দেবক বন্দ্যোপাধ্যায়।
সুব্রতদার জীবনের একটা ঐতিহাসিক পদক্ষেপের সঙ্গে এই অধম জড়িয়ে পড়ে। জড়িয়ে পড়ে একটি খবরের কারনেই। আর তাঁর পদক্ষেপ টি কেন ঐতিহাসিক, তা বলছি।
তখন অর্কপ্রভ সরকারের নেতৃত্বে নিউজ টাইম চ্যানেল তৈরি হচ্ছে। ড্রাইরান শুরু হয়ে গেছে। একদিন সকালের সম্পাদকীয় মিটিংয়ে অর্ক বলল, একটা বড় খবর দিয়ে চ্যানেল এয়ার করতে হবে। কী করা যায়?
এই অকিঞ্চিতকর সাংবাদিকের পকেটে তখন একটি খবর ছিল, যেটা প্রকাশ পেলে রাজনৈতিক মহলে হৈচৈ পড়বে। শুধুমাত্র রাজনৈতিক মহল নয়,যাঁকে নিয়ে খবর , তাঁকে নিয়ে সাধারণের আগ্রহ ও কম নয়।
সম্পাদকীয় বৈঠকে অর্ক কে হাত দেখিয়ে আশ্বস্ত করলাম, এমন খবর আমার কাছে আছে।
পরে অর্কর কেবিনে ইনপুট হেড আর অ্যাসাইনমেন্ট হেডের উপস্থিতি তে আমি বললাম সুব্রতদা কংগ্রেস ছাড়বে এবং তৃণমূলে যোগ দেবে।
অর্ক বলল,তুই নিশ্চিত?
আমি বললাম, হ্যাঁ।
ঠিক হলো, চ্যানেলের শুরুর দিনে সুব্রতদাই ব্রেকিং এবং এক্সক্লুসিভ।
নির্দিষ্ট দিনে, যথা সময়ে খবরটি বাতাস পেল (পড়ুন, এয়ার হলো)। তারপর যা হয় আর কী! খবরের রেসপন্স কীরকম আঁচ করে নেওয়ার চেষ্টা।
বিকেলের দিকে বেণুদার ফোন এল, ‘তুমি কী খবর করেছ? সুব্রত দা খুব রাগারাগি করছে!’
রাগের বহর ঠিক কতটা সেটা আঁচ করতে একটু রাত হল। প্রথম দিনের ব্যস্ততা, উৎকণ্ঠা ও ধকলের পর বিমানবন্দরের কাছাকাছি একটি পানশালায় বসেছিলাম। বেজে উঠলো পকেটের ফোন…সুব্রত মুখোপাধ্যায়!
ফোন ধরে বললাম, ‘দাদা, বলো!’
আমি ভাবতেও পারিনি যে ওপারে আগুন জ্বলবে!
‘আমি যদি এক বাপের ব্যাটা হই, তোকে কোনও দিন আমার বাড়িতে ঢুকতে দেব না।’
মুহুর্তে বুঝে নিলাম বিষয়টাকে হালকা করতে হবে। বললাম, কাল সকালেই যাবো তোমার বাড়ি, পারলে আটকে নিও’।
মিনিট তিনেকের কথোপকথনে চিড়ে ভিজল বলে মনে হলো না। ফোন রাখার পর ভাবলাম, সুব্রত দা এভাবে রি-অ্যাক্ট করছে কেন? যে নিজে বলে, নেগেটিভ বা পজিটিভ, খবর যেমনই হোক, খবরে থাকা টা দরকার।
নেগেটিভ পাবলিসিটি, পজিটিভ পাবলিসিটির থেকে বেশি কাজ দেয়: এই মতের প্রবক্তা কেন এত চটলেন সেটা জানা আমার জন্য খুব প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ল।
বাস্তবিক অবশ্য পরের দিন সুব্রতদার বাড়ি যাইনি। তবে তার পরের দিন সুব্রতদাকে আবার ফোন করলাম। একটা টক শোতে আসার জন্য। কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক। বাচনভঙ্গি যথারীতি আন্তরিক। বুঝলাম রাগ পড়েছে। পরের দিন চ্যানেলে এল। ছায়াসঙ্গী বিমলদা সেদিন সঙ্গে ছিল না। নিজের দুটো মোবাইল ফোন পরম বিশ্বাসে আমার হাতে দিয়ে স্টুডিও তে ঢুকে গেল।
কয়েকদিন পরে কলকাতা পুরসভায় কংগ্রেসের একটা বিক্ষোভ কর্মসূচি ছিল। সুব্রত দা সেখানে গেল না। আমরা সেটাই হাইলাইট করলাম। কংগ্রেসের কর্মসূচি তে অনুপস্থিত সুব্রত। চাপা আগুনে আবার ঘি পড়ল। ততদিনে জানতে পেরেছি সুব্রতদার রাগের কারন। দিল্লিতে কথা চলছিল সুব্রত দা এআইসিসি-র সাধারণ সম্পাদক হবে। বেশি বয়েসে এসে সুব্রত দা দিল্লির রাজনীতি নিয়ে আগ্রহী হয়েছিল। সেই কারনে হয়ত ওর দল ছাড়ার খবর ওকে রাগিয়ে তুলেছিল। রাগের পারদ এতটাই চড়েছিল, যে সল্টলেকে একটি সভায় সুব্রত দা প্রকাশ্যে আমার নামে যা ইচ্ছে তাই বলল। সঙ্গে যোগ দিল অরুণাভ দা।
যাই হোক শেষ পর্যন্ত কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দিল সুব্রত দা।
সুব্রতদাকে যাঁরা দলবদলু বলে আনন্দ পান, তাঁদের জেনে রাখা ভালো, তৃণমূল কে আলাদা দল বলে মনেই করত না সুব্রত দা। একটাই বাড়ি, তার দুটো আলাদা ঘর। তাই দলবদল নয়, সুব্রতদার তৃণমূলে যাওয়া ছিল ঘর বদল। সিদ্ধান্ত টা ঐতিহাসিক বললাম এই জন্যই, সেই সময় থেকে কংগ্রেস ঢালু পথেই নেমেছে। সুব্রত দা সর্বভারতীয় কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক হয়ে দলের পতনশীলতা রুখতে পারত না। তার চেয়ে তৃণমূলে এসে, সুব্রত দা সেই কংগ্রেস টা করেছে যেটা সদা সক্রিয়, লড়াকু। আর পঞ্চায়েতের দায়িত্ব পালন করে তার তর্কাতীত যোগ্যতা আরো একবার প্রমাণ করেছে।
এই কারনেই সুব্রতদার সেদিনের সিদ্ধান্ত ঐতিহাসিক ছিল বলে আমার মনে হয়। আর আমার মত একজন অকিঞ্চিতকর সাংবাদিক ওর ওই সিদ্ধান্তের সঙ্গে নেহাত খবর করার কারনে জড়িয়ে পড়েছিল।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news