Breaking News
Home / TRENDING / ইডেনে ভারত-বাংলা গোলাপি টেস্ট, ‘বঙ্গভঙ্গ’ হতে দিলেন না সৌরভ!

ইডেনে ভারত-বাংলা গোলাপি টেস্ট, ‘বঙ্গভঙ্গ’ হতে দিলেন না সৌরভ!

 কিশোর ঘোষ

আজ সকালেই, সোশ্যাল মিডিয়ায় অভিনেত্রী জয়া এহসানের একটি ছবি পোস্ট করেছেন আমার বন্ধুলোক, বাংলা সংবাদমাধ্যমের এক পরিচিত ফোটোগ্রাফার। বোঝাই যাচ্ছে এ ছবি ‘গোলাপি টেস্টে’র আবহাওয়াতেই তোলা। আসল কথা, ছবিটা যেন শুক্রবারের ঐতিহাসিক টেস্টের দ্বন্দ্বমূলক ‘ফিফটি-ফিফটি’ আবেগের বার্তাবাহক। কেন? কারণ ফটোগ্রাফটি এমন—দুই বাংলার জনপ্রিয় অভিনেত্রী দুই দেশের ছোট সাইজের দুই পতাকা দু’হাতে ধরে মিষ্টি হাসছেন। সবচেয়ে বড় কথা, ছবি দেখে অন্তত বোঝা যাচ্ছে না, জয়া মনে মনে কোন দিকে ঝুঁকে! এখানে স্পষ্ট করা ভালো যে, এই দ্বিধাদ্বন্দ্বময় আবেগের সঙ্গে বাকি ভারতের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই। এ হল ‘পশ্চিমবঙ্গীয়’ ঝঞ্ঝাট! যাতে করে অতীতের মতোই ফের আরেকবার ভারত-বাংলাদেশ ক্রিকেট ম্যাচ নিয়ে এক্সক্লুসিভ অস্বস্তিতে পড়েছে গঙ্গা-পদ্মা পারের বাঙালি। ইতিমধ্যে সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের এক বক্তব্য নিয়ে বাজার গরম হয়েছে। প্রাক স্বাধীনতা যুগে অবিভক্ত বাংলার ময়মনসিংহে জন্মানো শীর্ষেন্দু বলে ফেলেছেন, আজ কোন দিকে যাব, কাকে সমর্থন করব বুঝতে পারছি না। ভারত-বাংলাদেশ খেলা হলে এই সমস্যাটা হয়।
হওয়াটাই স্বাভাবিক। সত্যি, জন্মস্থান ধরলে বাংলাদেশে শিকড় রয়েছে মানুষটার। তবে লেখকের কথায় ভারত বিরোধ খুঁজে বের করছেন যারা, বলতে হয় তাদের ইতিহাসবোধ নেই। খেয়াল নেই যে, ‘ঘুণপোকা’র স্রষ্টার জন্ম সেই ১৯৩২-এ। অর্থাৎ বৃহত্তর ভারত ভূখণ্ডে। অনেক পরে ১৯৪৭-এ ওইসব ভাগাভাগি। তার মানে বাঙালি আবেগের যে ঐতিহাসিক বিভাজন ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর ঘটল তার সঙ্গে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়দের প্রজন্মের কোনওরকম সম্পর্ক নেই। এবং তিনি জন্মগতভাবে ভারতীয় (অখণ্ড) ও বঙ্গদেশি (বাংলাদেশি নয়)। এর ফলেই হয়তো মহান ভারতীয় লেখক ও বাঙালি আইডেন্টিটির মধ্যে দড়ি টানাটানি।


পরিচালক অনীক দত্ত আবার এইসব আবেগটাবেগের মধ্যে নেই। সাম্প্রতিক অতীতে বাঙালি দর্শকের কাছে যে চলচ্চিত্রটি খাঁটি বাঙালি প্রোডাক্ট বলে মনে হয়েছে, সেই ‘ভূতের ভবিষ্যত’-এর পরিচালক বললেন, ”আমি ক্রিকেট লাভার। আগে খুব খেলা দেখতাম। টেস্ট এবং ওয়ানডে। টি-টোয়েন্টিকে আমি ক্রিকেট বলে মনে করি না।” অনীক নিজেই জানালেন, মা ও বাবা পূর্ব বঙ্গীয়। ”কিন্তু আমার এখানে জন্ম, এখানেই বেড়ে ওঠা। ভারতকেই সাপোর্ট করেছি।” আরও জানালেন, ”ইন্ডিয়া-পাকিস্তান ম্যাচ নিয়ে হালকা উত্তেজনা ছিল বটে। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভৌগলিক সীমারেখাগুলো আর গুরুত্বপূর্ণ নয়। এখন খেলাটাকেই আসল মনে করি।”
বোঝাই যাচ্ছে অনীক ট্রু স্পোর্টস লাভার। কাছাকাছি হয়েও কিছুটা ভিন্নমত পোষণ করেন ‘এক যে আছে কন্যা’ খ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক সুব্রত সেন। তাঁর কথায়, ‘ভারতকেই সমর্থন করব। ঘটি-বাঙাল আবেগ আমার নেই।’ নিজেই জানান, বাবা-মা পদ্মাপারের মানুষ। পাশাপাশি জানিয়ে দেন, ”কিন্তু তাঁরা তো ভারতেরই নাগরিক ছিলেন, কারণ ওঁরা স্বাধীনতার বহু আগে জন্মেছেন। অন্যদিকে আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা কলকাতায়। কাজেই বাংলাদেশ দলটিকে ‘বাঙালি’ বলে সাপোর্ট করব এতটা ভাবতে পারি না।”


