শাশ্বত কর :
দুটো ছবি এর মধ্যে তুমুল ভাইরাল! প্রথম ছবিটায় মেসি পেনাল্টি কিক নিচ্ছেন, আর ব্যাকগ্রাউন্ডে মহানায়ক, ‘ধন্যি মেয়ে’র সেই কলার ওঁচানো সংলাপ বলছেন—‘বগা বাইরে মার! পেনাল্টির গোল আমরা নিই না!’ আর দ্বিতীয় ছবিটা একটি আবেদনপত্রের। আর্জেন্টিনা সমর্থকদের ব্রাজিল সমর্থক কমিউনিটিতে প্রবেশের জন্য আবেদন! বলা বাহুল্য, বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার লাগাতার মুখ থুবড়ে পড়া নিয়েই এসব ট্রোলের বন্যা বইছে!
তবে কি না, এই সব বাদানুবাদ, ব্যঙ্গ বিদ্রুপ, নরম গরম কথা পরিষ্কার করে বলে যায়, যতই দিন বদলাক না কেন, যতই মাঠ ভরিয়ে ফ্ল্যাট হোক না কেন আজও কিন্তু সেই হাঁই হাঁই হাঁই হাঁই করে বলেই ফেলা যায়- ‘সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল!’
লোকাল ট্রেনের তুমুল ভিড়! ঘাড় এক দিকে পার্মানেন্টলি ফিক্সড! ডান হাত হাতল ধরতে আপ্রাণ চেষ্টা করেও শেষ অবধি দুটো বগলের পাশ দিয়ে কেবল তৃতীয় জনের বাহুতে বেষ্টিত, এমন অবস্থাতেও রোনাল্ডোর রসালো হ্যাট্রিক, মেসির ম্যাসাকার, মুসার মসমসে গোল, লুকাকুর লু, জার্মানির জাত- সব কিছু নিয়ে যাকে বলে একেবারে এক্সপার্ট ওপিনিয়ন। আর মধ্যে মধ্যে রসালো ফোড়ন! ঝাঁকানাকা তুলনা! পাবে বাঙালি পাবে!
কেবল লোকাল ট্রেন কে বলল, হাটে বাজারে ঘরে বাইরে এখন কেবল ফুটবল নিয়েই মাক্কামাক্কি! অফিস ক্লাবে, স্কুলের স্টাফরুমে তুমুল ফুটবল জ্বর! গলা পুরো সপ্তম পর্দায়, উত্তেজনায় চোখ লাল, মুখে কালবোশেখের জোলো ছাঁট! বলন ভঙ্গী দেখলে মনেই হতে পারে, এই বুঝি লেগে গেল তুমুল লড়াই! এমনটি মনে হলে বলতেই হবে দাদা, বাঙালিকে আপনি চেনেননি! কিচ্ছু হবে না। কেবল যুক্তি অপযুক্তি পরপর সেজে যাবে। জার্মান অনুরক্ত মেসির সাথে মুলারের তুলনা টানলেই তিতিবিরক্ত মেসিভক্ত যুক্তির পাশে পাশে ড্রিবল করতে করতেই মারাত্মক মারাত্মক সব তুলনার ফাইলের ফিতে খুলবেই! রে রে করে সেখান থেকে বেরিয়ে আসবে ফাউল কথাবার্তা—কোথায় চাঁদ আর কোথায় বিপ(সেন্সর্ড!) অথবা কোথায় আকাশের তারা আর কোথায় বিপ(সেন্সর্ড!)! এসব অনৈতিক আক্রমণে আরও সরগরম পরিবেশ! খানিক বাদেই গপ্প মগ্ন দুই বাঙালি চলবেন চা দোকানে! সেখানেও ছড়িয়ে যাবে গরম হাওয়া—এই তো নিয়ম কালিদা!
