“যতক্ষণ শ্বাস রয়েছে, ততক্ষণই আশ
এই আসে তো এই চলে যায় ঈশ্বরে বিশ্বাস।”
জয় গোস্বামী
………………..
দেবক বন্দ্যোপাধ্যায়
কয়েকদিন আগে যা মনে হচ্ছিল, এখন ঠিক তা মনে হচ্ছে না। আবার কয়েকদিন পরে, এখন যা মনে হচ্ছে তা মনে হবে কিনা বলা যাচ্ছে না।
কয়েকদিন আগে মনে হচ্ছিল মানুষ যে ভাবে নিয়ম না মেনে, সামাজিক দুরত্বের বিধানকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে, তাতে ভাষণ নয়, করজোড়ে নিবেদন নয় বরং শাসন দরকার। দরকার লাঠি। তেমনটা হল বটে। কিন্তু ঠিক যেমনটা হবার কথা তেমনটা হল না। পুলিশ লাঠি চালালে, তার লাঠি চালানোর মধ্যে একটা প্রশিক্ষণের ছাপ থাকে। প্রথম প্রথম হচ্ছিলও তাই। কাল হল পুলিশের হাতের লাঠি কোনও কোনও ক্ষেত্রে তুলে নিল সিভিক পুলিশ। ফলে প্রহারটা আর শাসন হল না, প্রশাসনিক দমনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রইল না। বরং মাস্তানিতে পর্যবসিত হল। পরিণত হল হাতের সুখ করে নেবার সুযোগে। ফলে সমালোচনা হল।
আরও যে কয়েকটি কারনে সমালোচনা হল, তার একটি হচ্ছে পুলিশ মুড়ি মিছরি একদর করে ফেলল। কে প্রয়োজনে বেরিয়েছে আর কে নিতান্ত ছেলেখেলা করতে, উন্মত্ত লাঠি সে বিচার করতে পারল না।
এক্ষুনি যারা অস্ফুটে বলছেন, বিচার করে লাঠি চালানো সম্ভব নয়। তাঁদের বলি, সম্ভব। রেলের টিকিট পরীক্ষকের চোখ যেমন বিনা টিকিটের যাত্রী বুঝতে পারে, এবং খপ করে ধরে, ঠিক তেমনই পারে পুলিশ। এক্ষেত্রে কি হল? মাত্রা ছাড়িয়ে গেল। এমন মাত্রা ছাড়াল যে একটি মৃত্যু পর্যন্ত হল। লাঠি চার্জ একটি দমনমূলক ম্যানেজমেন্টের নাম। গুণ্ডামির নয়।
আরও যে কারনে সমালোচনা হল, তা হল লাঠি সফট টার্গেট করে নিল গরীব মানুষকে। ভ্যানরিক্সার চাকার হাওয়া খুলে দেওয়া হল, একজন বস্তিবাসি তার দশ ফুট বাই দশ ফুট ঘরের বাইরে হয়ত বিঁড়ি খেতে এসেছেন, তাঁকে বেদম মারা হল। উল্টোদিকে দক্ষিণ কলকাতার অভিজাত জগুবাবুর বাজারে তথাকথিত শিক্ষিত ও ভদ্রলোকেরা যখন লক ডাউনের দফা রফা করে দিলেন, তখন লাঠির ল দেখা গেল না।

সমালোচনার আরও একটি বড় কারন, পার্ক সার্কাস, রাজাবাজার, খিদিরপুর, মেটিয়াবুরুজের মত এলাকায় এবং রাজ্যের সেইসব অঞ্চলে যেখানে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ থাকেন, সেখানে প্রথম থেকেই লক ডাউনকে অমান্য করা হল। এইসব অঞ্চলে পুলিশের লাঠি তো দুর, তাদের টিকিও দেখা গেল না।
পুলিশ মাত্রা ছাড়াচ্ছে ও সমালোচনা হচ্ছে দেখে মুখ্যমন্ত্রী পুলিশের কাজে মাত্রা দেবার চেষ্টা না করে বললেন, পাকামো করতে হবে না। মাত্রা ছাড়াবার অভিযোগে সাত জন পুলিশ কর্মীকে ক্লোজ্ করাও হল। পুলিশও ঢিল মারি তোর টিনের চালে বলে কাজে ইতি টানল। মানুষও পিলপিল করে বেরিয়ে পড়ল বাইরে।
আজ, অর্থাৎ এ মাসের ২৮ তারিখ থেকে এপ্রিলের ৪ তারিখ অত্যন্ত স্পর্শকাতর এই কয়েকটা দিন। বারবার বলা সত্ত্বেও ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও তে অভ্যস্ত বাঙালি কার্যতঃ লকডাউন ভেঙে দিল। শহর থেকে শহরতলি, মফস্বল শহর থেকে গ্রাম, যে ছবি আজ সকাল থেকে দেখা যাচ্ছে তা রীতিমত হাড় হিম করা।
তাই কয়েকদিন আগে যেমন মনে হচ্ছিল লাঠির বাড়াবাড়ি হচ্ছে, আজ মানুষের বাড়াবাড়ি দেখে মনে হচ্ছে , লাঠি বোধ হয় এতটা বাড়াবাড়িও করেনি!
