কিশোর ঘোষ
সময় সব বদলায়, এমনকী দুর্গাপুজোও। সেই বদলের চিত্র এক সময়ের বিখ্যাত গায়ক সনৎ সিংহ-এর কণ্ঠে ধরা আছে— ‘এক এক্কে এক/ দুই এক্কে দুই’ বলে শুরু হত প্রবল জনপ্রিয় সেই গান। প্রবীর মজুমদারের সুর ও রঞ্জিত দে-এর কথার প্রপার পার্টনারসিপ ছিল পুজোর আনন্দে উস্কানি দিতে ওস্তদ সে মাস্টার পিস-এ। তথাকথিত ছোটোদের গান হলেও বড়দেরও যে সে সঙ্গীত মন্দ লাগত না এ হলপ করে বলা যায়।
আকাশবাণী কলকাতার দাপটের দিনে, একচেটিয়া রেডিও আমলে, সে গানের দ্বিতীয় লাইনটাই এ লেখায় দরকারি বা আসল। কারণ গান সামান্য এগোতেই রঞ্জিতবাবু লিখেছিলেন—‘নামতা পড়ে ছেলেরা ওই পাঠাশালারই ঘরে’ এবং তারপর ‘কুমোর ঠাকুর গড়ে’ ইত্যাদি ইত্যাদি, এবং আরও অনেক কিছু। প্রকৃত ঘটনা হল এ থেকে একটা জিনিস ধরা যাচ্ছে যে, এই ইংলিশ মিডিয়াম আমলে পাঠশালা ব্যাপারটা কী? তাই এক বড় ‘কোশ্চেন’ (প্রশ্ন নয়, কোশ্চেন)। অপরপক্ষে কুমোর-এর জায়গায় যদি থাকত কুমোরটুলি তাহলেও খানিক বোঝানো যেত জেনারেশন ‘ফোর-জি’কে। কিন্তু তা নেই। থাকার কথাও না। কারণ যে গান যখন তৈরি হয়, তা তৈরি হয় সেই সময়ের সমাজচিত্রের উপর দাঁড়িয়ে। অতএব ১৯২৯ সালে জন্মানো প্রবীর মজুমদারের সুর দেওয়া এই মিষ্টি গানটি ২০১৫ সালে এসে কতকটা অচল। অনেকেরই হয়তো কড়াপাকের এই সত্যি শুনে দুঃখ হচ্ছে। মাফ করবেন। সত্যি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হয় দুঃখের বা অপ্রিয় হয়। অতএব ‘সত্যেরে লও সহজে’।
অবশ্য ‘দুর্গোপুজোর বদল’ মানে পুরোহিতের পুজো পদ্ধতির বদল না। কিংবা দশভূজা, বারোভূজা বা অষ্ট, মানে আটভূজা হয়ে গেছেন এমন কিছুও নয়। ওসব ঠিকই আছে। মা উমার বাপের বাড়ির চারদিনের ট্যুর-এ চোখে পড়ার মতো কোনও পরিবর্তন হয়নি। আগেও যেমন, এখনও তেমনি তিনি ও তাঁর চার সন্তান—লক্ষী, সরস্বতী, কার্তিক, গনেশ এবং কলাগাছ পুজীত হচ্ছেন। পাড়ায় পাড়ায় মায়ে ক্লাবে ক্লাবে। সঙ্গে মাসলম্যান মহিষাসুর। এমনকী সিংহ, ময়ূর, ইঁদুর, প্যাঁচা, হাঁস, সাপ— ওরাও, যেমনকার তেমন আছে। এবং সব মন্ডপের ঠাকুরের পেছনের মাথার দিকটায় যথারীতি আছেন দেবাদিদেব। যেটা বদলেছে তা হল পুজো কেন্দ্র করে বাঙালির আনন্দের আয়োজনের পদ্ধতিটি। অর্থাৎ প্যান্ডেল, লাইটিং, ঠাকুর তৈরির নানা ঘরাণা। আরও অনেক কিছু। সে সব বলব। কিন্তু তার আগে বলে ফেলে ভালো যে, সেই বদল বোঝার জন্য সুকুমারী ভট্টাচার্য, গৌরী ধর্মপাল কিংবা নৃসিংপ্রসাদ ভাদুড়ীর মতো পুরাণবিদ হওয়ার প্রয়োজন নেই। কথা হল মোটামুটি তিন দশক কাটিয়ে ফেলেছেন যাঁরা এ গ্রহের এই বাংলায়, মানে তিরিশের বেশি যাদের বয়স তারা এ বদলানোটা দেখেছেন। আর যাদের বয়স পঞ্চাশ, ষাট কী সত্তর উত্তীর্ণ হয়েও নট আউট, তারা দেখেছেন আরও আরও বেশি করে।
