দেবপ্রসাদ রায় ।

অজয় মুখার্জী কংগ্রেস থেকে বহিষ্কৃত হয়ে বাংলা কংগ্রেস গড়লেন। তাঁর নেতৃত্বেই এ রাজ্যে প্রথম ‘৬৭ তে অকংগ্রেসী মন্ত্রীসভা। দল গড়তে পুরনো সহকর্মীদের পাশে চেয়েছিলেন। সেই প্রক্রিয়ায় বীরভূমের স্বাধীনতা সংগ্রামী দীর্ঘদিনের সাথী কামদা মুখার্জীকে সক্রিয় হতে অনুরোধ জানালে বয়স জনিত কারনে তিনি অক্ষমতা প্রকাশ করে বলেছিলেন, চাইলে আমার ছেলে প্রণবকে নিতে পারো, ও যদিও রাজনীতিতে নেই, কিন্তু সুযোগ পেলে যোগ্য সহযোগী হয়ে উঠবে বলে আমার ধারনা।
এই ভাবেই শুরু। প্রথম দিকে মূলত লেখালেখির কাজেই বেশী সময় দিতে হতো। তার ভেতরেই রাজনৈতিক বিষয় গুলির বিশ্লেষন। সেই বিশ্লেষণের পরিপ্রেক্ষিতে দলের কর্তব্য তুলে ধরা। এবং এই কাজে তাঁর কূশলতায় অজয় বাবুর বন্ধুপুত্রের যোগ্যতা সম্পর্কে সম্যক ধারনা তৈরি হয়ে যায়। ১৯৬৯ সালে বাংলা কংগ্রেসের মনোনয়নে প্রনব মুখার্জীকে (Pranab Mukherjee) রাজ্যসভায় সভায় প্রেরন করা হয়। প্রনবদার মুখেই শুনেছি,১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তি যুূ্দ্ধে শ্রীমতি ইন্দিরা গাঁধির অসামান্য ভূৃমিকার তিনি প্রশংসা করেন। রাজ্যসভায় তখন ইন্দিরা উপস্থিত। বক্তৃতা শুনে ইন্দিরাজী প্রভাবিত হয়ে প্রণবদাকে সংসদের পি,এম,অফিসে ডেকে পাঠান এবং কংগ্রেসে যোগ দিতে উৎসাহিত করেন।

আমি প্রণবদাকে প্রথম দেখেছি ১৯৭৪ সালে।কেন্দ্র থেকে এরাজ্যের জন্য এফ সি আই-এর চালের বরাদ্দ বৃদ্ধি করবার আবেদন নিয়ে প্রিয়দার পরামর্শে যুব কংগ্রেসের এক প্রতিনিধি দলের সঙ্গে যখন দিল্লী যাই, কেন্দ্রীয় খাদ্যমন্ত্রী ফকরুদ্দিন আলি আহমেদ কে দেওয়ার জন্য আমাদের স্মারক লিপিটি প্রণবদাই লিখে দিয়েছিলেন। তিনি তখন কেন্দ্রীয় সরকারের বাণিজ্যদপ্তরের প্রতিমন্ত্রী।সঞ্জয় গাঁধীর ঘনিষ্ঠ ছিলেন। ‘৭৭ এর নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর তাবড় তাবড় নেতারা যখন ইন্দিরাজীকে পরিত্যাগ করে দূরে সরে গেছেন, এ রাজ্যে প্রণব দা সেই দূঃসময়ে শুধু ইন্দিরাজীর পাশে থাকেন নি, সিদ্ধার্থ শংকর রায়, দেবী প্রসাদ চ্যাটার্জীর মত শাহ- কমিশনে দাঁড়িয়ে ইন্দিরাজীকে দোষারোপ না করে শাহ- কমিশনের এক্তিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়ে তাঁর নেত্রীর প্রতি আনুগত্যের পাশাপাশি রাজনৈতিক সাহস ও দৃঢ়তার পরীক্ষাতেও নজির সৃষ্টি করেছিলেন।আমার সৌভাগ্য, সেই দিন গুলিতে সোমেনদা ও বীরেনদা (মোহান্তি) সহ প্রণবদার পাশে দাঁড়াবার সুযোগ পেয়েছিলাম। ৭৭ এ ব্রহ্মানন্দ রেড্ডী যুব কংগ্রেস অবৈধ ঘোষনা করে দিলে, সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে প্রনবদা দিল্লী থেকে খবর পাঠালেন, ইন্দিরা অনুগামীরা পাল্টা সংগঠন গঠন করে, যুব ফোরাম নামে রাজ্যে রাজ্যে সক্রিয় হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তোরা চলে আয়। আমরা তিন জন গেলাম। সোমেন দা রাজ্য সভাপতি আর আমি জাতীয় স্তরে অন্যতম সাধারন সম্পাদকের দায়িত্ব পেলাম। সেই যুব ফোরামই দলের বিভাজনের পর যুব কংগ্রেস হিসেবে পরিচিত হল।

