নিজস্ব প্রতিবেদন:
নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল নিয়ে এই মুহূর্তে গোটা দেশ জুড়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিরোধীরা বলছেন, এই বিলের মাধ্যমে হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে বিভাজনের রাজনীতি করছে কেন্দ্রীয় সরকার। অন্যদিকে সরকার পক্ষ বলছে, এই বিলের সঙ্গে ভারতীয় মুসলিমদের কোনও সম্পর্কই নেই। কোন যুক্তি ঠিক, কোন যুক্তি ভুল তা নিয়ে অনেকের মনে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। আর এই ধোঁয়াশা দূর করতে নাগরিকত্ব বিল নিয়ে আমরা কিছু জিনিস জেনে নেব——
নাগরিকতা বিলের প্রাথমিক পর্যায়:
ভারতের নাগরিকতা বিল নিয়ে ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যাবে— ভারতের স্বাধীনতা লাভের সঙ্গে ভারত বিভাগের দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। দেশ বিভাগের ফলে হিন্দুরা পাকিস্তান থেকে ভারতে আসছিলেন। মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষরা প্রাথমিক ভীতিতে পাকিস্তানে চলে গিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে অনেকে আবার ভারতে ফিরে আসছিলেন। তা ছাড়া ভবিষ্যতে দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তান থেকে উদ্বাস্তু আসার সম্ভাবনা ছিল তখন থেকেই করা হচ্ছিল। এই সমস্ত বিষয় বুঝতে পেরে সংবিধান প্রণেতারা সমস্যায় পড়েছিলেন। ভারতীয় নাগরিকতার ব্যাপারে কোন স্থির ও স্থায়ী সিদ্ধান্তে আসা তাঁদের পক্ষে সম্ভব ছিল না।
সংবিধানের খসড়া কমিটির সভাপতি ডঃ আম্বেদকর গণপরিষদে বলেছিলেন যে, ভারতের নাগরিকত্বের ব্যাপারে তারা কোন স্থায়ী ও সম্পূর্ণ বিধি-বিধান তৈরি করতে যাচ্ছেন না। সংবিধানের ১১ নম্বর ধারা অনুযায়ী নাগরিকত্ব সম্পর্কিত স্থায়ী নিয়ম-কানুন প্রনয়নের সামগ্রিক ক্ষমতার অধিকারী হবে ভারতের পার্লামেন্ট। ওই ধারায় আরও বলা হয়, পার্লামেন্টকে পরিস্থিতি ও প্রয়োজন অনুসারে নাগরিকতার নিয়ম পদ্ধতি প্রণয়নের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে যে, সংবিধানে যাই থাকুক না কেন, সংসদ আইনের মাধ্যমে নাগরিকতা অর্জন, অবসান ও অন্যান্য বিষয়ে যে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে।
অর্থাৎ বিরোধীরা যতই নাগরিকত্ব বিলকে সংবিধান বিরোধী বলুক না কেন, এখনও পর্যন্ত বিজেপি যে পদক্ষেপ নিয়েছে তা সংবিধান বিরোধী নয়। আবার কংগ্রেসও ১৯৮৫ সালে এই বিল সংশোধন করেছে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও আফগানিস্তান থেকে বেআইনি অনুপ্রবেশ আটকাতে। তবে ১৯৫৫ সালের আইনে বলা হয়েছিল, ১৯৪৮ সালের ১৯ জুলাই তারিখের আগে যারা পাকিস্তান থেকে ভারতে এসেছেন এবং এখানে বসবাস করছেন তারা ভারতের নাগরিক হিসেবে গণ্য হবেন।