ফ্রম বাসন্তী টু অকালবোধন
দুর্গোপুজো কেন্দ্র করে প্রাথমিক বদলটা ঘটিয়ে ছিলেন শ্রীরামচন্দ্র। কারণ তাঁর হাতেই শুরু অকালবোধনের। অর্থাৎ কিনা বসন্তের ফাল্গুন থেকে এই যে শরৎ-এর আশ্বিনে সরে গেল বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব। তার উদ্বোধন করেছিলেন রামায়ণ খ্যাত দশরথ নন্দন। অবশ্য সে বাসন্তীপুজো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। আজও হয়। গোটা পশ্চিমবঙ্গ জুড়েই হয়। কিন্তু বাঙালি সমাজে দুর্গাপুজোর যে দাপট তা তার নেই। সে খানিক খাপছাড়া। শহর কলকাতাতেও কয়েক জোড়া বারোয়ারি বাসন্তীপুজো হয়। আজও। ব্যতিক্রম মেদিনিপুরের পাশকুরা-রাধামোহনপুর-বালিচক অঞ্চল। যে জায়গা দুর্গোপুজোর চেয়েও বারোয়ারি বাসন্তীপুজোর জন্য বিশেষ ভাবে খ্যাত। ইচ্ছে করলে আগামী বসন্ত ঢু মারতে পারেন। কিন্তু, এই যে বললাম ‘বারোয়ারি’ বাসন্তীপুজো। যে শব্দ (বারোয়ারি) দুর্গাপুজোর ক্ষেত্রেও বলা হয়— এই ‘বারোয়ারি’ শব্দটার মধ্যে লুকিয়ে আছে দুর্গাপুজোর এক ব্যাপক বাঁক বদল। প্রশ্ন হল, দুর্গাপুজো কী প্রথম থেকেই বারোয়ারি ছিল? আজকে যাকে বলি ‘সর্বজনীন’ মতান্তরে ‘সার্বজনীন’ দুর্গোৎসব, তাই তো বারোয়ারি। অর্থাৎ যে পুজোতে এলাকার সবার অধিকার ছিল সমান সমান। গরিব-বড়লোক, ব্রাহ্মণ-কায়স্থ-শুদ্র… সবার আনন্দ পার্বণ।
যুগান্তকারী বারো ইয়ার
ইতিহাস বলছে প্রথম থেকেই পজো বারোয়ারি ছিল না। এই আদি তথ্যের জন্য ঐতিহাসিক হওয়ার দরকার নেই। পুরনো উপন্যাস, গল্প পাঠ করলেই বুঝবেন। কিংবা তাও না পারলে দেখে নিন চার, পাঁচ কী ছয়ের দশকের বাছাই কিছু বাংলা ছবি। আর খেয়াল করুন সেখানে দুর্গাপুজো হচ্ছে প্রধানত জমিদারবাবুর প্রাসাদ-বাড়িতে। জমিদার-বাড়ি যদি নাও হয়, তবে যার বাড়িতে সে কালে মায়ের বোধন হচ্ছে তিনি নির্ঘাৎ এলাকার অন্যতম ধ্বনি বা ক্ষমতাবান কেউ-কেটা পুরুষ। সেই পুজোতে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ ছিল কতকটা অতিথীর মতো। এখন যেমন নিজের নিজের পাড়ার পুজোকে আমরা সকলেই ‘আমাদের পুজো’ বলি, তা বলার অধিকার ছিল না এইসব ক্ষেত্রে। বিশেষত গরিব ও নিম্নবর্ণের মানুষের জন্য ছিল না বঙ্গের শ্রেষ্ঠ উৎসবের মহানন্দযজ্ঞ। কিন্তু নদীয়া জেলার গুপ্তি পাড়ার এক কান্ড অমূল বদলে দিল চিত্রটা।
