Breaking News
Home / TRENDING / দেশের নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কারক হয়ে চিরদিন বেঁচে থাকবেন শেষণ

দেশের নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কারক হয়ে চিরদিন বেঁচে থাকবেন শেষণ

 দেবাশিস দাশগুপ্ত:

১৯৯০ সালের আগে কেই বা চিনত ১৯৫৫ সালের ব্যাচের তামিলনাড়ু ক্যাডারের আইএএস অফিসার তিরুনেললাই নারায়ণ আইয়ার শেষণকে। এরকম আইএএস, আইপিএস অফিসার তো দেশে অসংখ্য আছেন। কাকে কে মনে রাখবে। অথচ সেই টি এন শেষণই রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে উঠলেন ১৯৯০ সালের ডিসেম্বর মাসের পর থেকে। বস্তুত দেশের মানুষ তাঁকে চিরকাল মনে রাখবে নির্বাচনী ব্যবস্থার আধুনিক সংস্কারক হিসেবে। তিনি দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হওয়ার আগে দেশের মানুষ জানতেই পারেনি, নির্বাচন কমিশনের কতটা কী ক্ষমতা। তিনি কমিশনার হওয়ার আগে নির্বাচন কমিশন ছিল কেন্দ্রীয় সরকারের হাতের পুতুল। যখন যে দল বা সরকার কেন্দ্রের ক্ষমতায় এসেছে, নির্বাচন কমিশন তখনই সেই সরকারের তল্পিবাহক হয়ে পড়েছে। নির্বাচন কমিশনের যে স্বাধীন এবং স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশেষ ভূমিকা থাকতে পারে বা আছে, তা শেষণ মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হয়ে আসার আগে আমজনতা জানতেই পারত না।

শেষণ কমিশনের দায়িত্ব নিয়েই সরকারকে এবং আমজনতাকে বুঝিয়ে দিলেন, তিনি অন্য ধাঁচের মানুষ। কমিশনের কাজে তিনি সরকারকে কখনও হস্তক্ষেপ করতে দেননি।

শেষণের বড় কৃতিত্ব হল, নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনা। যা তাঁর আগে কোনও মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ভাবতেই পারেননি। তিনিই সচিত্র পরিচয়পত্র চালু করেছিলেন। ভোটে নজরদারি চালানোর জন্য সাধারণ এবং অর্থনৈতিক পর্যবেক্ষক নিয়োগ করাও তাঁরই মস্তিষ্কপ্রসূত। শুধু তাই নয়, সারা দেশে ভোট যাতে যথার্থ নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে শান্তিতে হয়, ভোটাররা যাতে নিশ্চিন্তে ভোট দিতে পারেন, তার ব্যবস্থাও শেষণই প্রথম করেন।

ভোটে এই সব কড়াকড়ির জন্য শেষণকে কম সমালোচনার মুখে পড়তে হয়নি। ডান, বাম, নির্বিশেষে সব রাজনৈতিক দলই তাঁর বিরুদ্ধে কথা বলতে ছাড়েননি। তিনি প্রাথমিকভাবে সচিত্র পরিচয়পত্রের সূচনা করেছিলেন। কিন্তু তখন তা সর্বগামী হয়নি। পরবর্তীকালে এই দাবিতে সরব হন তখনকার যুব কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জি। তিনি ‘নো এপিক, নো ভোট’, এই স্লোগানকে সামনে রেখে ধর্মতলায় অনশন আন্দোলনও করেন। কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করার পরেও মমতা দীর্ঘদিন ধরে এই দাবিতে সোচ্চার ছিলেন।

