দেবক বন্দ্যোপাধ্যায়:
গরু তো আপনারা চেনেন। গো-মাতার মাহাত্ম্য জানুন বা না জানুন, গরু আপনারা বিলক্ষণ চেনেন। তা চিনুন। তবে হয়েছে কী জানেন, দলীয় দফতরে বসে গবাক্ষের দিকে তাকিয়ে অধিকতর রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের দিবাস্বপ্ন দেখতে দেখতে নিত্য প্রবহমান রাজনীতির গবেষণাটা আর করা হয়নি আপনাদের।
সময় পাল্টে যাচ্ছে দ্রুত। এখন আর শুধু গরু আর গোদুগ্ধ চিনলে হচ্ছে না। এখন সাদা গরুর কালো দুধও চিনতে হবে আপনাকে। বাজারে এসে গেছে ডার্ক মিল্ক। ডার্ক মিল্ক চকলেট। বিজ্ঞাপন করছেন ঐশ্বর্য রাই। না। আপনারা এখনও যা ছেলেমানুষ রুপসী রাই কিছুতেই আপনাদের ওই চকলেটের ভাগ দেবেন না। তাঁর পদ্মের মতো চোখ দিয়ে মাথা থেকে পা পর্যন্ত একবার মোলায়েম করে দেখে নিয়ে বলবেন, ‘এই চকলেট পেতে গেলে তোমায় বড় হতে হবে যে!’
বড় তো হতেই হবে। রাজ্য বিজেপি তো এখন আর বড়বাজারে আটকে নেই। এমনকি লাঠি খেলার মধ্যেও নেই। দলে নতুন মানুষ আসছেন। তাঁরা মোদীকে দেখে আসছেন। তাঁরা বিশ্বাস করছেন, পারলে এই মানুষটি পারবে, না পারলে কেউ পারবে না। আসার পর সঙ্ঘ সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে পড়ছেন কিংবা পড়ছেন না, কিন্তু বিজেপির পোস্টার বয় এখনও তো সেই মোদীই। যাঁকে দেখে হাতে কলম নিয়ে দলে নাম লেখাতে বিজেপির দরজায় দাঁড়াচ্ছেন বহু মানুষ।
সমস্যা হচ্ছে যে রোগ এক সময় সিপিএমের ছিল এখন তৃণমূলের রয়েছে, সেই রোগই ধরেছে রাজ্য বিজেপিকে। রোগটা হল, অশিক্ষার অট্টহাস্য! সিপিএম ছিল দুটো, শিক্ষিত আর অশিক্ষিত, তৃণমূলও তাই। শেষ পর্যন্ত রাজ্য বিজেপিও। আর সব ক্ষেত্রেই একটি বিষয় কমন। তা হল শিক্ষিতরা কথা কম বলে কিংবা বলে না আর অশিক্ষিতরা বাজার মাত করে রাখে। আর একটা কথাও সত্য, দলমত নির্বিশেষে এই অশিক্ষিতদের জন্যই বরাদ্দ থাকে ক্ষমতার চেয়ার।
অশিক্ষিত শব্দটা শুনেই কিছু মনে করে বসবেন না যেন! আপনি স্নাতক না স্নাতকোত্তর, পিএইচডি না পোস্ট ডক, এইসবে তেমন কোনও আগ্রহ নেই কারও। শিক্ষিত হওয়ারও বটে, নেতা হওয়ার তো বটেই অন্যতম শর্ত হল পরমত সহিষ্ণুতা। বিয়োগ নয় রাজনীতিতে যোগের মূল্য বেশি।
মোদী-অমিতের যে বিজেপি, সেই বিজেপিকে এইসব নেতারা বুঝতে পারছেন কিনা, তা নিয়েই সন্দেহ রয়েছে। বাঙালির ভারতীয়করনের দরকার আছে, এ কথা ঠিক। অন্যথায় চিরকাল বাঙালি হয়েই থেকে যেতে হয়, কবির কথায় মানুষ হওয়া আর হয়ে ওঠে না। একই সঙ্গে বঙ্গে বিজেপির কিছুটা বঙ্গীয়করনও দরকার। বাঙালির সেন্টিমেন্ট বোঝা দরকার। নইলে বাঙালির সঙ্গে আত্মীকরণ হয়ে ওঠে না। মোদী এই রাজ্যে এসে তাঁর বক্তৃতায় শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের কথা বলেন। মা কালীর প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি জানেন, এঁরা বাঙালির জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে। এইসব বলে তিনি রাজ্য নেতাদের হয়তো বোঝাতেও চান তিনি বা তাঁরা কী চাইছেন। কেমন ভাবে চাইছেন। এ হেন ইঙ্গিত বোঝার আধার বঙ্গের এইসব নেতাদের আছে কি? থাকলে কতটা আছে, সেসব কথা মোদীর জানা আছে কিনা জানা নেই। সম্প্রতি যাদবপুরের ঘটনাতেও দেখা গেছে একজন ছাত্রী সম্পর্কে কী ধরনের মন্তব্য করছেন এঁরা! জানা গেছে সম্প্রতি কলকাতায় এসে অমিত শাহ স্পষ্ট বলে গিয়েছেন যে, পশ্চিমবঙ্গে তাঁরা ক্ষমতায় আসবেনই। তবে আজকে যাঁরা মঞ্চ আলো করে বসে আছেন বিজয়োৎসবে তাঁরা নেতৃত্বে থাকবেন কিনা সেই গ্যরান্টি অমিত শাহের কাছেও নেই। তবু বড় হচ্ছেন না এইসব নেতারা!