ঘটনা ১৭৯০-এর। তার আগের বছর অবধি কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলার জমিদার বা ‘কালীঘাটের পটের বাবুদের’ বাড়িতেই আটকে ছিল পুজো। কিন্তু নদীয়ার গুপ্তিপাড়ার জনা বারো গরিব ব্রাহ্মণ যুবক ঠিক করল তারাও দুর্গাপুজো করবে। তবে একটা ব্যাপার প্রথমেই ভেবে নিয়েছিলেন ওঁরা। সেই ঐতিহাসীক ভাবনা হল— তাঁদের দুর্গাপুজোতে থাকবে না জাতপাত, গরীব বড়লোকের ভেদাভেদ। নিজেরা ব্রাহ্মণ সন্তান হওয়া সত্বেও এতবড় যুগান্তর যে বারো বন্ধু এনেছিলেন তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ থাকা উচিত আজকের বাঙালির। প্রণাম জানানো উচতি তাঁদের। কারণ সেই শুরু বারোয়ারি দুর্গাপুজোর, ‘সর্বজনীন’ বা ‘সার্বজনীন’-এর। মাঝখানে বয়ে গেছে ২২৫ বছর। সত্যি বলতে আজকের থিম পুজোতে আমরা পৌঁছোতামই না, যদি না ওই বারো ইয়ার (বন্ধু) এত বড় কাণ্ডখানা ঘটাতেন। কিন্তু আজকের ‘থিম পুজো’র আগেও রয়ে গেছে আরেকটি পর্ব বা পর্বান্তর। বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসবে তাও এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন অবশ্যই।
প্রাক থিম পুজো, ছয়, সাত ও আটের দশক
সে পর্বের শুরু গত শতাব্দীর ছয় দশকের মাঝামাঝি থেকে। ১৭৯০তে যতোই প্রথম বারোয়ারি পুজো হোক। সেই পুজোর বাড়-বাড়ন্ত হতে যথেষ্ঠ সময় নিয়েছিল। কারণ তখনও কলকাতা, ঢাকা-সহ গোটা বঙ্গদেশে জমিদার-নায়েবরাজ চলছে দস্তুর মতো। তারা ঘটা করে নিজের নিজের নাটমন্দিরে দুর্গাপুজো করাতেই শুধু সন্তুষ্ট হওয়ার মতো ‘মানুষ’ ছিল না। পাশাপাশি ছোটলোকেরা মিলে দুর্গাপুজোর মতো ব্যয়বহুল বড় পার্বণ করবে এ তাদের সয্য হত না মোটেই। ফলে বারোয়ারি পুজো এগোচ্ছিল খানিক গুটি গুটি পায়ে। ভয়ে, ভিত চরণে। ১৯৪৭ সালটা এক্ষেত্রে বেজায় গুরুত্বপূর্ণ। কারণ স্বাধীন ভারতবর্ষ থেকে আসতে আসতে জমিদারি প্রথা মুছে যেতে থাকল ভারত সরকারের আইন মোতাবেক। নতুন সংবিধানে গোটা ভারতের এক ও একমাত্র জমিদার হয়ে উঠল রাষ্ট্র। অতএব দেশের স্বাধীনতা আনল বাংলার বারোয়ারি পুজোর দুরন্ত স্পিড। যা সাতের দশকে এসে বিরাটাকার ধারণ করল।
কিন্তু সে সময়ের পুজোর সঙ্গেও দু’হাজার সাল পরবর্তী দুর্গোৎসবের প্রচুর অমিল। হ্যাঁ, তখনও লোকে কলকাতার বড় পুজোতে লাইন দিয়ে ঠাকুর দেখত। মহম্মদ আলি পার্ক, বাগবাজার সার্বজনীন, দক্ষিণ কলকাতার বেশ কিছু পুজোতে ব্যাপক জনসমাগম হত সেকালেও। তবে সে সব পুজোর মূল আয়োজকেদের অনেকেই ছিল মার্কামারা ‘সমাজবিরোধী’। তারাই টাকা ঢালত। একেকটা ক্লাব চালাত সেই এলাকার বিখ্যাত বা কুখ্যাত দাদারা। পেছনে থাকত রাজনৈতিক পাওয়ার হাউজ। ফলে এলাকার অধিবাসীবৃন্দদের ততওখানি যোগদান থাকত না যেমনটা এখন আমরা দেখি। বরং এক পাড়ার লোক পাশের পাড়ার ঠাকুর দেখাতেই বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করত। তবে সবক্ষেত্রে ব্যাপারটা ঠিক না। এর ব্যতিক্রমও ছিল। পাশাপাশি মনে রাখতে হবে যে, ছয় ও সাতের দশক হল পশ্চিমবঙ্গের তীব্র রাজনৈতিক চাঞ্চলের সময়। জরুরি অবস্থা, নকশাল অন্দোলন, বামেদের ক্ষমতায় আসা ইত্যাদি ইত্যাদি নিয়ে একটা অস্থীরতার প্রলেপ গোটা বছর লেগেই থাকত। যার প্রভাব পড়েছিল দুর্গাপুজোতেও। কারণ দুর্গোপুজোর আয়োজকেরা বরাবর যুবক, নতুন প্রজন্ম। বয়স্করা বড়জোর পরামর্শদাতা। এদিকে সেই যুবকেরাই তো সেই অস্থীরতাই জোড়িয়ে পড়ছিল। ফলে ফাটাকেষ্টোর (ফাটাকেষ্টো নামটা টানলাম উদাহরণ হিসেবে। বোঝাতে। ফাটাকেষ্ট দুর্গাপুজো করত না। করত কালীপুজো। কলেজস্ট্রিট বাটা অঞ্চলের ‘মসিহা’ ছিল সে।) মতো লোকেরাই তৎকালীন বড় পুজোগুলোর হত্যা-কর্তা-বিধাতা হয়ে উঠেছিলেন। অবশ্য শারদৎসবের আনন্দে তাতে ভাটা পড়েনি একটুও। যাই হোক, এর ঠিক পরের পর্যায়ই হল ‘থিম পুজো’। যা নয়ের দশকের মাঝামাঝি থেকে ফুলে ফেঁপে উঠতে শুরু করে। আর এই চলতি ২০১৮তে সে কী আকার ধারণ করেছে সে আমরা সবাই জানি। জানতে বাধ্য!
শেষ পাতে থিম, স্পনসরড ইঁদুরের লেজ
এক গাদা সংবাদপত্র, আড়াইশো চ্যানেল, স্মার্টফোন, ইন্টারনেটের যুগে দুর্গোপুজো যেমন বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব, তেমনই এক কমার্সিয়াল কার্নিভাল। প্যান্ডেল, লাইট, প্রতিমা থেকে শুরু করে গনেশের বাহন ইঁদুরের লেজেরও আজ স্পনসর মেলে। আছে অসংখ্য প্রতিযোগীতা আর পুরস্কারের হাতছানি। ফলে লাখ লাখ নয় কোটি কোটি টাকা খরচ করছে খুঁটি পুজো থেকে শুরু করা মহিরুহ আয়োজকেরা।
সবকটি ক্লাব মিলিয়ে যার অর্ধেকের অর্ধেক খরচে কলকাতায় আরেকটা হাসপাতাল গড়া যায় হয়তোবা! যাতে করে শারদৎসবের আনন্দ অবধি বেঁচে থাকতে পারে এক গরীব বাঙালি ভূমিপুত্র।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news