Breaking News
Home / TRENDING / ফ্রেণ্ডশিপ ডেঃ পাতানো বন্ধুত্বের সেকাল—সাহিত্য ও টুকরো স্মৃতির আয়নায়

ফ্রেণ্ডশিপ ডেঃ পাতানো বন্ধুত্বের সেকাল—সাহিত্য ও টুকরো স্মৃতির আয়নায়

পার্থসারথি পাণ্ডা :

মকরসংক্রান্তির ভোরে, যখন আমাদের সেই গাঁয়ের স্যাঙাৎ নদীটির বরফহিম জলে কুয়াশা চুইয়ে চুইয়ে ঝরত, তখন আমরা ‘যত ডুব, তত পিঠে’ ঘুষতে ঘুষতে নাইতে যেতাম তার বুকছ্যাচা জলে। পাড়ে দাঁড়িয়ে হু হু বাতাসের ভীষণ কাঁপুনিকে রামকলা দেখিয়ে যে একছুটে পালিয়ে আসব তারও উপায় নেই; কারণ, ভেতরে ক্ষীর টসটস পিঠে খাবার দুর্নিবার লোভ—কোন এক আলপ্পেয়ে নিয়মে কম সে কম কুব কুব তিন ডুব না দিলে নাকি পার্বণের পিঠেই খাওয়া যাবে না! শেষ পর্যন্ত তাই হিমের ভেতরে গা না ডুবিয়ে আর কোন উপায় থাকে না।

দোনমনো করে ডুব দিয়ে বাড়ি ফেরার পথেই এদিন পুব আকাশ ফরসা হত। পথে দেখা হতো খোল, করতাল আর হারমোনিয়াম নিয়ে চাদরমুড়ি দিয়ে প্রভাতফেরীতে বেরিয়ে পড়া হরিভক্তদের সঙ্গে। ষোল নাম বত্রিশ অক্ষরে সুর তুলে তাঁরা যেতেন একে একে গাঁয়ের সকলের বাড়ি। নামগান করে শালপাতার দোনা ভরে আস্বাদ নিতেন ‘মকর চাল’-এর। এই আস্বাদের সাধনপথে সঙ্গী হতাম আমরাও।

দুধের সঙ্গে চালের গুঁড়ো, চিনি বা আখের গুড় জ্বাল দিয়ে ফুটিয়ে ক্ষীরের মতো ঘন করে তা উনুন থেকে নামানো হত। তারপর, আগে থেকে গরম জলে ভিজিয়ে রাখা আতপ চাল আর কুচনো নানান ফল সেই ক্ষীরের সঙ্গে মিশিয়ে তৈরি হত ‘মকর চাল’। কনকনে শীতের সকালে গরম গরম মকর চালের স্বাদ পেয়ে মন বলত, ‘অপূর্ব’!

তো এদিন, স্নান সেরে একে অপরকে মকর চাল খাইয়ে বেশ ঘটা করে ছেলেতে-ছেলেতে আর মেয়েতে-মেয়েতে পাতানো হত বন্ধুত্ব; সেই বন্ধুত্বের নাম ছিল, ‘মকর’। উনিশ শতকের কবি ঈশ্বর গুপ্তের ‘পৌষ-পার্বণ’ কবিতায় এই বন্ধু-নামের উল্লেখ রয়েছে—
‘মকর-সংক্রান্তি-স্নানে জন্মে মহাফল।
মকর মিতিন সই চল চল চল।।’

বছর পঞ্চাশ আগে সুদূর গাঁ-গঞ্জের যেসব স্ত্রীলোক কপালগুণে এই মকর সংক্রান্তিতে জীবনে একবার গঙ্গাসাগরে যাওয়ার সুযোগ পেতেন, তাঁরা স্নান করে পূণ্য অর্জনের ফাঁকে নিজেদের সঙ্গী কিম্বা তীর্থের কোন সদ্য পরিচিতের সঙ্গে ‘গঙ্গাসাগর’ পাতিয়ে এক নতুন বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তুলতেন। গঙ্গার জলে অবগাহন করে যেমন পুন্যি হয় বলে মনে করা হয়, তেমনি একদা তার বুক-জলে নেমে শপথ নিয়ে পাতানো সই-সম্পর্কও বড় পবিত্র বলে মনে করা হত। এছাড়াও আমাদের ভাগীরথী গঙ্গার বুকে কোন পুণ্য-পার্বণ উপলক্ষ্যে আঁজলা ভরে একে অপরের হাতে জল দিয়ে মেয়েতে-মেয়েতে পাতানো হত আর এক সই-সম্পর্ক, ‘গঙ্গাজল’।

তবে, সেকালের সইয়েরা কিন্তু মাঝেমাঝেই নিছক আবেগের বশে নিজেদের ছেলেমেয়ের মধ্যে বিয়ে দেবার অঙ্গীকার করে বসতেন। ছেলেমেয়েরা হয়তো তখন নেহাতই শিশু; তবুও বড় হলে বিয়ে দেবেন, দুই সইয়ের সম্পর্ক আরও পোক্ত হবে—এই ভাবনা থেকেই হয়তো তারা কথা দিয়ে বসতেন। যদিও প্রায়ই সেটা ছাদনা অব্দি গড়াত—তবুও গ্রহের ফেরে মাঝে মাঝে বেশ বিপত্তিও ঘটত। এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে শরৎবাবুর ‘শ্রীকান্ত-দ্বিতীয় পর্বে’ ভবঘুরে শ্রীকান্তের কথাই না হয় ধরুন। সেখানে দেখি, হঠাত তার হাতে এলো গঙ্গাজলকে লেখা তার মায়ের একটি চিঠি। তাতে লেখা—মেয়ের জন্য গঙ্গাজল যদি সুপাত্র জোটাতে না পারে তবে তো তাঁর ছেলে রয়েইছে, তার সঙ্গেই ওই মেয়ের বিয়ে দেবেন। ভবঘুরে শ্রীকান্তের জীবনে এর চেয়ে বড় বিড়ম্বনা আর কি হতে পারে, বলুন! তবে স্বস্তির কথা এই যে, মায়ের চিঠিতে ‘যদি’র ফাঁকটুকু পেয়ে আর ভালো পাত্র জুটিয়ে দেবার খরচ বহন করতে চেয়ে শ্রীকান্ত মুক্তি পেয়েছিল। সবার কপালেই তো আর ‘যদি’র ফাঁক থাকে না, মুক্তিও জোটে না। ‘যদিদং হৃদয়ং’ জপতে জপতে শেষমেশ বাঁধা পড়তেই হত সাধের ‘উদ্বাহুবন্ধনে’!

কেতাব থেকে আবার ফিরি আমাদের গাঁয়ের কথায়। সেখানে আজ থেকে বছর পঞ্চাশ আগে কাছেপিঠে কোন বড় রাস্তা ছিল না, বাস তো দূরের কথা—আধুনিক যুগের ছাপমারা কোন গাড়িই চলত না। বাসে চড়ে দূরে কোথাও যেতে হলে বোঁচকাবুঁচকি ঘাড়ে করে হাঁটতে হতো কয়েক মাইল। এমনধারা কষ্ট করেই একবার আমার ঠাকুমা তাঁর গাঁয়ের এক জায়ের সঙ্গে পুরুষোত্তমক্ষেত্র পুরী গিয়েছিলেন। শ্রীজগন্নাথকে চোখের দেখা দেখতে। তার জন্য তিল তিল করে বহুদিন ধরে জমিয়েছিলেন একটি একটি করে টাকা। বাঙালির কাছের তীর্থ বলতে একমাত্র পুরী। সেখানে গিয়ে জগন্নাথ দর্শন করেই বাঙালি বিধবারা তখন ভারততীর্থের সাধপূরণ করতেন। সেদিন তাঁরা আজকের মতো, এত সহজে দ্বিতীয়বার সেখানে যেতে পারবেন বলে ভাবতেই পারতেন না। সে সামর্থ্যই ছিল না। তাই সেই পুন্যিস্থানে একটা সহযাত্রীর সঙ্গে ভগবানকে সাক্ষী মেনে সখ্যের সম্পর্ক পাতিয়ে তীর্থের স্মৃতিটুকু সারাজীবন অক্ষয় করে রাখতেন।