আগেই বলেছি, ভোটের ব্যবস্থাপনায় সংস্কার আনতে গিয়ে তিনি প্রায় সব রাজনৈতিক দলের বিরাগভাজন হয়ে উঠেছিলেন। একবার এই রাজ্যে শ্রীরামপুরের একটি উপনির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা করেও শেষণ তা বাতিল করে দেন। তখন মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন জ্যোতি বসু। তিনি শেষণকে মেগালোম্যানিয়াক পর্যন্ত বলেছিলেন। শেষণের ঘোষণা ছিল, ১৯৯৫ সালের ১ জানুয়ারির মধ্যে সচিত্র পরিচয়পত্র চালু না হলে ভোট করতে দেওয়া হবে না। পরে অবশ্য সেই সচিত্র পরিচয়পত্র চালু হয়। শেষণেরও স্বপ্ন পূরণ হয়। সেই সময় সিপিএমের প্রবল পরাক্রম রাজ্যে। আর তেমনি দাপট ছিল জ্যোতিবাবুর। এসব দেখেশুনে জ্যোতিবাবু বলেন, আমাদের দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার পদে একজন পাগল বসে রয়েছেন বলেই যত সব ঝামেলা হচ্ছে। শেষণ কিন্তু তাতে দমে যাননি। তিনি তাঁর মতো করে কাজ করে গিয়েছেন। নির্বাচনী আচরণ বিধি কঠোরভাবে মানানোর ব্যাপারেও তিনি ছিলেন পথিকৃৎ। রাজনীতিক এবং সরকারি অফিসারদের মধ্যে অনেকেই ওই আচরণ বিধিকে পাত্তা দিতেন না। শেষণের দাপটে তাঁরা সেই বিধি মানতে বাধ্য হন। অনেক বাঘা রাজনীতিক, আমলা নির্বাচনী আচরণ বিধি ভঙ্গ করে শেষণের কোপে পড়েছিলেন। এমনকি রাজ্যপালদেরও তিনি রেয়াত করতেন না।

এটা যেমন তাঁর একটি দিক ছিল, তেমনি তিনি ছিলেন অত্যন্ত দাম্ভিক এবং একরোখা। ভোটের কাজে কলকাতায় এলে রাজ্য নির্বাচন দপ্তরের কর্মী, অফিসাররা ভয়ে সিঁটিয়ে থাকতেন। পান থেকে চুন খসলেই তিনি ক্ষেপে যেতেন। এমনকি সাংবাদিকদেরও তাঁর তোপের মুখে পড়তে হত। একবার সম্ভবত রাজভবনে এক সাংবাদিক বৈঠকে দেরি করে আসার জন্য এক প্রবীণ সাংবাদিককে তিনি বলেছিলেন, গেট আউট।

আবার অবসরের পর তিনি গুজরাটের গান্ধীনগরে বিজেপির লালকৃষ্ণ আদবানির বিরুদ্ধে কংগ্রেসের প্রার্থী হয়েছিলেন। যদিও হেরে যান। ২০০২ সালে এপিজে আব্দুল কালামের বিরুদ্ধে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে লড়াই করেন। যে জ্যোতিবাবু তাঁকে পাগল বলেছিলেন, সেই জ্যোতিবাবুর কাছেই শেষণ এসেছিলেন সমর্থন চাইতে। তখন জ্যোতিবাবুর সঙ্গে কথা বলে বেশ খুশিই হন তিনি।

আজ শেষণ চলে গিয়েছেন। এক সময় যে রাজনৈতিক নেতারা তাঁর সমালোচনায় মুখর ছিলেন, এখন তাঁরাই তাঁর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি যেমন বলেছেন, তাঁর সঙ্গে আমাদের অনেক বিষয়ে মতভেদ ছিল। কিন্তু ভারতীয় নির্বাচন ব্যবস্থাকে তিনি যে ভাবে স্বচ্ছ করার জন্য সচেষ্ট ছিলেন, তার জন্যই সকলে তাঁকে মনে রাখবে।

এটুকু বলা যেতেই পারে, শেষণ না থাকলে আজও নির্বাচন কমিশনের অস্তিত্ব দেশের আমজনতার কাছে মালুম হত না।

 

 

 

প্রবীণ সাংবাদিক। বর্তমান এবং এই সময় কাগজের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন বহুদিন।

Spread the love

Check Also

সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করলে কাউকে ছাড়া হবে না, কড়া বার্তা মুখ্যমন্ত্রীর

ওয়েব ডেস্ক: সরকার সম্পত্তি নষ্ট করলে কাউকে ছাড়া হবে না, কড়া বার্তা মুখ্যমন্ত্রীর। রাজ্যজুড়ে নাগরিকত্ব …

ট্রেন বাস পোড়ালে ক্ষতি মোদী মমতার না বরং দেশের: ত্বহা সিদ্দিকি

নিজস্ব সংবাদদাতা: প্রতিবাদ হোক, কিন্তু শান্তিপূর্ণ। এমন কিছু করবেন না যাতে দেশের ক্ষতি হয়, মানুষের …

“সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করুন !” মুখ্যমন্ত্রীকে পরামর্শ রাজ্যপালের

সূর্য সরকার। “মুখ্যমন্ত্রী সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করুন।” শনিবার টুইট করে এমনই পরামর্শ দিয়েছেন রাজ্যপাল জগদীপ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *