অহর্ষি সরকার:
দেবের বই– শব্দ দুটি বাঙালির কাছে ফিরেছে অদ্ভুত দ্বৈততা নিয়ে। বিশেষত এই বইমেলার মরশুমে।
এমনিতে এলিট বাঙালির একটা অংশ বিলকুল জানেন, সিনেমা আজও বহু মানুষের কাছে ‘বই’। সাহিত্য নির্ভরতা থেকে সিনেমার যে ডাকের সূচনা, তাই-ই যেন এখন সিনেমার গলার কাঁটা। বহু চেষ্টাতেও তা অনপনেয়। একসময় অবশ্য সিনেমাকে শিল্প হিসেবে মেনে নিতে তাত্ত্বিকদেরও কিছু সমস্যা ছিল। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে এমন কয়েকজন মানুষ এ পৃথিবীতে এসেছেন, সিনেমাকে ভালোবেসেছেন, সিনেমা নির্মাণ করেছেন ও স্বতন্ত্র সিনেভাষা তৈরি করেছেন, যাতে সিনেমা জাতে উঠেছে বলা যায়। সিনেমা এখন শিল্পই। কিন্তু তা আর পাঁচটা শিল্পের মতো নয়। কারণ সিনে-শিল্পের ভবিতব্য বাঁধা জনতার হাতে। এইখান থেকেই যাবতীয় বিরোধাভাষের সূত্রপাত। এক শ্রেণির বাঙালির কাছে সিনেমা-শিল্প তার উচ্চতা, বক্তব্য, আঙ্গিক, রাজনীতি নিয়ে গৌরবের আসনে, অপর এক শ্রেণির কাছে তা নেহাতই বিনোদনের এবং ‘বই’। সিনে-ইন্ডাস্ট্রিও এ প্রশ্নে আড়াআড়ি বিভক্ত। সে দ্বন্দ্বের নিরসন হেতু এই লেখা নয়, কিন্তু বলার এই যে, এই দ্বন্দ্বের ভিতরই এবার অন্তর্ঘাত হয়ে ঢুকে পড়েছে ‘দেবের বই’।
বইমেলা বিশুদ্ধ এলিট বাঙালির। সেখানে দেব ভক্তদের ভূমিকা নিয়ে পাকা চুল-মোটা চশমার ফ্রেম সন্দিহান হবে তা বলা বাহুল্য। হ্যাঁ, দেবের ফ্যানরা মেলায় আসতে পারেন, তাতে মানা নেই, আর ঢোকার জন্য টিকিটও নেই। কিন্তু দেবের যাঁরা ‘বই’ দেখেন তাঁরা গ্রাম-গঞ্জ-মফস্বলে হাতে চাঁদ পান, সে ‘বই’ প্রদর্শনের জায়গা তো বইমেলা নয়। কিন্তু এরই মধ্যে এক প্রকাশনা সংস্থা দেবকে নিয়েই একটি বইপ্রকাশ করেছেন। ফলত দেবের ‘বই’ দেখা মন্ত্রমুগ্ধের দল দলে দলে এসে বইমেলায় ভিড় জমিয়েছেন। প্রশ্ন করছেন, দেবের বই আছে? ঠিক এই খানটাতেই বাঙালির চেনা বিভাজনের স্বরচিত সমীকরণটি ঘেঁটে যায়। এলিট আর পপুলারের এই দ্বান্দ্বিক বেড়াটি প্রায় হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ল, যখন বইমেলায় এলেন সমসাময়িক বাংলা সিনেমার জনপ্রিয় অভিনেতা, (মতান্তরে হিরো) দেব স্বয়ং। সৃষ্টিসুখ প্রকাশনার স্টলে এলেন নায়ক। যেখান থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁকে নিয়ে লেখা শর্মিলা মাইতির বই ‘দীপক টু দেব’–– সেই বইটির উদ্বোধনে। এই প্রতিবেদক একটু দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন, শুধু দেবের নামেই ভিড়ে ভিড়াক্কার স্টল সংলগ্ন গোটা এলাকা। তখনও ‘দেব-তা’ আসেননি। এরপর যখন সুপারস্টার সত্যি এলেন, তখন সেই ভিড় ‘পাগল’ হয়ে উঠল!