নোবেল লরিয়েট অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়কে যে ভাষায়, যে ভাবে, যে ভঙ্গিমায় আক্রমণ এঁরা করলেন, তাতে শুধুমাত্র অশিক্ষার উদগীরণ ছিল তাই নয়, ছিল নির্বোধ অশ্লীলতা। বাঙালি বিনায়কের সাফল্যে আপামর বাঙালি যখন আনন্দ খুঁজে নিচ্ছে তখন বিনায়কের বিরোধিতা করা যে রাজনৈতিকভাবে কতটা মুর্খামি তা ‘বড়বাজার’ আর ‘বুলেট’ কল্পনা করতে পারছেন কিনা বলা কঠিন।
এত কিছুর পরেও বিজেপিতে আশার আলো আছে। সঙ্ঘ ঘনিষ্ঠ লেখক রন্তিদেব সেনগুপ্ত এখন কার্যত বিজেপিতে। অমিত শাহের সাম্প্রতিক সভাতেও তিনি উপস্থিত ছিলেন, সভা পরবর্তী বৈঠকেও। রন্তিদেবকে বিজেপিতে সক্রিয় করা হয়েছে বা সক্রিয় করার প্রক্রিয়া চলছে বলা যেতে পারে। রন্তিদেব সেনগুপ্ত সোশ্যাল মিডিয়ায় অভিজিৎ বিনায়ককে অপমানের প্রতিবাদ জানিয়েছেন। বিজেপির মতো সংগঠিত দলের ক্ষেত্রে এটুকু বুঝতে অসুবিধা হয় না, রন্তিদেব নিজ দায়িত্বে এই প্রতিবাদ লিপিবদ্ধ করেননি। সঙ্ঘের বা দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সবুজ সংকেত ছাড়া তিনি দিলীপ ঘোষ ও রাহুল সিংহের প্রকাশ্যে সমালোচনা করবেন এমন ভাবার কোনও কারণ নেই।
যাদবপুর কাণ্ডে জনৈক ছাত্রীর প্রতি অশ্লীল ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করার জন্য তিনি নাম না করে দিলীপ ঘোষের কড়া সমালোচনা করেছিলেন। এবারও রাহুল সিংহের নাম না করেই কড়া ভাষায় বুঝিয়ে দিয়েছিলেন এমন বক্তব্য বিজেপির হতে পারে না।
তারপর মোদী-অভিজিতের সাক্ষাত ও মোদী কর্তৃক অভিজিতের ও অভিজিৎ কর্তৃক মোদীর ভূয়সী প্রশংসা বামেদের যেমন ঘরে ঢুকিয়ে দিয়েছে তেমন রাজ্য বিজেপির এই দুই নেতাকেও চুপ করিয়ে দিয়েছে। শুধুমাত্র রাজ্য বিজেপির এই দুজন কেন? দলের প্রাক্তন রাজ্যসভাপতি, বর্তমানে মেঘালয়ের রাজ্যপালও এই তালিকায় রয়েছেন। শোনা যায় তিনি মোদীর অপছন্দের তালিকায় আছেন। তাই জন্যেই নাকি ত্রিপুরা ছেড়ে ত্রিপুরার থেকেও ছোট রাজ্য মেঘালয়ের রাজ্যপাল হয়েছেন। যাইহোক, অশিক্ষার এই শাসন বিজেপির সর্বভারতীয় নেতৃত্ব কেমন ভাবে সামলাবেন তা তাদের বিষয়। তবে অমিত শাহ যতই বলুন এদের দিয়ে লাঙল চাষ করিয়ে ভাল ফসলের আশা করা দুরাশা মাত্র।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news