সুব্রত সেন ও অনীক দত্ত এমনটা বললেও ঠিক এভাবেই কিন্তু ভাবেন না পশ্চিমবঙ্গের সর্বস্তরের বাঙালি। ভাবলে প্রত্যেকবার ভারত-বাংলাদেশ ম্যাচ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয় না। এমনকী একে অপরকে নোংরা গালগাল! যা অনভিপ্রেত। সেবার তো ধোনির ফোটোশপ করে এমন কাণ্ড করেছিল বাংলাদেশি ফ্যানেরা! না, সেই গরম বিদ্বেষ এবার প্রায় নেই। কিন্তু কেন? এই সেদিনও তো, গত বিশ্বকাপের বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচ নিয়েও টুইটার-ফেসবুক-হোয়াটসঅ্যাপে একপ্রকার যুদ্ধ বেঁধে গিয়েছিল। যেন নয়া ‘বঙ্গভঙ্গ’! এবার হলটা কী? হ্যাঁ, ‘কিই’, ‘কিই’ মানে চাবি, চাবির নাম সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়।
প্রাক্তন ভারতীয় অধিনায়ক, বর্তমান বিসিসিআই প্রেসিডেন্টের এক্সক্লুসিভ জাদুদণ্ডেই এত এত রাগ, হিংসা, কাদা ছোড়াছুড়ি ভোজবাজির মতো ভ্যানিস! আসলে সৌরভ হল সেই চাবি, যা দিয়ে দু’বাংলার তালা খোলা যায়। পক্ষান্তরে এক করে দেওয়া যায় বাংলা-ভারত ও বাংলাদেশকে। বাংলাদেশের মিসফিকুর, লিটন, মহম্মদৌলাদের জিজ্ঞেস করুন, শুনবেন ওঁরাও বলছে দাদাই আইডল। এদেশের বাঙালির কাছে সৌরভ কেমন? প্রয়াত পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষের ভাষায় ‘বাঙালির সাংস্কৃতিক আইকন’। যাঁকে নিয়ে কবিতা লেখেন সমকালের কবি সুবোধ সরকার। কলেজে পড়া বাঙালি তরুণীর কাছে তিনি হার্টথ্রব, কাকিমা জেঠিমা, কাকাবাবু, জ্যাঠামশাইদের কাছে ‘প্রিয় সন্তান’ তিনি। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও সত্যি, বাংলার ফুটবল ভাঙতে ভাঙতে যে ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গেল, মাফ করবেন তাও পরোক্ষে সৌরভের ‘দোষে’ই। যেহেতু নতুন শতাব্দীর বাবা-মায়েরা আদরের সন্তানটিকে ‘সৌরভের মতো’ সফল দেখতে চান। আর কারও মতো নয়। আর ‘সাফল্য’ জিনিসটাই যে শেষ কথা তা তো সবার জানা। এও ঠিক যে, সর্বোচ্চ পর্যায়ে কৃতবিদ্যায়, হেরে গিয়েও লড়ে জীবন জিতে নেওয়ায় বর্তমান বিসিসিআই প্রেসিডেন্টের ধারেকাছে দু’বাংলার কেউ নেই। তিনি যে সেরার সেরা তার প্রমাণ আজও রাখলেন।


ভারতীয় ক্রিকেটের দায়িত্ব নিয়েই ইডেনে গোলাপি বলে ডে-নাইট টেস্ট-এর আয়োজন। যা উপহার দিলেন নিজের শহর, নিজের প্রিয় মাঠকে। যেখানে এনে হাজির করালেন সারা ভারতের ক্রিকেট কিংবদন্তিদের। এবং এক আকাশের তলায় আনলেন দুই বাংলাকেও। ঐতিহাসিক ম্যাচ উদ্বোধন করলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
এই জন্যই তো সৌরভ বাঙালির সাংস্কৃতিক আইকন। খেলাটাকে এমন উচ্চতায় পৌঁছে দিলেন যে, সেখানে ঘটি-বাঙাল, ভারতীয় বাঙালি ও বাংলাদেশি জাতীয় কোনও ভাগাভাগি, স্যাঁতস্যাঁতে সঙ্কীর্ণতার অবকাশই রইল না।

Spread the love

Check Also

লাল কেরালায় সবুজ ডিম : গবেষণায় বিজ্ঞানীরা

চ্যানেল হিন্দুস্তান ব্যুরো: মুরগির ডিমের কুসুমের রং সাধারণত হলুদ বা কমলা রঙের হয়। কুসুমের রং …

আমফান দুর্যোগ কাটিয়ে ওঠার আগেই কালবৈশাখীর ধাক্কায় নাজেহাল কলকাতা সহ দক্ষিণবঙ্গ

চ্যানেল হিন্দুস্তান ব্যুরো। আমফান ঘূর্ণিঝড়ের (Amphan Cyclone Strom) বলিরেখা এখনও শহর কলকাতার ললাটে স্পষ্ট। তার …

আমফান পরবর্তী পশ্চিমবঙ্গ পঙ্গপালের প্রজননের সেরা ঠিকানা, বলছেন বিশেষজ্ঞরা

চ্যানেল হিন্দুস্তান ব্যুরো: ধেয়ে আসছে ১৭ কিমি দীর্ঘ পঙ্গপালের (Locust) দল। আর এর জেরে সতর্কতা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!