জ্যোতিস্মিতা রায়
নিউজ রুমে কাজ করার অভিজ্ঞতাটা যে ঠিক কেমন, তা ইস্তিরি করা ফুলশার্ট- টেরিকটের প্যান্ট পরিহিত স্মার্ট কর্পোরেট ক্রাউডকে বোঝানো যাবে না। পাতি বাংলায় বলতে গেলে, যাকে বলে ‘মাছের বাজার’। সকাল থেকেই হই-হট্টগোল, চেঁচামেচি- ছোটাছুটি লেগেই আছে। এই টোটাল প্যান্ডেমোনিয়ামের মধ্যেই চুপি চুপি গড়ে উঠেছে বহু অটুট বন্ধুত্ব। এমন বন্ধুত্ব যা ‘শোলের’ জয়-বীরুর ‘দোস্তি’কেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেবে। হাউস বদলে যায়, জায়গা বদলে যায় কিন্তু নিউজ রুমের বন্ধু একই থেকে যায়।
এই যেমন এক মিডিয়া হাউসে এক কর্মবীর প্রোডিউসারের সঙ্গে বন্ধুত্ব হল এক মহা ফাঁকিবাজ কপি এডিটরের। যেমন তেমন নয়, এক্কেবারে গলায় গলায় বন্ধুত্ব। তা দুই বন্ধু একদিন ঠিক করল লাঞ্চে রুমালী রুটি সহযোগে গলৌটি কাবাব খাবে। যেমনি ভাবা, তেমনি অর্ডার অনলাইনে। গরম গরম রুটি কাবাব এসেও গেল আধঘন্টার মধ্যে । কিন্তু দুই বন্ধুর আর খাওয়ার সময় হয় না। ফাঁকিবাজ কপি লেখা শেষ করে উঠে দেখে কর্মবীর বুলেটিন করতে গিয়েছে । এদিকে কর্মবীরের কাজ শেষই হয় না। বন্ধুকে ছাড়া খেতেও যাবে না ফাঁকিবাজ। এভাবেই বেলা গড়াতে থাকে। এদিকে হয়েছে কি, অফিসের ব্যস্ত ক্রাইম রিপোর্টার দুটো চুরি, একটা বধূহত্যা, একটা বেআইনি পুকুর ভরাটের খবর করে অফিসে ঢুকেছে। এসেই ক্যান্টিনে হাঁকডাক-“ ওরে! কিছু আছে নাকি রে?” নিরীহ বেয়ারা কিছু না পেয়ে কাবাবের হাঁড়িটাই দেখিয়ে দেয় ক্রাইম রিপোর্টারকে। রুটি দিয়ে চারটে কাবাব সাবাড় করে সে ফের বেরিয়ে পড়ে কাজে। এদিকে দুই বন্ধু অবশেষে সময় বের করে ক্যান্টিনে এসে দেখে চাঁচিপুঁছি কাবাবের হাঁড়ি। হাসতে হাসতে সেদিন ম্যাগি দিয়েই লাঞ্চ সারে তারা।
আরও আছে, এক জনপ্রিয় টিভি চ্যানেলের মস্ত বড় অ্যাঙ্কারের মর্নিং শিফট পড়েছে। ৬টায় লাইভ নিউজ, আর সাড়ে পাঁচটা বাজতেই অ্যাঙ্করের নতুন বান্ধবী ‘গুড মর্নিং’ পাঠিয়ে দিয়েছে । কাজেই মেজাজ ফুরফুরে অ্যাঙ্করের। গুনগুন করে গেয়েই চলেছে। কিন্তু তাঁর সঙ্গী এক রাতজাগা প্রোডিউসার ও ডবল শিফট করা সাউন্ড রেকর্ডিস্ট। খবর চলছে- অ্যাঙ্কার একটা করে খবর পড়ছে আর তারপর ছবি যাচ্ছে। এরমধ্যে হঠাৎ ছবি চলতে চলতেই অ্যাঙ্কার একটি হিন্দী ছবির চটুল গান গেয়ে ওঠে। হতচকিতভাব কাটিয়ে সাউন্ড রেকর্ডিস্ট বুঝে যায় ঘুমের ঘোরে অ্যাঙ্কারের ‘ফেডার’ নামাতে ভুলে গিয়েছে সে। যদিও পুরো ব্যাপারটা দু তিন সেকেন্ডের মধ্যেই সামলে যায়, তবুও কথায় আছে না- যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই সন্ধ্যে হয়। সেদিনও হল তাই। সেদিন থেকেই ভোরে উঠে প্রাণায়াম করবেন ঠিক করেছিলেন চ্যানেলের চেয়ারম্যান । উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে অব্যর্থ ওষুধ। টিভিতে নিজের চ্যানেল অন করে আসন করেছিলেন তিনি। অসমের বন্যার ছবির ওপর অ্যাঙ্কারের গলায় গান শুনে প্রায় হার্টফেল হওয়ার জোগাড় তাঁর। সঙ্গে সঙ্গে ফোন করেন প্রোডিউসারকে। “এসব কী হচ্ছে? সাউন্ডের লোক কী ঘুমোচ্ছে নাকি?” প্রোডিউসার বন্ধু সাউন্ড রেকর্ডিস্টকে বাঁচাতে অম্লান বদনে উত্তর দেয় “কি জানি স্যার আমরা তো কিছুই শুনিনি।“ এতে নাকি থতমত খেয়ে ফোন রেখে দেন চেয়ারম্যান নিজেই। সেবারের মতো চাকরি বেঁচে যায় তার।
নিউজ রুমের ২০০০ স্কোয়্যার ফিটের জায়গায় জায়গায় এরকম কত বন্ধুত্বের গন্ধ লেগে। সব লিখতে গেলে শেষ হবে না। হয়তো কর্পোরেট ল্যাডার বেয়ে ওঠার রেস নেই বলেই এই বন্ধুত্ব আজও এত অমলিন। ‘ফ্রেন্ডস ফর বেনিফিটস’ এর যুগে নিউজ রুমে গড়ে ওঠা বন্ধুত্বগুলি যেমন নির্মল, ততটাই নির্ভেজাল।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news