পার্থসারথি পাণ্ডা
চার বেদে দেবী কালিকার কোনও উল্লেখ নেই, তাই তিনি বৈদিক দেবী নন। প্রাচীন বেদ, ঋকবেদের রাত্রিসূক্তে রাত্রিদেবীর কথা আছে, ইনি ঘোর কৃষ্ণবর্ণা ভয়ঙ্করী—ইনি রাত্রির দেবী, বর্ণ-লক্ষণ ছাড়া দেবী কালিকার সঙ্গে তাঁর কোনও মিল নেই। তাই তাঁকে দেবী কালিকার আদিরূপ হিসেবে কল্পনা করা নেহাতই কষ্টকল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়। উপনিষদের যুগে এসেও দেবী কালিকার কোন প্রসঙ্গ আমরা পেলাম না। এই যুগে নারীর মর্যাদা এবং নারীশক্তি বিদ্যা ও চর্চার মধ্য দিয়ে পুরুষের সমকক্ষ ছিল। নারীশক্তির দুর্দান্ত প্রতীক কালিকা, তাঁর উপাসনা সেকালে হয়ে থাকলে তার উল্লেখ নিশ্চয়ই তখনকার সাহিত্যে থাকত। সেটা যখন নেই, ভাবাই যায় যে, তখনও দেবী কালিকার রূপকল্পনা গড়ে ওঠেনি। আসলে আমাদের প্রতিটি দেবতারই তো জন্ম হয়েছে যুগের প্রয়োজনে, ভয়ভীত ভক্তের মনে। এই সময়ের গ্রন্থ ‘শতপথ ব্রাহ্মণে’ দুই কৃষ্ণবর্ণা দেবীর উল্লেখ আছে ‘কৃষ্ণা’ ও ‘ঘোরা’। তাঁদের অস্ত্র ‘পাশ’। কিন্তু এই দেবীকেও কালিকা বলা যায় না। তবে, ‘মুন্ডক উপনিষদে’ প্রথম ‘কালী’ শব্দের উল্লেখ পাওয়া যায়—‘কালী করালী চ মনোজবা চ’ শ্লোকে। যদিও শব্দটি যজ্ঞের আগুনের সাতটি জিহ্বার একটি বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে, দেবী ‘কালিকা’ অর্থে নয়।

আর্য সংস্কৃতির ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় যে, সে আদিম অধিবাসীদের কাছ থেকে অনেক কিছুই ছিনিয়ে নিয়েছে, দেবতা থেকে শুরু করে উপাসনার সংস্কৃতিও। সেই ছলেবলে ছিনিয়ে নেওয়ার পরিচিত উদাহরণ আছে জগন্নাথ কাহিনীতে। শবর সমাজের দেবতা নীলমাধব এভাবেই জগন্নাথ নামে অধিষ্ঠিত হয়েছেন আর্যমণ্ডলীতে। দেবী কালিকার জন্ম ইতিহাসেও এরকমই এক ঐতিহ্য লুকিয়ে আছে। খ্রিস্টীয় সপ্তম ও অষ্টম শতকের গ্রন্থাবলীতে এর উল্লেখ আছে। গ্রন্থগুলি হল, বাণভট্টের ‘কাদম্বরী’, বাকপতিরাজের ‘গৌড়বহো’ এবং ভবভূতির ‘মালতীমাধব’ প্রভৃতি। সেখানে দেবী শবরপূজিতা, পর্ণপত্র তাঁর আবরণ ও আভরণ, তিনি রক্তলোলুপা এবং নরমাংস লোভী। ইনি কৃষ্ণবর্ণা এবং শ্মশানে এঁর অবস্থান। এই সময়কালটিতেই বৌদ্ধধর্মের একটা বড় অংশ সহজ মোক্ষপথ ছেড়ে বেছে নিয়েছিল সহজিয়া তন্ত্রপথ। গুহ্য যৌনতার মধ্য দিয়ে বীরসাধনাকে অবলম্বণ করে মোক্ষ খোঁজার উদ্দেশ্যমূলক এ এক জটিল পথ। সেই পথে তাদের উপাস্য ‘তারা’ ও ‘একজটা’ নামের দেবী। এই দুই দেবীই ঘোরবর্ণা, ভীষণদর্শনা। দীর্ঘ সময় ধরে বৌদ্ধধর্মের চাপে হিন্দুধর্ম একেবারে কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল, কিন্তু এই সময়কালে তন্ত্রপথে বৌদ্ধধর্মের এই অবক্ষয়ের সুযোগ নিয়ে হিন্দুধর্ম আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে গিয়ে গুহ্য যৌনতার আকর্ষণে বৌদ্ধতন্ত্রের বীরসাধনাকেই আপন করে নিলেন এক শ্রেণির হিন্দু উপাসক। সেইসঙ্গে আপন করে নিলেন রক্তপাতে দেবীকে তুষ্ট করার সহজ শবরপন্থা। শবরপূজিতা রক্তলোলুপা শ্মশানবাসিনী দেবী ও বৌদ্ধতন্ত্রের দেবী ‘তারা’-‘একজটা’ মিলেমিশে তাঁদের হাতেই জন্ম হল দেবী কালীর। উপাসকদের ধ্যানকল্পনায় গড়ে উঠল তাঁর নানান রূপ। পরবর্তীকালে পুরাণগ্রন্থগুলির মধ্যে সংযোজিত হল কালীকাহিনি। মহাভারতে তাঁর কথা প্রক্ষিপ্ত হল। মার্কণ্ডেয় পুরাণে সংযোজিত হল, দেবী দুর্গা চণ্ড নামক অসুরকে বধ করতে অসমর্থ হয়ে যখন রাগে কৃষ্ণবর্ণা হয়ে উঠলেন, তখনই তাঁর কপাল থেকে আবির্ভূত হলেন উগ্রা দেবী কালিকা। তিনিই সেই দুর্বধ্য চণ্ড অসুরকে বধ করলেন, রক্তবীজের রক্ত পান করে তাকে হত্যা করলেন। এখান থেকেই তিনি হয়ে উঠলেন দেবী দুর্গারই আর এক রূপ। পুরাণকারেরা কল্পনা করলেন কালীই মহাদেবের প্রথম পত্নী, কালো রঙের জন্য গঞ্জনা শুনতে শুনতে তিনি অতিষ্ঠ হয়ে তপস্যার মাধ্যমে গৌরবর্ণা রূপে জন্ম নেন হিমালয়ের ঘরে, তখন তাঁর নাম হয় গৌরী। এই রূপেই তিনি শিবকে আবার বিয়ে করেন।

