কিশোর ঘোষ:
একদিকে কান ঝালাপালা, আরেক দিকে বাইরের মতোই ভেতরে বাজতে থাকে আনন্দ। কথা হচ্ছে ঢাকিদের নিয়ে। একজন ঢাকি না, অসংখ্য, গুনে শেষ করা যায় না শিয়ালদা স্টেশনে তৃতীয়া, চতুর্থী, পঞ্চমী, ষষ্টীতে ওঁরা কতজন ছড়িয়ে ছিটিয়ে বাজায়। মেন গেটের বাইরের খোলা অংশটা কদিন ওঁদেরই দখলে থাকে। যদি একশ জন, তবে তার আশি জনই বাজিয়ে চলে একসঙ্গে, এক সময়ে। ঢাক কাঁসরের সঙ্গে আছে তাসা পার্টি। চার কী পাঁচ জনের দল। গলা থেকে ঝুলছে তালবাদ্য। নাচতে নাচতে বোল তুলছেন নানা কায়দার। আপনি যদি খানিক দূরে থেকে ওই শত শত ঢাকের আওয়াজ শোনেন মনে হবে অলৌকিক কোরাস!
এ দৃশ্য আমরা অনেকেই কমবেশি দেখেছি, বলা ভালো— শুনেছি। বিশেষত যারা ডেলি প্যাসেঞ্জার। শিয়ালদা স্টেশন হয়েই যাঁদের কর্মস্থলে নিত্য যাতায়াত। কিন্তু একটা জিনিস কি খেয়াল করেছি? খেয়াল করেছি কি আনন্দের আড়ালে থাকা মরমি দুঃখের বাজনা!
হ্যাঁ, দুঃখ। দুঃখ না বলে দাঁত কামড়ানো জীবন সংগ্রাম বলতে পারেন। আসলে প্রত্যেকেই আপ্রাণ নিজেক প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যতক্ষণ কোনও পুজো কমিটির সঙ্গে বায়না পাকা হয়। যতক্ষণ না চার দিনের রোজগারে শহরের শিলমোহর লাগে। কিন্তু এত এত ঢাকির ভিড়ে কাকে বেছে নেবে কলকাতার কোনও এক পুজো কমিটি? শিয়ালদা স্টেশনে যে ঢাকিরা ভিড় করতে শুরু করেন মহালয়া পেরতেই, জেনে রাখুন তাঁদের সকলের কপালেই শিকে ছেঁড়ে না।
হয়তো অধিকাংশেরই স্থান হয় কোনও না কোনও পুজো প্যান্ডেলে। তথাপি বেশ কিছু ঢাকিকে দেশে ফিরতে হয় খালি হাতেই। তাঁদের হৃদয়ে নেমে আসে উটের গ্রীবার মতো অন্ধকার। অথচ নিজের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করেছিলেন ওঁরাও! যখন গোটা গ্রাম পুজোর আনন্দে মাতোয়ারা, তখন কিছু বাড়তি রোজগারের আশায় পরিবার পরিজন ছেঁড়ে দূর শহরে চলে এসেছিলেন এক কাপড়ে। সারা দিন ঢাক বাজানোর পর ফুটের হোটেলে ভাত-ডাল। রাতে প্লাটফর্মেই খবরে কাগজের বিছানা। ঘুম ভেঙে স্টেশনের শৌচালয়ে নিজেকে ধুয়ে মুছে ফের কাঁধে ঢাক ঝুলিয়ে লেগে পড়া। কাঁধ ব্যথায়, হাত যন্ত্রণায় আর সঙ্গ দিতে না চাইলেও বাজিয়ে চলা, বাজিয়েই চলা…। হয়তো তারপরেও হল না!
খালি হাতে ফিরতে জনৈক গরিব ঢাকিকে। যাঁদের অধিকাংশই বছর ভর দিনমজুর। পুজোর সময় জন্মসূত্রে বাপ দাদার কাছ থেকে শেখা তাল, লয়, সুর কাঁধে ঝুলিয়ে অনাত্মীয় নগরে আসা। হতভাগ্য ঢাকির ইচ্ছে পুরণ হল না তবু! এদিকে বাড়িতে যুবতী বউ। ডুরে শাড়ি নিয়ে ফেরার কথা ছিল যে। কথা ছিল কচি মেয়েটার জন্য ফ্রক, কোলের ছেলেটার জন্য গেঞ্জি প্যান্ট-জামা।
কিন্তু এবার পুজোয় কেন যেন মুখ তুলে চাইলেন না মা!
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news