পার্থসারথি পাণ্ডা : 
আর্মেনিয়ান এক পরিবারে জন্ম হল গওহরজানের। ১৮৭৩ এর আজমগড়ে। খুব সুন্দর ফুটফুটে পরীর মতন মেয়েটির নাম দেওয়া হল এঞ্জেলিনা। এঞ্জেলিনা ইওয়ার্ড। মা ভিক্টোরিয়া অসাধারণ গান গাইতেন। অসম্ভব ভালো কত্থক নাচতেন। কিন্তু বাবা উইলিয়াম কাজ করতেন যেমন ড্রাই আইস ফ্যাক্টরিতে, তেমনি তাঁর মনটাও ছিল ড্রাই। এক্কেবারে বেরসিক মানুষ একজন। ফলে ভিক্টোরিয়ার গুণের কদর করার মতো মন তাঁর ছিল না। তাই অল্পদিনের মধ্যেই দেখা দিল রুচির ফারাকে মনের ফাটল। কাজেই ছুতোনাতায় শুরু হল খিটির মিটির।
ঠিক এ সময়ই ভিক্টোরিয়ার জীবনে এলেন এক সংগীত রসিক মানুষ। তাঁর নাম খুরশিদ। ভিক্টোরিয়া তাঁঁর মধ্যেই খুঁজে পেলেন নিজেকে। নিজের প্রেরণাকে। ফলে ভিক্টোরিয়া আর উইলিয়ামের বিয়ে গেল ভেঙ্গে। তখন এঞ্জেলিনার বয়স আর কত… পাঁচ কি ছয়…মা আর বাবা আলাদা হয়ে গেলেন।
শুরু হল মা-মেয়ের নতুন করে বাঁচার লড়াই। এই লড়াইয়ের পথে তাঁদের পাশে এসে দাঁড়ালেন খুরশিদ। তিনিই ভিক্টোরিয়াকে নতুন করে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখালেন। দেশের বাড়ি বেনারসে নিয়ে এলেন তিনি মা আর মেয়েকে। সংগীতের শহরে এসে তাঁরা বিয়ে করলেন। বিয়ের সময় ভিক্টোরিয়া মুসলিম ধর্মে দীক্ষা নিলেন। তখন তাঁর নতুন নাম হল, মালকা জান। আর মেয়ের নতুন নাম হল, গওহর জান।

অল্পদিনেই মালকা জানের গানের সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল সমস্ত বেনারসে। তখন বেনারসের নবাবের দরবারে তাঁর ডাক পড়ল। গান শুনিয়ে নবাবকে মুগ্ধ করে তিনি হয়ে উঠলেন দরবারের প্রধান গায়িকা। সারা দেশে তখন ছড়িয়ে পড়ল মালকা জানের নাম।
কলকাতার মেটিয়া বুরুজে সেই সময় আড্ডা জমিয়েছেন নবাব ওয়াজেদ আলি শা, তিনি মালকা জানের নাম শুনে তাঁকে নিয়ে এলেন কলকাতায়। রেখে দিলেন দিলেন তাঁকে সেখানেই। অবশ্য বছর খানেকের মধ্যেই চিত্পুরে বাড়ি কিনে মেয়েকে নিয়ে সেখানে উঠে এলেন মালকা জান।
বেনারসে থাকতেই মালকা মেয়ের নাচ আর গানের তালিম শুরু করে দিয়েছিলেন। তারপর সেখানে বড় বড় ওস্তাদদের কাছ থেকে শাস্ত্রীয় সংগীতের শিক্ষা নিলেন গওহর। কত্থক শিখলেন। মায়ের সংগে বেনারসের নবাবের দরবারে তিনিও কত্থক নাচতেন, গানে অংশ নিতেন।

কলকাতায় গওহর যখন মুজরা বা মেহফিল করতে শুরু করলেন তখন সেটা উনিশ শতকের শেষ দশক। তখনই এক একটা মেহফিলের জন্য তিনি তিন হাজার টাকা করে নিতেন। তার গান আর সন্দরজ সেকালের নবাব আর বড় মানুষ মাজলিশিদের মনে এমন তুফান তুলেছিল যে, তিন হাজার টাকাটাও সেখানে তুচ্ছ মনে হত তাদের।
১৯০২ সালে লন্ডনের গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে গেইজবার্গ নামের এক ভদ্রলোক এলেন কিছু মোমের সিলিন্ডার নিয়ে কলকাতায় গান রেকর্ড করতে। তিনি রেকর্ড করতে চান নির্ভেজাল ভারতীয় সংগীত। ডাক পড়ল গওহর জানের। সেই সঙ্গে, আরো এক বিখ্যাত গায়িকা শীলা বাই এর ডাক পড়ল। দিনটা, এ বছরের নভেম্বর মাসের ১১ তারিখ। কথা ছিল গওহর জানের গান আগে রেকর্ড হবার। কিন্তু কেন জানি না, শীলার গানই আগে রেকর্ড হল। ফলে যেখানে গ্রামোফোনে প্রথম ভারতীয় গাইয়ের সম্মান পাবার কথা ছিল গওহরের, সেখানে সেই সম্মান পেলেন শীলা। সে যাই হোক, রেকর্ড এর মধ্য দিয়ে ঠুমরি, গজল, খেয়াল জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে গওহরের অবদান অনস্বীকার্য।
বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
https://www.youtube.com/channelhindustan
https://www.facebook.com/channelhindustan
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news