গৌতম বসুঃ
সুদূর ইতালিতে থেকেও মুখ্যমন্ত্রী ইসলামপুরের আরএসএস যোগ বুঝতে পারেন কিন্তু শহরে থেকেও মাঝেরহাট ব্রিজের খবর রাখেন না! বাগরি মার্কেটের নিয়ম ভঙ্গের কথা জানতে পারেন না! এ বড়ই অদ্ভুত!
আচ্ছা, ইতালি তো বললাম, কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী এখন ঠিক কোথায়? জার্মানি না ইতালি! বোধ হয় ইতালি! যাক গে, আমরা আদার ব্যাপারি, জাহাজের খবর পাবই বা কেন! আমরা শুধু জানি বাড়ির সামনের ব্রিজটায় ফাটল ধরেছে, রোজ পথে বেরিয়ে দেখি ভাঙা রাস্তার গর্ত আরও বড় হল। এরপর হয়তো দু’চারটে দুর্ঘটনা, দু’একজন মরবে। যাক গে, জন্মিলে মরিতে হবে। অন্তত গরিব সাধারণের। কিন্তু যে কথা হচ্ছিল— যতদূরেই থাকুন মুখ্যমন্ত্রী ইসলামপুরের দাড়ভিট স্কুলের খবর ঠিক পেয়েছেন। অবশ্য ইসলামপুর স্কুলের ঘটনা বড়। ছাত্র-পুলিশ সংঘর্ষে দুই ছাত্র মারা গেছে। এবং মুখ্যমন্ত্রী বিদেশ থেকেই প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন, ইসলামপুরের ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে আরএসএস।
অর্থাৎ মুখ্যমন্ত্রী বলতে চেয়েছেন দাড়ভিটায় মোটেই ছাত্র আন্দোলন হয়নি। ওইসব সাজানো। আসল ঘটনা রাজনৈতিক। যে রাজনীতি করেছে আরএসএস। এখন প্রশ্ন ওঠে, জার্মানি বা ইতালিতে থেকেও মুখ্যমন্ত্রী কী করে বুঝে গেলেন যে ছাত্র আন্দোলনের নামে রাজনীতি হয়েছে ইসলামপুরে। মানছি পশ্চিমবঙ্গের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী প্রতিভাময়ী। বর্তমান ভারতের অন্যতম সেরা রাজনীতিবিদ। তবুও, বিদেশে বসে জেলার ঘটনা নিয়ে এমন স্ট্রেট বিবৃতি দেওয়া কঠিন। আচ্ছা, তর্কের খাতিরে যদি মেনেও নিই যে এই ঘটনার পেছনে আরএসএস রয়েছে, তবে একটা অন্য প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয়— ইসলামপুরের ঘটনাটি তো একটি আচমকা সংঘর্ষ। কিন্তু মাঝেরহাট ব্রিজ ভাঙা তো তা নয়। শহর তথা রাজ্যের ব্রিজগুলো যে দিন দিন ক্ষয়ে যাচ্ছে, যাচ্ছিল, বিপজ্জনক ঝুঁকির দিকে চলে যাচ্ছে, যাচ্ছিল, তা তো আমরা যারা বাসে ট্রামে চড়া লোক তারাও খেয়াল করেছি। অথচ মুখ্যমন্ত্রী বুঝতে পারলেন না? তার তো বিরাট মন্ত্রী পারিষদ। একগাদা আমলা। সরকারি আধিকারীক। সর্বপরি পুলিশ রয়েছে। কেউ খেয়াল করল না যে মাঝেরহাট ব্রিজটা ভাঙব ভাঙব করছে! বিষয় যথেষ্ট আশ্চর্যের নয় কি? সবচেয়ে বড় কথা দূরদৃষ্টি সম্পন্ন মুখ্যমন্ত্রীও বুঝতে পারলেন না!
যিনি ইতালি থেকে ইসলামপুরের আরএসএস যোগ বলে দিতে পারেন। সবচেয়ে বড় কথা যিনি বীরভূমের বিখ্যাত নেতা অনুব্রত মণ্ডলের স্বাস্থ্যের খবর রাখেন, তিনি রাজ্যের ব্রিজগুলির স্বাস্থ্যের খবর রাখেন না! এ হয় নাকি!
আমাদের মেধাবী মুখ্যমন্ত্রী মাঝেরহাট ভাঙার পর, সাধারণ মানুষের মৃত্যুর পর শহরের তথা রাজ্যের ব্রিজগুলির স্বাস্থ্যপরীক্ষা শুরু করলেন। অর্থাৎ এতদিন তিনি বা রাজ্য সরকার এ বিষয়ে কিছুই জানতেন না তা পরিষ্কার! জানতেন না যে তা বোঝা গেল তখন আরও, যখন একটা বা দুটো নয়, শহরের ২০টি ব্রিজকে চিহ্নিত কর হল বিপজ্জনক হিসেবে। ব্রিজগুলি পরীক্ষা করার পর দেখা গেল, ২০টির ভিতর তিন চারটি বাদ দিলে বাকিগুলোর অবস্থা মারাত্বক। অথচ আমরা বিশেষজ্ঞ নই, বোকাসোকা সাধারণ মানুষ প্রতিদিন বাসে, ট্রামে, ট্রেনে যেতে যেতে দেখতাম কী ভয়ঙ্কর বিপদের পথে পাড়ি দিচ্ছি। আমরা জানতাম আহত হতে পারি, নিহত হতে পারি। কিন্তু আমরা তো পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সংস্কৃতি দেখতে দেখতে শিখেছি, আমাদের জীবনের দাম শূন্য। আমরা একেকজন ভোটার কার্ড বৈ কিছু না। আমাদের প্রয়োজন হয় ভোটের সময়। বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে তাও হয় না। অতএব ভাঙা জীবনে অভ্যস্ত আমরা ভাঙা ব্রিজই মেনে নিয়েছিলাম। অথচ মুখ্যমন্ত্রী বুঝতে পারলেন না!
মুখ্যমন্ত্রী ইতালি থেকে আরএসএস যোগ বলে দিতে পারেন কিন্তু শহরে থেকে বাগরি মার্কেটের খোঁজ রাখেন না! আজ বাগরি মার্কেট পুড়ে যাওয়ার পর পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলেন, ব্যবসায়ীদের দোষে বিপর্যয়। ব্যবসায়ীরা নিয়মে ফাঁকি দিয়েছে। কিন্তু কীভাবে নিয়ম ফাঁকি দিল ব্যবসায়ীরা? সরকারি নিয়মভঙ্গ করেও পার পেয়ে গেল কী করে? শহরে ব্রিজগুলোর মতোই বাগরি মার্কেটও একটি পাবলিক প্লেস। যেখানে প্রতিদিন হাজার লোকের যাতায়াত। কাছেই থানা, পুলিশ। তারা কেন দেখেও দেখল না?
অতএব রহস্য রহস্য রহস্য! যিনি ইউরোপে বসে রাজ্যের প্রত্যন্ত জেলার তদন্ত রিপোর্ট দিয়ে দেন, তিনি প্রায় এক দশক ক্ষমতায় থেকেও জীর্ণ মাঝেরহাট ব্রিজ, বাগরি মার্কেটের খবর রাখেন না! হায়, এ বড় আশ্চর্যের, এ বড়ই অদ্ভুত!
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news