বঙ্গদেশে এই নবদেবীর পূজা শুরু হয় ‘কালিকা বা কালী’ নামে। তের থেকে চৌদ্দ শতকের মধ্যে পুরাণে তাঁর স্থান হয়ে গেছে, এমনকি তন্ত্রের পুথিতে তাঁর পূজাপদ্ধতিও লেখা হয়ে গেছে। কিন্তু তান্ত্রিক শ্রেণির বাইরে, তখনও পূজার প্রসার ঘটেনি কালিকার। চৈতন্য সমসময়ে কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ দেবী কালিকার মাটির মূর্তি নির্মাণ করলেন প্রথম এবং তিনিই প্রথম সহজ পন্থায় কালীপূজার প্রবর্তক। কিন্তু তাঁর সময়ে বৈষ্ণব প্রভাবে চৈতন্যদেবের ভাবময় ভক্তি আন্দোলনে বাংলা এতটাই ভেসে গিয়েছিল যে, শাক্তরা কূল পাননি। দুশো বছরের মধ্যে বৈষ্ণবদের একটা বড় অংশ যখন সহজিয়া হয়ে গেলেন বৌদ্ধ তান্ত্রিকদের মতো, তখন মাথা চাড়া দিয়ে উঠল শাক্তসাধনা। এই সময়ই কাশীনাথ নামের এক শাক্তসাধক সার্বজনীন কালীপূজার সপক্ষে জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা করলেন। এবং মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র দেবী কালিকার গার্হস্থ্য মতে পূজার প্রসার ঘটালেন, বলা যায়, প্রজাদের ওপর জোর করে চাপিয়ে দিলেন। কয়েক বছরের মধ্যে সেই চাপানো পুজোই স্বতঃস্ফূর্তভাবে গৃহীত হয়ে গেল সমাজের দরবারে। গৃহীসাধক রামপ্রসাদকে দিয়ে আঠেরো শতকে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র ‘কালিকা মঙ্গল’ লিখিয়ে নিলেন, এটিই বাংলায় প্রথম কালীকাহিনি।

এই সময়কালেই সাধক রামপ্রসাদ, কমলাকান্তের হাতে বাংলা ভাষায় রচিত হল শ্যামামায়ের সাধন গান শ্যামাসঙ্গীত। সেই গানের মধ্য দিয়ে তাঁরা যেমন হৃদয়ের ভক্তি-আকুতি উজাড় করে দিলেন, তেমনি গৌরীর মতো কালীর সঙ্গেও মা ও মেয়ের সম্পর্ক তৈরি করে ফেললেন। বাঙালির হৃদয়ে ও সংসারে মা কালিকার আসন তৈরির কৃতিত্ব কিন্তু এঁদেরই। তাঁদের জন্যই দেবী কালিকার পূজা বাঙালির সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে এমন অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে যেতে পেরেছে।
দেব-দেবীর উদ্ভব ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস আলোচনা করলে দেখা যায় যে, যেসব দেবতা আমাদের প্রাত্যহিক সংসারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ঘরের মানুষের মতো হয়ে উঠতে পেরেছেন, তাঁরাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমাদের নিত্যপূজনীয় হয়ে উঠেছেন। এঁদের মধ্যে রয়েছেন শিব, কালী, দুর্গা, লক্ষ্মী, বিষ্ণু, গণেশ, সরস্বতীর মতো দেবদেবীরা। আবার যারা যুক্ত হতে পারেননি, যেমন—ব্রহ্মা, ইন্দ্র, বরুণ, পবন, অগ্নি প্রভৃতি বৈদিক দেবতারা বৈদিক যুগে জনপ্রিয় থাকলেও একালে এসে তাঁদের জনপ্রিয়তা বজায় রাখতে পারেননি, নিত্যপূজনীয় হয়ে উঠতেও পারেননি। একমাত্র যজ্ঞস্থল ছাড়া অন্যত্র তাঁদের উল্লেখ খুব একটা পাওয়া যায় না। সেখানে অনেক পরবর্তীকালে তন্ত্রসাধনার ধারা থেকে উঠে এসেও দেবী কালী কিন্তু বাঙালির আপন হয়ে উঠেছেন মাতৃরূপিণী হয়ে মাতৃসাধকদের পথ বেয়ে।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news