আসলে ঠিক ভাবে, যেমনটা হবার তেমন ভাবে কোনও কিছুই হবার নয় বোধ হয় এই দেশে।
তার ওপর কাজের চেয়ে কাজ দেখানোর প্রবণতা সর্বস্তরেই আছে। মিডিয়ার ক্যামেরা দেখলে কি করতে হয়, কি ভাবে করতে হয়, তা মোটের ওপর সকলেরই জানা! মিডিয়া তার কাজ করবে, তাকে ফুটেজ দেবার জন্য প্রশাসনের সর্বস্তর যদি এভাবে পোজ্ দিতে থাকে তাহলে খুবই চিত্তির। দিনের শেষে মিডিয়া কিন্তু ক্যানডিড ছবিই চায়।

আবার ধরুন, কয়েকদিন আগে মনে হচ্ছিল যাঁরা বিদেশ ভ্রমণ লুকোচ্ছেন, রোগ লুকোচ্ছেন তারা গর্হিত অপরাধ করছেন। না, এখন তেমনটা মনে হচ্ছে না তা নয়। তবু কয়েকটি ঘটনা তাদের অপরাধে একটু জল ঢেলেছে বলে মনে হচ্ছে। যেখানে করোনা সন্দেহের রুগী অ্যম্বুলেন্স পাচ্ছেন না, করোনা চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি নিজের আবাসন থেকে বহিষ্কারের মুখে। চিকিৎসকরাও এ হেন মনোভাবের শিকার হচ্ছেন। এমনকি যিনি মৃত তিনিও শশ্মান পেতে বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। এখানে একজন সাধারণ মানুষ রোগ লুকোবে না তো কি করবে? করোনা রোগীর থেকে দু’মিটার দুরত্ব বজায় রাখলে করোনা লাফিয়ে এসে আপনার নাকে মুখে ঢুকবে না। এতদিনে এই সহজ কথাটি সকলের বুঝে যাবার কথা। পরিবর্তে করোনা সন্দেহভাজন কোনও ব্যক্তিকে ভয়ের চোখে, ঘৃণার চোখে দেখলে সে কি করবে?
যতটুকু খবর পাচ্ছি এমন ভাবে চলতে থাকলে আরও কঠিন দিন নেমে আসবে বাংলার বুকে। এমন দিন যা চা-খোর আড্ডাপ্রিয় বাঙালির মোটেই ভাল লাগবে না। যাঁরা পবিত্র কোরানের সঙ্গে করোনার আজব সম্পর্ক আবিষ্কার করে বেয়াদবি করে বেড়াচ্ছেন, তাঁদেরও ভাল লাগবে না। গণতন্ত্রপ্রিয় বাঙালির ধম্মে সইবে না।
এপ্রিলের ২১ তারিখ অবধি না হয় একটু লাইনেই থাকলেন!
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news