কিশোর ঘোষ:

আমাদের পাড়ার সেরা চায়ের দোকানটা রোগা অরুণদার। বাজার সেরে সেই অরুণদার দোকানে ঢুঁ মারতেই বুঝলাম ওর ভেতরে ভূত ঢুকেছে। সেই ভূতের রঙ অবধারিত লাল-হলুদ। কারণ অরুণদা কাস্টোমার বেছে বেছে ফ্রিতে চা খাওয়াচ্ছে। যে বলছে আজকের ম্যাচে ইস্টবেঙ্গল জিতবে তার জন্য এক কাপ চা ফ্রি।
দোকানে ঢুকতেই অরুণদা বলল, কে জিতবে—ইস্ট না মোহন?
আমি ইচ্ছে করে বললাম, মোহনবাগান।
অরুণদা চার অক্ষরের কাঁচা ঝাড়ল। বলল, দূর হ। রাগ সামলে কাচের গ্লাস কচলাতে কচলাতে বলল, তোর বাপ ঠাকুর্দা খান সেনার তাড়া খেয়ে এদেশে এল। আর তুই মোহনবাগান শব্দটা মুখে আনিস! লজ্জা করে না?
বেঞ্চের উপর পা তুলে বসে বললাম, বাজে বোকো না। বাবার জন্ম কলকাতায়। ঠাকুর্দা খুলনার লোক ছিল বটে। তুমি জানলে কী করে বল তো!
সব জানি। চায়ের দোকান দিয়েছি বলে কি মুখ্যু ভাবছিস!
না, মুখ্য ভাবছি না। আমরা এক পাড়ার লোক। আমার সম্পর্কে যেমন ও জানে, আমিও জানি ওর সম্পর্কে। পাগল ইস্টবেঙ্গল সাপোর্টার অরুণ বসুর সাফল্য জানি, ব্যর্থতা জানি, বিষাদ জানি। এমএ ফেল অরুণদার বাবা কারখানায় কাজ করত। হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকে মরে গেল। তারপর টিউশুনি, তারপর ছোট একটা চাকরি, তারপর বিয়ে। তারপর ওর মা মরল কেন যেন! তারপর ওর সুন্দরী বউকে নিয়ে পালাল রতন সামন্ত। তারপর অরুণদা চায়ের দোকান দিল।
জীবনের কাছে প্রচুর ক্যলান খেয়ে চায়ের দোকান দিয়ে যেন থিতু হল লোকটা। চোখের তলার কালি কমেছে কি! এক কামরার ভাড়ার বাড়ি থেকে চায়ের দোকান। ওর পৃথিবী। কিন্তু ইস্টবেঙ্গলের কথা উঠলেই পুরো রয়্যাল বাঘের বাচ্চা। সব দুঃখ ছুড়ে ফেলে দেয়, লাল-হলুদ গ্যালারির বাইরে। ইস্টবেঙ্গল গোল করলেই সবুজ ঘাস ভর্তি মাঠের মতো হাসি মুখ! কী জাদু আছে বাংলার ফুটবলে!
আমি বললাম, চা দেবে না?
কী মাছ কিনেছিস দেখি! বলে এগিয়ে এল অরুণদা। খুলে দেখল ব্যাগ। ইলিশ! একগাল হাসি। শাল্লা, তুই তো ইস্টবেঙ্গল। মিথ্যে বললি যে!
আমি হাসলাম।
অরুণদা বলল, দাম দিবি না। তোর চা আজ ফ্রি।
আমি বললাম, ওক্কে বস।
মনে মনে বলল, হে এমনি ঈশ্বর, হে ফুটবল ঈশ্বর, পারলে আজ ইস্টবেঙ্গলকে জিতিয়ে দাও। কারণ অরুণদার তো এ জীবনে আর জেতা হবে না!
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news