তবে কী দাঁড়াল? আমরা গুরু বদলাইনি। বদলে থাকতে পারে সমকাল, আমরা সেখানে খাপ খাইয়ে নিয়ে চর্চা চর্যা তরজা অব্যাহত রেখেছি। হ্যাঁ ধরণ হয় তো খানিক বদলেছে। সেতো বদলাবেই। এই তো বিশ্বকাপের উন্মাদনা নিয়ে কাল কথা কইছিলাম বন্ধু শৌভনিকের সাথে। সে ক্রমশ ফিরে যাচ্ছিল ছাতে বাঁশের খোঁচায় আন্টেনা ঘুরিয়ে ছবি ঠিক করার দিনে।
গোটা পাড়ায় হয় তো একটাই টিভি! অথবা একাধিক টিভি থাকলেও এক জায়গাতেই সব ভিড়। খাটে আর মাটিতে দুই বিপক্ষ শিবির। নিরপেক্ষ ফুট কাটুরেরা সব সাইড লাইনে বেঞ্চাসীন। কোনো দল হারছে। পরপর সুযোগ হারাচ্ছে। উত্তেজনা! উত্তেজনা! এমন সময় গোওওওল! খাটের উপর থেকে লুঙ্গি পরেই লাফিয়ে পড়লেন পঞ্চাশোর্দ্ধ পাঁচুবাবু, এক্কেবারে কেনারাম ঘোষের ঘাড়ে! ওফ! সেকি লাফ! প্যারাসুটের মত ফেঁপে উঠেছে লুঙ্গি! দুই হাত ঊর্ধ্বমুখী! ফুট কাটুয়ে কোনো ছেলে এই মোক্ষম সময়ে পাঁচুবাবুর কাছ থেকে আদায় করে নিলেন আগামীকালের পাঁঠার ঘুগনির খ্যাঁট!
তারপর? এতসব বলবেন আর প্রেমের কথা বলবেন না! হ্যাঁ প্রেম। ওতপ্রোত জড়িয়ে বস!। ঘুটঘুটিয়া রাত বিরেতে প্রেমিকার জানলায় গিয়ে টুকটুক করবার এমন মারকাটারি সুযোগ আর মেলে! দুটো খেলার মধ্যিখানে অথবা হাফটাইমের চুলচেরা বিশ্লেষণের ফাঁকে চলো মন বেন্দাবন! সাথে দরকার কেবল একটি সাইকেল আর অজন্তা হাওয়াই চপ্পল!
অবশ্য আর একটা মোক্ষম বিষয় আছে। সে হলো বিশ্বকাপ অণুপ্রাণিত পাড়া ফুটবল। সেও আবার নানান রকমের। টিম পাতিয়ে দমাদ্দম তো আছেই, তা ছাড়া ভেটেরান ভার্সাস জুনিয়ার টিম! কাকা জ্যাঠারা সব মাঠে! মজাই আলাদা! তারপর ধরুন, অমুক স্মৃতি শিল্ড তমুক টুর্নামেণ্ট তো আছেই! খেপ খেলুয়েদের রমরমা! পছন্দের দেশ এমনকি খেলোয়াড়ের নামে দলের নাম! মারাদোনা ফ্যানস ক্লাব বনাম লিলিপোতা হাটুরে পেলে একাদশ! শনি রবিবার সরগরম! কখনও আবার সেই সব সেভেন সাইড, নাইন সাইড দলে বিদেশিরাও এসে খেলেন! বিদেশি বলতে আফ্রিকান! যে দলে যত জন আফ্রিকান ফুটবলার, নির্ঘাত তার স্পনসরার তত সরস! চিনে বাদাম চিবুতে চিবুতে অথবা শালপাতা থেকে গরম ঘুগনির মটর গালে ফেলতে ফেলতে সেই খেলা দেখার যা চার্ম, তা কিন্তু বিশ্বকাপের থেকে কোনো অংশে কম নয়! একবার শিল্ডটা ঘরে এলেই হলো! ব্যস! তারপর?
তারপর চওড়া উনুনে রাবুণে কড়াইয়ে চব্বচোষ্যের মায়াময় ছ্যাঁক ছোঁক আওয়াজ! গলায় বাজবে—থ্রি চিয়ার্স ফর ‘দলের নাম’! হিপ হিপ হুররে! আর বক্সে বাজবে ‘সব খেলার সেরা…’! সেরাই তো বটে!
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news