কুণাল চক্রবর্তী
দুম করে নিভে গেল সূর্যের শেষ আলোটুকু। তাঁবুর দেওয়ালে ততক্ষণে শুরু হয়ে গেছে বরফের দাঁত বসানো শীতল হাওয়ার দাপট। এরই মাঝে অন্ধকার যখন একটু একটু করে গিলে ফেলছে চরাচর, তখনই একটি একটি করে আলো জ্বলে উঠল পাহাড়ের ঢালে। সেই আলো বুঝিয়ে দিল জীবন আছে জেগে। কিন্তু চড়াই ভাঙতে ভাঙতে আমাদের শরীরে তখন সমস্ত দিনের ক্লান্তি, চোখে যেন সারাজীবনের নিদ্রা। আমাদের সামনে পড়ে রয়েছে পশ্চিম সিকিমের গোচালার পথ। কিন্তু এখনও আমরা এতটা ওপরে উঠিনি, যেখানে শ্বাসকষ্ট হয়। ফুলে ফুলে ভরা অপরূপ রডোডেন্ড্রনের বন পেরিয়ে সার সার তাঁবুতে বডি ফেলে দিয়েছি আমরা এগারো জন—অনুপদা, অনুপদার স্ত্রী সোনালিদি, সুশীলদা, শুভাশিসদা, সিন্টুদা, মামা, সৌম্য, ভোলানাথ, হিমাংশু, কুন্তল আর আমি। এছাড়াও আমাদের সঙ্গে আছে দুজন গাইড—রবেন আর সুব্বাজি। তাদের শরীরে যেন ক্লান্তির ছিটেফোঁটাও নেই, কিম্বা দুজনেরই হাসিমুখ দেখে ক্লান্তি হয়তো পালাবার পথ পায়নি। সমস্তটা দিন তাঁবু, রান্নার সরঞ্জাম, আনাজপত্র সব ঘাড়ে করে বয়ে এসে তারা আমাদের জন্য তখন স্যুপ বানাতে ব্যস্ত। মানুষ দুটোকে গতকাল থেকে যত দেখছি ততই যেন অবাক হচ্ছি।

পশ্চিম সিকিমের একটা গ্রাম ইয়ুকসাম। ছোট্ট গ্রাম। এই গ্রামের মানুষের প্রধান জীবিকা পাহাড়ের ধাপে ধাপে এলাচের চাষ আর গাইডের কাজ। এখানকারই মানুষ রবেন ও সুব্বাজি। ইয়ুকসাম থেকে তাঁবু, রান্নার সরঞ্জাম, রান্নার কাঁচামাল আর এই দুজন গাইড—কমপ্লিট প্যাকেজ—হায়ার করতে বেশ দরাদরি হল। দস্তুরমতো দরাদরি শুনে সেই মুহূর্তে মানুষ ভাবতেই পারত যে, এদের মতো ব্যবসাদার লোক আর হয়না। কিন্তু যখন থেকে রবেন আর সুব্বা আমাদের দলের একজন হয়ে গেল, তখন থেকেই পরিবেশটাই যেন বদলে গেল, মনে হতে লাগল এদের মতো মানুষ আর হয় না—এত হেল্পফুল, এত কেয়ারি, এমন বন্ধু! হাসি-ঠাট্টায় সময় কাটতে লাগল বেশ, পথ চলল এগিয়ে। সে পথের শেষে সোনা রঙ মেখে কাঞ্চনজঙ্ঘা ‘আয় আয়’ বলে ডাকছে। তার ডাক শুনতে পেলাম মন্দ্রস্বরে। তখন উৎসাহ বেড়ে হল দ্বিগুণ।
তিন নম্বর দিনটা বেশ মারাত্মক। সেদিন শুরু হল মারাত্মক চড়াই। সোনালিদি আর হাঁটতে পারছিল না। দুদিনে আমরা অনেকটা উঁচুতেই উঠে পড়েছি। এবার শ্বাসে টান ধরছে, হাঁটতে দম লাগছে বেশি, হাঁফ বাড়ছে পদে পদে। একটু গিয়ে বার বার বসে পড়ছিল সোনালিদি। আমাদেরও অপেক্ষা করতে হচ্ছিল বার বার। ফলে দলটার গতি যাচ্ছিল এক্কেবারে কমে। এভাবে গেলে আমাদের রসদ তো ফুরোবেই, এমনকি অহেতুক সময় নষ্ট হবে বেশি। আমরা অফিস কাট করে ট্রেক করতে আসা মানুষ। সামনে কাঞ্চনজঙ্ঘা আর পেছনে অফিসের বস। টাইম নিয়ে টানাটানি। এই দোটানা থেকে উদ্ধার করতে এগিয়ে এলো রবেন। সমস্ত মালপত্রের ভার নিল সুব্বা। আর সোনালিদিকে সাপোর্ট দিয়ে এগিয়ে নিয়ে চলল রবেন। সে যাত্রায় আমরা অবশ্য কাঞ্চনজঙ্ঘার মুখোমুখি হতে পারিনি, সবাই কমবেশি অসুস্থ হয়ে পড়ায় চার দিনের রাস্তা থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হই। সেই সময়টায় সুব্বা আর রবেনের জন্যই আমাদের সুস্থ হয়ে ফেরা সম্ভব হয়েছিল। মালপত্রের বোঝা সামলে সেবার ভার নিয়ে এই দুর্গম পথের বন্ধু হয়ে এই মানুষ দুটো আমাদের আত্মীয় হয়ে উঠেছিল। আমরা দেখেছিলাম পেশাজীবনের বাইরে সহানুভূতিশীল সহৃদয় দুটি মানুষকে। সেদিন পথ আমাদের দুই বন্ধু দিয়েছিল, আর ফেসবুক আমাদের সেই বন্ধুত্ব প্রতিদিন এগিয়ে নিয়ে চলেছে। আজ ফ্রেণ্ডশিপ ডে’র সকালেই কেন জানি না আমার/আমাদের সেই দুই বন্ধু সুব্বা আর রবেনের কথাই মনে পড়ছিল বার বার, তাই তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব শুরুর দুর্গম দিনগুলির কথা শেয়ার করলামমাত্র।

Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news