রণবীর ভট্টাচার্য
বাংলা সিনেমার শেষ মহানায়ক উত্তম কুমার চলে গেছেন প্রায় চার দশক হতে চলল। সাদা কালো জমানা পেরিয়ে, বিশ্বায়নের স্বাদ মিটিয়ে পৃথিবী করোনা কাল মেটানোর জন্য আজ ভীষণ উদগ্রীব। সেই করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে সেয়ানে সেয়ানে লড়াইয়ের মধ্যেই আজ মহানায়কের জন্মদিন। ইহলোকে তিনি নেই কিন্তু বাঙালির মনন জুড়ে তার চিরকালীন একচেটিয়া রাজত্ব। সেই উত্তম কুমার (Uttam Kumar) বেঁচে থাকলে কি রাজনীতিতে যোগ দিতেন? আজ টলিউডের ক্ষেত্রে যা জলভাত হয়ে গিয়েছে অনেক অভিনেতা, অভিনেত্রীর কাছে, উত্তম কুমার কি পথে হাঁটতেন?

সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ সিনেমায় সেই বিখ্যাত দৃশ্যটি আমরা অনেকেই বার বার দেখেছি। বন্ধু বীরেশ বারবার অনুরোধ করলেও কিছুতেই কারখানার সামনে আন্দোলনরত মানুষের সামনে গাড়ি থেকে নামেননি সেদিনের সিনেমার নায়ক অরিন্দম মুখার্জি। কিন্তু বাস্তবের উত্তম কুমার ছিলেন একবারেই আলাদা, পরোপকারী অথচ ভীষণ পেশাদার। তবে তার জীবনেও রাজনীতির প্রভাব যে ছিল না বলা যায় না। অনেকেই বলেন যে সাংবাদিক তথা নকশাল নেতা সরোজ দত্তের হত্যাকাণ্ড কিছুটা অদ্ভুত ভাবেই দেখে ফেলেছিলেন তিনি সকালে মর্নিং ওয়াকের সময়ে। তাঁকে কতটা পুলিশি প্রশ্নের মুখে পড়তে হয় সেই নিয়ে জীবদ্দশায় কখনও মিডিয়াকে বলেননি ঠিকই কিন্তু তারপর বোম্বাই যাত্রা কিন্তু ইঙ্গিত করে হলিউড অভিনয় করতে চাওয়া মানুষটা কিছুটা পরিস্থিতির শিকার হয়েই বোম্বাই পাড়ি দিয়েছিলেন অভিনয়ের জন্য। অভিনেতা অভিনেত্রীর পক্ষে শিল্পকলায় রাজনৈতিক চেতনার দিকটি খুব সীমাবদ্ধ। তবুও যদুবংশ, নায়ক, সব্যসাচীর মত সিনেমায় মহানায়ক অভিনীত চরিত্রের রাজনৈতিক চেতনা পর্দায় ফুটে উঠেছে অসামান্য অভিনয়ের মাধ্যমে।

বিধান চন্দ্র রায় থেকে জ্যোতি বসু – যেই সময়ে নায়ক উত্তম কুমার স্বমহিমায় ছিলেন অভিনয়ে, তখন রাজনৈতিক পটভূমি ছিল এখনকার থেকে অনেকটাই আলাদা। কিছুটা আদর্শগত দিক তো ছিলই আর তার সঙ্গে ভোটবাক্সে জনপ্রিয়তা ব্যবহারের কোনও অভিপ্রায় ছিল না বাংলার কোন রাজনৈতিক দলের। দক্ষিণ ভারতে কিন্তু এই ট্রেন্ড অনেকদিন ধরেই ছিল যার ফলে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার ভরকেন্দ্রে ছিলেন জয়ললিতা, করুনানিধির মত রাজনীতিবিদ যাদের শুরু কিন্তু বিনোদন জগতে। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মত মানুষ যিনি বামপন্থী হিসেবে পরিচিত, তিনিও কিন্তু প্রত্যক্ষ ভাবে কোনওদিন ভোট রাজনীতিতে যোগ দেননি। আবার সর্বভারতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে অমিতাভ বচ্চনের মত মানুষ রাজনীতিতে এসেছেন, সাংসদ হয়েছেন আবার নিজের ইচ্ছায় সরেও গিয়েছেন। তবে একথা বলা উচিত হবে না যে উত্তম কুমারের উপর আইপিটিএ আন্দোলনের কোন প্রভাব পড়েনি। তিনি আলাদা ছিলেন, স্বপ্নের নায়কের মত সবার উর্ধ্বে ছিলেন।


গণবিনোদনের সাথে যুক্ত মানুষের যে রাজনৈতিক আদর্শ থাকতে নেই এমন নয়। তারা চাইলেই রাজনৈতিক মঞ্চে আসতে পারেন। কিন্তু সেখানে পর্দার জনপ্রিয়তা যদি শুধুমাত্র মাপকাঠি হয়, তাহলে পপুলিজমের আরেকটি ক্ষেত্র তৈরি করে। উত্তম কুমারের যা জনপ্রিয়তা ছিল, তিনি ভোট রাজনীতিতে এলে অবশ্যই প্রভাব ফেলতে পারতেন। কিন্তু ওনার জেতা বা হারা যদি জনপ্রিয়তা ঠিক করে দিত, তাহলে কি সামগ্রিক ভাবে গণতন্ত্রের জন্য ভালো হতো? উত্তম কুমার শিল্পী সংসদের তৈরির সময়ে অন্যতম একজন হোতা ছিলেন, কিন্তু সেখানে রাজনৈতিক অনুপ্রবেশের দিকটি ছিল না। তবে এটাও ঠিক, উত্তম কুমারের প্রশ্নাতীত গ্রহণযোগ্যতার পিছনে অন্যতম একটি দিক ছিল তার নিরপেক্ষতা। সেখানে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নয়, বরং তার বৃহত্তর ভাবনা চিন্তা প্রভাব ফেলেছিল সকলের মধ্যে। খুব কম বয়সেই মারা গিয়েছিলেন তিনি, কিন্তু সিনেমার সাথে যুক্ত সবার কথা ভাবতেন তিনি, সেখানে কিন্তু কাউকে দূরে ঠেলে দেননি, তাই জন্যই তিনি আজ ও ‘মহানায়ক’।
সামনের দিনে বঙ্গ রাজনীতিতে বিনোদন তথা গ্ল্যামার জগত থেকে অনেকেই আসবেন। ইতিমধ্যেই অনেকেই রয়েছেন জনপ্রতিনিধি হিসেবে। এই আদর্শহীনতার যুগে সেটা কিছুটা স্বাভাবিকও বটে। কিন্তু ‘মহানায়কীয় মাপকাঠি’ থাকবেই।
শুভ জন্মদিন, উত্তম কুমার!
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news