পার্থসারথি পাণ্ডা : 
ছবি বিশ্বাসমশাই যেমন বড় অভিনেতা ছিলেন, তেমনি ছিলেন বড় মাপের মানুষ । যারা তাঁর সংস্পর্শে এসেছিলেন, তাঁকে বন্ধু হিসেবে পেয়েছিলেন, তাঁদের থেকে ভাগ্যবান পৃথিবীতে খুব কমই আছেন।
হাস্যরসের শিল্পী নৃপতি চট্টপাধ্যায়ের তখন খুব অভাবের মধ্যে দিন কাটছে। হাতে তেমন কাজ নেই। যেটুকু কাজ পান, তাতে দক্ষিণাও তেমন নেই। এঁদের মতো কৌতুক অভিনেতা না হলে ছবি জমতই না, কিন্তু যা পারিশ্রমিক দেওয়া হতো তাতে এঁদের সংসারও চলত না। হাতে যখন কাজ নেই, তখনই একদিন নৃপতি শুনলেন সত্যজিৎ রায় ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’ ছবি করছেন। কোন উপায় না দেখে তাঁর কাছেই গেলেন কাজ চাইতে। বললেন, মানিকবাবু আপনি ছবি করছেন শুনলাম, আমাকে একটা পার্ট দেবেন?
নৃপতির গলায় এমন একটা আর্তি ছিল, সত্যজিৎবাবু তাতেই বুঝলেন মানুষটা কোন্ তাড়নায় ছুটে এসেছেন । কিন্তু তখন যে সবাইকে পার্ট দেওয়া হয়ে গেছে! আর তো উপায় নেই! তাই শুনে নৃপতি বললেন, তবু দেখুন না, যদি কিছু বেরোয়, আমার যা অবস্থা, তাতে মৃত সৈনিকের পার্ট পেলেও বর্তে যাই! তখন সত্যজিৎ একটু ভেবে বললেন, ঠিক আছে, আপনি আমার ছবিতে কাজ করছেন। দু’চোখে অসীম কৃতজ্ঞতা রেখে নৃপতি বিদায় নিলেন। সত্যজিৎ দরজা তাঁর সঙ্গে এগিয়ে গেলেন। তাঁকে বিদায় দিলেন।

‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’ ছবিতে গুপি আর বাঘা যখন রাজার কারাগারে ভুতের বরে ভালো ভালো খাবার খাচ্ছে, তখন যে হাড় জিরজিরে বুভুক্ষু বুড়ো রক্ষীটি লোলুপ চোখে সেই খাবারের দিকে চেয়েছিল, গুপিবাঘার ফেলে যাওয়া খাবার গোগ্রাসে খেতে বসেছিল, তার কোন সংলাপ ছিল না, পুরো ছবিতে একটি দৃশ্য ছাড়া আর কোথাও কোন উপস্থিতি ছিল না, তবু সেই ক্ষণিকের উপস্থিতিটুকুই জীবনের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা দিয়ে স্মরণীয় করে তুলেছিলেন নৃপতি। অনেক বড় শিল্পী হলে তবেই এটা সম্ভব।
তো, এই মানুষটির চরম দারিদ্র্যের মুহুর্তে যখন আর কাউকে পাশে পাননি; তখন আর্থিক সাহায্য বলুন, সহমর্মিতায় বলুন তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন পরম বন্ধু ছবি বিশ্বাস।

একদিন স্টুডিওতে ছবির শ্যুটিং চলছে। ছবি বিশ্বাস খবর পেলেন নৃপতি খুব অসুস্থ । তাঁকে ভর্তি করা হয়েছে ভাঙ্গর হাসপাতালে । শটটা দিয়েই ছবিবাবু ছুটলেন হাসপাতালে । গিয়ে দেখেন তখনও রেজিস্টারে নাম ওঠেনি। এ-ওয়ার্ড সে-ওয়ার্ড ঘুরে তাঁকে কোথাও খুঁজে পেলেন না। অনেক খোঁজাখুঁজির পর অবশেষে আবিষ্কার করলেন, হ্যাঁ আবিষ্কারই বটে(!), রুগ্নকাহিল হাড্ডিসার শরীরে ময়লা ন্যাকড়ার ওপর শুয়ে আছেন নৃপতি হাসপাতালের করিডোরে র এক কোণে । এতবড় একজন শিল্পীর জন্য একটা বেডও জুটল না! ডাক্তার নার্স সবাই পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে, একবার ফিরেও তাকাচ্ছে না। সামান্য চিকিৎসাটকুও তখনও শুরু হয়নি। ছবিবাবুর খুব রাগ হল। তিনি পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়া এক ডাক্তারকে ডেকে ধমক দিয়ে বললেন, এই যে লোকটা মেঝেতে পড়ে আছে জানেন এ কে? ডাক্তারটি স্বয়ং ছবিবাবুকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যান, আমতা আমতা করতে থাকেন। ছবিবাবু আবার ধমক দিয়ে বললেন, এক্ষুনি এনার জন্য একটা বেডের ব্যবস্থা করুন, নইলে আমি যেখানে ফোন করলে এক্ষুনি ব্যবস্থা হবে, সেখানেই ফোন করব। ডাক্তারবাবু তো তটস্থ হয়েই ছিলেন, তিনি অমনি ছোটাছুটি শুরু করলেন। ছবিবাবুর রাসভারী গলার এক ধমকেই কাজ হল। তক্ষুনি বেডের ব্যবস্থা হল।

পাঁজাকোলা করে ছবিবাবু নিজেই নৃপতিকে বেডে নিয়ে গিয়ে তুললেন । দাঁড়িয়ে থেকে চিকিৎসা শুরু করালেন । পথ্যির ব্যবস্থা করালেন। ওষুধ, পথ্যি, আয়ার সব ভার নিজে নিলেন, নিজেই সে সব ব্যবস্থা করে আবার স্টুডিওতে ফিরলেন । এমনই বন্ধুবৎসল মানুষ ছিলেন ছবিবাবু, এ তো তাঁর জীবনের ছোট্ট একটি ঘটনা, এমন কত গল্প রয়েছে তাঁর সারাটা জীবনে। ছবি বিশ্বাসের জন্মদিনে আজ শুধু এইটুকু থাক…
বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
https://www.youtube.com/channelhindustan
https://www.facebook.com/channelhindustan
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news