কিন্তু সেই আইনকে সংশোধন করে ১৯৮৫ সালে রাজীব গাঁধী নতুন আইন আনেন। আর তাতে বলা হয়, বাংলাদেশ থেকে যে সকল বিদেশী ১৯৬৬ সালের ১লা জানুয়ারি বা তার পরে কিন্তু ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চের আগে অসমে এসেছেন তাঁরা ১৯৪৬ সালের বিদেশি ট্রাইবুনাল অনুসারে নাম নিবন্ধভুক্ত করে নাগরিক হতে পারবেন। আবার ২০০৫ সালে মনমোহন সিংহের সরকার ফের নাগরিকতা বিল সংশোধন করে জানায়, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ ব্যতীত অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রে নাগরিকতা অর্জন যোগ্য বলে বিবেচিত হবে।
নাগরিকত্ব বিল নিয়ে বিজেপির দাবি:
বিজেপির মতে, ধর্মকে কেন্দ্র করেই যেহেতু দেশ ভাগ হয়েছে। তাই হিন্দুদের প্রতি দায়বদ্ধ রয়েছে দেশের। ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে যেসব অ-মুসলিম শরণার্থী ভারতে এসেছেন, কোনও প্রমাণ পত্র ছাড়াই তাঁদেরকে নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। অন্যদিকে ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের পরে যাঁরা এসেছেন তাঁদেরকে ৬ বছর ভারতে থাকতে হবে। তারপর নাগরিকত্ব পাবে। আগে যা ছিল ১১ বছর। তবে সজ্জন মুসলিমরা ৬ বছরেই নাগরিকত্ব পাবেন।
নাগরিকত্ব বিল নিয়ে বিরোধীদের দাবি:
সংবিধানের ১৪ তম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আইনের চোখে সকলেই সমান। রাষ্ট্র ধর্ম, জাতি, লিঙ্গর ভিত্তিতে ভেদাভেদ করতে পারে না। মুসলিম শরণার্থীদের নাগরিকত্ব না দিয়ে ভেদাভেদই কি করা হচ্ছে না?
মুসলিমদের সঙ্গে এই বিলের সম্পর্ক:
ভারতীয় মুসলিমদের সঙ্গে এই বিলের কোনও সম্পর্ক নেই। বাইরে থেকে যেসব মুসলিমরা আসবেন তাঁরাও নাগরিকত্ব পাবেন। তবে তাঁদেরকে ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইনের মাধ্যমে আবেদন করতে হবে। অর্থাৎ নতুন আইনেও সব ধর্মকে সম্মান জানানো হয়েছে। মুসলিমদেরকে বঞ্চিত করা হচ্ছে না। সংবিধান অনুযায়ী তাঁরাও নাগরিকত্ব পাবে।
পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে এই বিলের সম্পর্ক:
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেন্দ্রীয় মন্ত্রী থাকাকালীন একাধিকবার লোকসভায় এনআরসির পক্ষে সওয়াল করেছিলেন। আর মমতার দাবি মতো এনআরসি হলে, হিন্দু মুসলিম সকলেই দেশ থেকে বিতাড়িত হতেন। কিন্তু নাগরিকত্ব বিল আনায় মতুয়ারা সরাসরি নাগরিকত্ব পাবেন। যা এতদিন তাঁদের কাছে অধরা ছিল। এখন সেই মমতাই নাগরিকত্বের বিরোধিতা করে মানুষকে ভুল বোঝাচ্ছেন। যার সুফলও মিলেছে সম্প্রতি উপনির্বাচনে।
বিলের বিতর্কিত বিষয়:
এই বিলে নাগরিকত্ব দেওয়া নিয়ে কিছুটা ধোঁয়াশা রয়েছে। কারণ যাঁরা ২০১৪ সালের পরে এসেছে তাঁদেরকে নির্ণয় করা কতটা ত্রুটিমুক্ত হবে তা নিয়ে। নাগরিকত্ব দেওয়ার পর সারা দেশে জুড়ে সরকার এনআরসি করবে বলে দাবি করছে। সেক্ষেত্রে অসমিয়াদের দাবি অপূর্ন রয়ে যাবে। তাই আজ অসমিয়ারাও এই বিলের বিরোধিতায় নেমেছে। তাঁদের দাবি, নাগরিকত্ব বিল প্রদানের মাধ্যমে তো সবাই নাগরিকত্ব পেয়েই যাবেন এবং অসমিয়াদের অধিকারের দাবি পূরণ হবে না।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news