পার্থসারথি পাণ্ডাঃ
আবাহনের সময় দুর্গা মৃন্ময়ী থেকে চিন্ময়ী হন, বিসর্জনের সময় চিন্ময়ী থেকে আবার মৃন্ময়ী হয়ে ওঠেন। তাই জলে ভেসে যায় দেবীর মাটির শরীর , ধুয়ে যায় সমস্ত রঙ, খুলে যায় সব সাজ, মাটির শরীর ফের জল ছুঁয়ে মাটিতে মিশে যায়। আর এরই মধ্য দিয়ে দেবী বলে যান, এই পৃথিবীর বুকে কোনকিছুই চিরন্তন নয়, এমনকি দেবীর শরীরও। সময়ে তা নির্মিত হয়, সময় ফুরোলে বিসর্জিত হয়। এ তো গেল দর্শনের কথা, এবার আসি দেবী দুর্গার পুজোয় বাঙালির অধ্যাত্মের সঙ্গে আবেগের মিলনের কথায়।
বাঙালির কাছে দুর্গা একই সঙ্গে দেবী, জননী ও কন্যা। আবাহনের সময় তিনি দেবী, পূজা – অঞ্জলির সময় জননী, আবার বিদায় বেলায় কন্যা। একই অঙ্গে তাঁর অনেক রূপ। আসলে উল্টোদিক থেকে দেখলে এ হল বাঙালির একই হৃদয়-আবেগের ভিন্ন ভিন্ন রূপ। তাঁরা কখনও পরম ভক্ত, অাবার কখনও বা আবেগপ্রবণ পিতামাতা। দেবীর পূজার শেষে বিদায়বেলায় তাই তাঁরা নিজের কন্যা বিদায়ের আবেগে ভেসে যেতে পারেন। যে-সব পুজোয় মেয়েদের যোগ বেশি, সেই সমস্ত দেবীরাই আমাদের ঘরের মানুষ হয়ে ওঠেন। ভাদু, টুসু, ইতু –এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এঁরা অবশ্য লৌকিক দেবী, সেখানে একা দুর্গা শাস্ত্রীয় দেবী হয়েও বাঙালির একান্নবর্তী পরিবারের একজন হয়ে উঠেছেন। তিনি ব্যতিক্রম। তবে, এই হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া চলেছে বহুবছর ধরে। পনের শতক জুড়ে যে বৈষ্ণবধর্মের জয়ধ্বজা উড়ে চলেছিল, সতের শতকে এসে তা শাক্তধর্মের বিপরীত বাতাসে দিশাহীন হয়ে উঠল। বৈষ্ণবধর্ম তন্ত্রের সহজিয়া অলিগলিতে পথ হারাল, অন্যদিকে তন্ত্রের বীরসাধনার পথ ছেড়ে শাক্তদের একটা বড় অংশ মাতৃসাধনার হাত ধরে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের আগ্রহে-আতিশয্যে বাঙালির আবেগকে জড়িয়ে নতুনভাবে শক্তিপূজার সূচনা করলেন। সাধন গান ও দেবীর বন্দনা গানে বাঙালি জীবনের সহজ আবেগ আর অনুষঙ্গ যোগ করে রামপ্রসাদ ও কমলাকান্তের মতো ভক্তকবিরা দেবীকে একই সঙ্গে বাঙালির চিরন্তন কন্যা ও জননীর হিসেবে গড়ে তোলার সূত্রপাত করেছিলেন। তারপর বিগত তিন’শ বছর ধরে বাঙালির বাৎসল্য আর আবেগর রসে জারিত হতে হতে দেবী ও মানবী সত্তা মিলেমিশে শক্তিরূপিনী দুর্গা একইসাথে আমাদের মা ও মেয়ে হয়ে উঠেছেন। তাই দেবীর আগমনে আমাদের মুখে হাসি ফোটে, বিদায়ে চোখে আসে জল।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news