রণবীর ভট্টাচার্য
এটা করোনা কাল। নীললোহিতের এখন কাজ নেই। বয়স তার বাড়ে না আবার কবিতাও লিখতে চায় না সে। দিকশূন্যপুরে যাওয়ার উপায়ও নেই, কারণ ট্রেন এখনও চালু হয়নি। নীললোহিত ও আজ আমার আপনার মত ভ্যাকসিনের অপেক্ষায় বসে আছে। কি হবে নীললোহিতের?
সুনীলদা মানে আপামর বাঙ্গালীর পছন্দের লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, আজ অমৃতলোকে নিশ্চয়ই আজ খুব চিন্তিত। আজ ওনার আরো একটি জন্মদিন, বলতে গেলে নতুন শতাব্দীর সংকট-কালে একটি জন্মদিন যা আবার করে ভাবা প্র্যাকটিস করতে শেখাচ্ছে পৃথিবীর সকলকে। লকডাউনের শুরুতে অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় বলেছিলেন যে এই সময়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের (Sunil Gangopadhyay) সৃষ্টি নতুন আলোকে দেখার সময় পাওয়া যাবে। কিন্তু সেটা যে কথার কথা ছিল না, সেটা বোধ হয় বাস্তববাদী সকল মানুষ জানেন। পৃথিবীর কোনায় কোনায় ছড়িয়ে থাকা নীরা, নিখিলেশরা আজ সত্যিই জানে না সামনের দিনে কি হবে। চাকরি থাকবে তো? মাঝবয়সে এসে এই ‘অর্ধেক জীবনের’ গ্লানি যা চিনতে শিখিয়েছিলেন সুনীল বাবু, সেটা বাঙালি আবার নতুন করে উপলব্ধি করছে এই করোনা ভাইরাসের বিশ্বাসঘাতকতায়।
যুগ যুগ ধরে লেখক, কবি, সাহিত্যিকদের সৃষ্টি নিয়ে তুলনামূলক আলোচনা হয়ে এসেছে। অনেকেই নতুন আতসকাঁচে দেখার চেষ্টা করেছেন। মানুষ হিসেবে ‘সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়’ কেমন ছিলেন সেটা অন্য আলোচনার দাবি রাখে কিন্তু তার সৃষ্টি বাঙালি মননে অমরত্ব পেয়েছে অবশ্যই। সহজ, সরল ভাবে বাংলা লেখা যে বানিজ্যিক ভাবে এত সফল হতে পারে, সেই ক্ষেত্রে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন এক উজ্জ্বল তারা। কল্লোল গোষ্ঠীর সময় পেরিয়েও যখন রবীন্দ্র প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল, তখনও সুনীল ছিলেন একান্তই স্বতন্ত্র। আর আজও পাঠকরা অবাক হয়ে যান যে শেষ বয়সে এসেও কিভাবে লেখায় বয়সের প্রভাব ফেলতে দেননি উনি। সমসাময়িক এরকম উদাহরণ কিন্তু খুব একটা নেই বললেই চলে। তাই নতুন ফেসবুকের টিনএজ বাঙালি বঙ্কিমচন্দ্রের বাংলা পড়তে গিয়ে হোঁচট খেলেও কিন্তু ‘সুনীলে’ ভীষণ সাবলীল। কবিতা থেকে উপন্যাস আবার কবিতা – এই স্বাভাবিক স্বাচ্ছন্দ্য ছিল এই অসামান্য প্রতিভার আরেক উজ্জ্বল নিদর্শন।
এখন সুনীল নেই। কিন্তু কোথাও যেন একটা মিল পাওয়া যায় সুনীল-সময়ের। করোনা, বিচ্ছেদ, মৃত্যু, অবসাদ – বেঁচে থাকলে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় নির্ঘাত আরেকবার শুরু করতেন আজকের নতুন ‘পূর্ব পশ্চিম’ এর কথা। উনি কি বামপন্থী ছিলেন? প্রশ্নটি খুব গুরুত্বপূর্ণ নয় কারণ উনি পতাকার দায়ে লেখেননি। তবে ওনার প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতা কি স্রেফ লোক দেখানো ছিল? নিজে বেশিরভাগ সময় আনন্দবাজারে থেকেছেন, পৃষ্ঠপোষক ছিলেন একপ্রকার! রামায়ণ যদি বাংলা সাহিত্য হয়, তাহলে উনি ছিলেন সাক্ষাৎ ‘কৃত্তিবাস’ – কিন্তু কেন আজ আরেকজন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, তারাপদ রায় উঠে আসছেন না, এই ধাঁধার উত্তর দিতে পারেননি। সুনীল পরবর্তী সময় স্রেফ মধ্যমেধা আর ফেসবুকিয় লেখার বাহবা দিয়ে যাচ্ছে!
সামনের বছর বাংলায় নির্বাচন। এন আর সি নিয়ে তর্ক বিতর্ক হয়ত চলবেই কিন্তু উদ্বাস্তু বাঙালির মনের কথা কেউ কি আর খবর রাখে? শুধু ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের স্পনসর নিয়ে খবর করে বাজারি মিডিয়া আর উদ্বাস্তুরা স্রেফ কলোনির ভোটার হয়ে থেকে যান। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় থাকলে কি গর্জে উঠতেন এই রাজনৈতিক বঞ্চনা নিয়ে? হয়ত এই দিশা থাকবে সামনের বছরের নির্বাচনী ফলাফলে। তবে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মত মানুষেরা থাকবেন কবিতায়, ভালোবাসা, অভিমানে, বিষাদে, শান্তিনিকেতনে, সাদা-কালো ফটোয় আর অবশ্যই আবেগের কলকাতা বইমেলায়।
শুভ জন্মদিন, সুনীলদা।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news