তখনও জগন্নাথের মন্দিরে মহাপ্রসাদ (জগন্নাথের অন্নপ্রসাদ) কিনতে পাওয়া যেত, শুকনো—ছোট্ট ছোট্ট পাশবালিশের মতো দেখতে সুন্দর গোলাপি কাপড়ে সেলাই করা থলিতে। ঠাকুমা আর তাঁর জা, মন্দিরে দাঁড়িয়ে একে অপরের হাতে সেই মহাপ্রসাদ দিয়ে, জিভে ঠেকিয়ে, জগন্নাথকে সামনে রেখে একে অপরকে ‘মহাপ্রসাদ’ বলে ডেকেছিলেন।

অনেকদিন হয়ে গেল, দুজনেই আর নেই। কিন্তু যতদিন বেঁচে ছিলেন, সেই সখ্যতা তাঁরা বজায় রেখেছিলেন। ঠাকুমা যখন আর কোথাও যেতে পারতেন না, শুয়ে থাকতেন ঠায় বিছানায়, তখন তাঁর মহাপ্রসাদ রোজ ঘোর সাংসারিক আলাপের মাঝে প্রানের কথা বলে হালকা হতে আসতেন, গল্পগুজব করে যেতেন। উৎসব অনুষ্ঠানে পাশে এসে দাঁড়াতেন—পরিবারের একজন হয়ে। এঁদের এই সখ্য তো আবাল্য নয়, দুই সংসারী মহিলার পড়ন্ত বয়সের সখ্য। অথচ, দেখে মনে হত যেন অনাদিকালের মিতালি।

গয়াধামে তীর্থে গিয়ে অনেকেই স্বর্গত পূর্বপুরুষের পিণ্ডদান করে আসেন। পুরনো দিনের কয়েকজনের মুখে শুনেছি সেকালে পিণ্ডদান করতে গিয়ে সধবা মহিলারা সদ্য পরিচিত কারও সঙ্গে ‘গয়াবালি’ নামের সই পাতাতেন। গয়ার পবিত্র বালি হাতে হাতে নিয়ে, এ-ওঁর হাতে নতুন নোয়া পরিয়ে দিয়ে আর রঙিন সুতোর ডুরি বেঁধে দিয়ে বন্ধুত্বের শপথ নিতেন। কামনা করতেন একে-অপরের আমরণ সধবা জীবন। এখানে শুধু এটুকু ভেবেই আশ্চর্য হই যে, মানুষ যে-ভূমিতে বসে পিণ্ড দিয়ে তার পূর্বপুরুষের সঙ্গে সমস্ত ঐহিক যোগের অবসান ঘটাতে যায়, সেখানেই এক নতুন সম্পর্কের সূচনা ঘটিয়ে এঁরা ফিরে আসতেন ঘরে। ভারি অদ্ভূত, না?

Spread the love

Check Also

Big Breaking: হুমায়ুনকে ওয়েসির ‘ফিলার,’ কী উত্তর দিলেন তৃণমূলের বিধায়ক

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় হুমায়ুনকে ওয়েসির ফোন! দল তাঁকে শো-কজ করেছে। তিনি সেই শো-কজের উত্তরও দিয়েছেন। তাতেও …

রাহুলের পাইলট প্রোজেক্ট, মুর্শিদাবাদ কংগ্রেসে আধিপত্য হারাতে পারেন অধীর

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে রাহুল গান্ধির নতুন উদ্যোগে মুর্শিদাবাদের কংগ্রেস রাজনীতিতে খর্ব হতে পারে অধীর …

আমি আসছি! নাম না করে শুভেন্দুকে শাসালেন আনিসুর

চ্যানেল হিন্দুস্থান, নিউজ ডেস্ক: নাম না করে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারিকে শাসালেন আনিসুর রহমান। একদা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *