিতে শেষ মার্চে কিছু নতুন আইন এল, কিছু বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া দুই জনের বেশি মানুষের একসঙ্গে চলাচল নিষেধ হলো আর এই আইন না মানলে ২০০ ইউরো প্রতি জনের ফাইন করা হবে বলে জানানো হলো। খাবার, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র , ওষুধপত্র , পেট্রলপাম্প ছাড়া সবকিছুই আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে গেল। এখানের মানুষ সরকারের বলে দেওয়া সব নিয়ম অক্ষরে অক্ষরে পালন করে চললো। বাদ থাকল না বাচ্চারাও , রামধনুরর ছবি এঁকে জানলায় টাঙালো যাতে অন্যরা জানতে পারে বাচ্চারাও নতুন নিয়ম মানছে, তারাও বাড়িতেই আছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় অল্প বয়সিরা বয়স্ক লোকজনদের বাজার করে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে সাহায্য করতে পারে বলে পোস্ট করছে , পাড়ার মধ্যে চলছেও এই সাহায্য। শারীরিক দূরত্ব সত্ত্বেও মানুষের কাছাকাছি আসছি। মা আর আমার জীবনেও এক নতুন হবি এসেছে তা হলো লুডো খেলা। ছোটবেলার খেলা যে এই দুঃসময়ে ফিরে আসবে কে জানত? জার্মান মিডিয়া মূলত ফোকাস করছে বৃদ্ধাশ্রমের আবাসিকদের ওপর।

ডাক্তার , স্বাস্থ্যকর্মী, রাজনৈতিক দলগুলো চিন্তিত এঁদের করোনা সংক্রমণ নিয়ে। আমাদের নতুন আইন এল। এই আবাসিকরা যাঁরা অন্য অসুস্থতার কারণে হাসপাতালে ছিলেন তাঁদের সুস্থ হলে বৃদ্ধশ্রমে ফেরবার সময় করোনা টেস্টে নেগেটিভ হলেই পাঠানো হবে আর পজিটিভ হলে বিশেষ হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে। আজ ১০ এপ্রিল পর্যন্ত আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা দুই লক্ষের কাছাকাছি আর মৃতের সংখ্যা আড়াই হাজারের কাছাকাছি। অন্যান্য ইউরোপিয়ান দেশের তুলনায় মৃত্যুর হার অনেক কম। এর একটা বড় কারণ হয়তো মার্চের শেষ পর্যন্ত প্রচুর টেস্ট হয়েছে জার্মানিতে। শুধু টেস্ট করিয়ে গিয়েছে সরকার। করোনা টেস্টের সংখ্যা ১০ লাখের কাছাকাছি। এই টেস্টই অনেকটাই বাঁচিয়ে দিয়েছে জার্মানিকে। তবে প্যানডেমিকের আগেই জার্মানির হাসপাতাল গুলোতে ইনটেনসিভ বেড-এর এর সংখ্যা প্রয়োজনের তুললায় বেশি ছিল। এই অসময়েও জার্মানদের ধৈর্য ও মনোবল আমাকে অবাক করছে। এর কারণ টা খুঁজতে গিয়ে মনে হচ্ছে পারস্পরিক শ্রদ্ধা , রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বাস আর নিয়ম মানাই এর উৎস। আর একটা কথা জার্মানিরা ষড়যন্ত্রে বিশ্বাস করে না। চারিদিকে পজিটিভ চিন্তার মানুষ একে অপরকে শক্তি দিচ্ছে বেঁচে থাকার।

Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news