অনেকেই বলবেন, জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বকে দেখতে ভিড় হবে এ নিয়ে আলাদা করে বলার কী আছে! নাহ, সত্যিই তা নেই। কিন্তু বলার যা, ওই জনতার ভিড়েই হাতে হাতে ঘুরছিল নীল-হলদে রঙা বইখানাও! এই প্রতিবেদকের মনে হয়েছিল, এ বড় মজার উপাখ্যান। যাঁরা দেবের ‘বই’ দেখেন, তাঁরা দেবের বইও পড়েন! অথচ এক শ্রেণির বাঙালি কী অবলীলায় এহেন দাগ টেনে দেন— দেব মানেই নিচুস্তরের আলোচনা। এলিট ও শিক্ষিত বাঙালি সেখানে হাত ছোঁয়ান না। অন্তত সোশ্যাল মিডিয়ায় দেবকে নিয়ে যে পরিমাণ রসিকতা হয়, আর তাঁর সিনেমা নিয়ে যেভাবে সমালোচনা করে কেউ কেউ জাতে ওঠার চেষ্টায় থাকেন, তাতে মনে হয় ‘আমি দেবকে দেখতে পারি না’ গোছের স্ট্যাটাসই অনেক ক্ষেত্রে এলিটত্বের উপবীত হয়ে দাঁড়ায়। এদিকে দেবের এই ফ্যান, এই কৌতূহলী জনতা তাঁরা কিন্তু এই বিভাজনের তোয়াক্কাই করলেন না। তাঁরা দেবের ছবিও দেখেন, তাঁকে নিয়ে বই পড়তেও আগ্রহী। দেব নিজেও হয়তো এরকম একটা বইয়ের উদ্বোধনে না এলেই পারতেন। কিন্তু তিনি এসে যেন প্রমাণ করে দিলেন, কাচের দেওয়ালগুলো ভাঙাই তার নেশা। দেব চলে যাওয়ার পর ভিড় যখন ফিকে হচ্ছে, তখন দেখা গেল এক অপূর্ব দৃশ্য! দেবের অটোগ্রাফ পেলেন না বলে দুই তরুণী অঝোরে কাঁদছেন। আর কর্তৃপক্ষ তাঁদের শান্ত করার চেষ্টা করছেন। সাংবাদিকতার কৌতূহলেই জানতে চাই, কোথা থেকে এসেছেন? চোখের জল মুছে তরুণী জবাব দেন, “বহরমপুর থেকে। শুধু এই বইটা কিনব আর দেবের সই নেব বলেই এসেছিলাম।”
কেন দেবের বই, এ নিয়ে তর্ক চলতে পারে। দেবের বই থেকে সত্যিই বাঙালির কিছু পাওয়ার আছে কি না, তা নিয়েও আলোচনা হতে পারে। তবে সত্যি বলতে কী, ওই মিনিট সাত বা দশের জন্য বাঙালির সমস্ত দোলাচল, স্বরচিত বিভাজনের মায়জাল্গুলো মুছে গিয়েছিল। তত্ত্ব আর তাত্ত্বিক আলোচনার যেমন কোনও শেষ নেই, তেমনই চোখের জলেরও কোনও তাত্ত্বিক ব্যাখা হয় না যে। এ আসলে সেই বিশুদ্ধ ভালোবাসা, যা অর্জন করতে হয়। দেব পেরেছেন বলেই তিনি দেব। তাই হয়তো তাঁকে নিয়ে একটি বই প্রকাশ মাত্র তাকে সাদরে বরণ করে নিয়েছেন তাঁর ‘বই’ ভক্তরা। এখানেই দ্বৈততার অবসান, অথবা নতুন দোলাচলের সূত্রপাত। তা গায়ে মেখেই দেখি এগিয়ে চলেছে বইমেলা, এগিয়ে চলেছে বহরমপুরের তরুণীটি, যার চোখের কোণে এখনও টলমল করছে একফোঁটা ভালোবাসা। শিক্ষিত বাঙালির বইমেলাও যাকে উপেক্ষা করতে পারে না।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news