৭৮ এ অসম নাগাল্যান্ড সীমান্তে সংঘর্ষের ফলে বহু মানুষ যখন ঘর ছাড়া হয়ে বনে জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছে, নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটি থেকে প্রনবদা সেই উপদ্রুত এলাকা দেখতে গেলেন, সঙ্গী আমি। তখন অসমে কংগ্রেস সরকারে নেই। রাজ্যসভার সদস্য হিসেবে সরকারী গেষ্ট হাউস গুলোতে প্রণবদার জন্য নির্দিষ্ট ঘরে আমি তাঁর সঙ্গেই থাকছি।একদিন,দু দিন নয়, সাত-সাতটি দিন। ফলে তাঁর রাজনৈতিক জ্ঞানের গভীরতা ও বিষ্ময়কর স্মৃতিশক্তির পরিচয় সে সময়েই আমাকে তাত্ত্বিক প্রনব মুখার্জীকে চিনতে সাহায্য করেছিল।

আমার রাজনৈতিক জীবনের কতগুলি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে প্রণবদার অবদান ভূলবার নয়। ৮৪ সালে একদিন বললেন, তোর ভোটার লিষ্টে নাম ঠিক আছে তো! আমি বললাম থাকা তো উচিত, ৮২ তে বিধান সভা লড়েছি। প্রণবদা বল্লেন,তবু দেখে রাখ।দেখতে গিয়ে জলপাইগুড়ি ভোটার লিষ্টে নাম না দেখতে পেয়ে কোলকাতায় এসে নাম তুলেছিলাম বলে রাজ্যসভায় যেতে পেরেছিলাম। ২০০৬ এ বিধান সভার প্রার্থী হওয়া আমার কাছে ঘুরে দাঁড়াবার লড়াই ছিল।জেলা কংগ্রেস, প্রদেশ কংগ্রেস-কেউই চায়নি, আমি প্রার্থী হই। প্রণবদা দৃঢ় ভাবে এই আপত্তি উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, হারুক,জিতুক, মিঠু নিজের শহর থেকে বিধান সভার প্রার্থী হতে চাইলে না বলার কোনও অবকাশ নেই। ও ই লড়বে।আলিপুরদুয়ার নিয়েও একই ঘটনার পূনরাবৃত্তি হয়েছে। নানা বাধা সত্বেও প্রণবদা শুধু আমার মনোনয়ন নিশ্চিত করেন নি।ঝড়জল উপেক্ষা করে আলিপুর দুয়ারে এসে সভা করে আমার জয়ের পথ প্রশস্ত করে দিয়ে গিয়েছিলেন। বছর চারেক আগে জলপাইগুড়ির পুর সভার জনপ্রিয় চেয়ারম্যান দীপক দা (ভৌমিক) একদিন সকালবেলা ফোন করে উত্তেজিত হয়ে বললেন, মিঠু, প্রণববাবুর বইয়ের (দি ড্রামাটিক ডিকেড) ১৩১ পাতায় তোমার কথা লিখেছে।আমি শুনে অভিভূত।যে মানুষটি আজ দেশের রাষ্ট্রপতি, সে তাঁর আত্মজীবনী লিখতে গিয়ে আমায় মনে রেখেছে, এতো আমার পরম প্রাপ্তি !


Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news