দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় : 
সত্তরোর্ধ। তার ওপর অসুস্থ। কয়েকদিন আগে গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। তিনি কী এমন বললেন যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পেটোয়া মহল হঠাৎ তাঁকে নিয়ে পড়ল! এই ভাবনা এখন মাথা তুলেছে রাজ্য কংগ্রেসে। সুচারু রাজনীতিক সুব্রত মুখোপাধ্যায় সংবাদ মাধ্যম সম্পর্কে মজা করে একটা কথা বলেন। বিনা প্ররোচনায় কোনও সংবাদ মাধ্যম যদি তাঁর সম্পর্কে বিরূপ কিছু লেখে সুব্রত শান্ত স্বরে বলেন, ‘আহা গালাগালি করলেও লিখছে তো!’ বিপণন শিল্পে যে কথা সত্য রাজনীতিতেও সে কথা মিথ্যে নয়। নেগেটিভ প্রচারও প্রচার। বরং নেগেটিভ প্রচারে কখনও কখনও ফল হয় বেশি। সাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বেশি।
সে যাই হোক। কয়েকদিন আগে কংগ্রেসের সভাপতি রাহুল গাঁধীর সঙ্গে দেখা করে সোমেন মিত্র কয়েকটি কথা বলে এসেছিলেন। বলা ভাল, রাজ্যে আগামী দিনে কংগ্রেসের কৌশল কি হবে তা নিয়ে নিজের মতামত জানিয়ে এসেছিলেন। সোমেনের বক্তব্য দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। ১)জিততে চাইলে তৃণমূলের সঙ্গে জোট। ২) রাজ্যে কংগ্রেসকে বাঁচিয়ে রাখতে চাইলে বামেদের সঙ্গে জোট। তাঁর এই বক্তব্য এমন ভাবে প্রচার করা হয়েছিল তাতে সাধারণের কাছে ভুল বার্তা যাচ্ছিল। এই অভিযোগ তখনই জানিয়েছিল সোমেনের ঘনিষ্ঠ মহল। এমনকি কয়েকদিন আগে পর্যন্ত যাঁর ফেসবুক সম্পর্কে কোনও স্পষ্ট ধারণা ছিল না সেই সোমেন মিত্রও পুত্র রোহনের উদ্যোগ ও সহযোগিতায় ফেসবুক লাইভে বসে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছিলেন। লাইভে বসে তিনি নিজেও অনুধাবন করেছিলেন যে একটি বড় অংশের কংগ্রেস সমর্থক চাইছে বামও নয় তৃণমূলও নয়, একা লড়তে। সোমেন তাঁদের জবাবও দিয়েছেন। বলেছেন, একা লড়তে পারার মতো ভাল আর কিছু হতেই পারে না। একই নিশ্বাসে এ কথাও বলেছেন যে একা লড়ার মতো পরিস্থিতি এখন দলের নেই। তাই উপায়ান্তর না দেখে বামেদের হাত ধরা ছাড়া এই মুহূর্তে আর কোনও বিকল্পও নেই। সোমেনের কথা মতো তৃণমূলের সঙ্গে জোট করলে কংগ্রেসে ভাঙন আরও মসৃন হবে। তৃণমূলের সঙ্গে কংগ্রেসের আদর্শগত ফারাক তেমন নেই। তাই কংগ্রেস থেকে তৃণমূলে চলে যাওয়াটাও সহজ। সোমেনের এই যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতে পারত। ধান্ধাবাজির রাজনীতিতে দলবদলু হতে আদর্শ আর বাধা হয়ে দাঁড়ায় কিনা সে প্রশ্ন তোলা যেতে পারত। গত বিধানসভা নির্বাচনে বামেদের সঙ্গে জোট করে জিতে তৃণমূলে চলে গেছেন কংগ্রেসের এক গুচ্ছ বিধায়ক। আবার উল্টো দিকে সিপিএমের রেজ্জাক মোল্লা থেকে শুরু করে তাপস চট্টোপাধ্যায় ও অতি সম্প্রতি ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এখন তৃণমূলে শোভা পাচ্ছেন। না, রাজনৈতিক কোনও তর্ক মমতার পেটোয়া মহল তুলছে না। বরং নেহাৎ চায়ের দোকানের আড্ডার যুক্তির ওপরেই নির্ভর করে নিজেদের বক্তব্য সাজাচ্ছে এই প্রচারযন্ত্র । সোমেন সিপিএমের বি-টিম জাতীয় বস্তাপচা অভিযোগ নতুন করে তুলে ধরতে সক্রিয় হয়েছে মমতার অলিখিত প্রচার মেশিনারি। সোমেন-সুব্রতর বিরুদ্ধে এমন প্রচার আজকের নয়। প্রাতঃস্মরণীয় এক সাংবাদিকের হাত ধরে এই প্রচারের শুরু। সুব্রত মুখোপাধ্যায় এখন যেহেতু মমতার দিকে, তাই এখন তাঁকে আর এই চেনা আক্রমণের সম্মুখীন হতে হয়নি!
সোমেন চিরকালই বলে এসেছেন একটি জাতীয় দলের অনুশাসন মেনে রাজ্যে দল চালাতে গিয়ে যেভাবে যতটা করা গেছে তা তিনি বা তাঁরা করেছেন। মমতা নিয়মকানুন, জাতীয় রাজনীতির বাধ্যবাধকতা, এসবে গুরুত্ব দেননি। তিনি নিজের মতো চলেছেন। কোনও জাতীয় দলের রাজ্য শাখার দায়িত্বে থেকে মমতার স্টাইলে রাজনীতি করা কোনও দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন রাজনীতিকের পক্ষেই সম্ভব নয়। সে যে দলেরই হোক না কেন। নিয়মের বেড়াজালে থেকেও ১৯৯২ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত রাজ্যে ধারাবাহিক ভাল ফল করেছে কংগ্রেস। সোমেনের নেতৃত্বেই। পঞ্চায়েত থেকে শুরু করে বিধানসভা কংগ্রেসের ভাল ফলাফলে দল যখন বামেদের পতনের আঁচ পাচ্ছে, পরবর্তী নির্বাচনে জয়ের আশা করছে, তখনই ১৯৯৮ থেকে দলের ভাঙন প্রক্রিয়া শুরু ও ২০০০ সালে মমতার নতুন দল। মমতার ঘনিষ্ঠ, সদ্য প্রাক্তন রাজ্যসভার সাংসদ বলেন, এই ভাঙন বাম শাসনের আয়ু ১০ বছর বাড়িয়ে দিয়েছিল। ১৯৯৬ তে ৮৬ টা বিধানসভায় জয়ী হয়েছিল কংগ্রেস। আরও অনেক আসনে নাম মাত্র সংখ্যায় পিছিয়ে থেকে হেরেছিল। কোন সময় এমন ফলাফল? যে সময় বৈদ্যুতিন সংবাদমাধ্যমের এমন রমরমা ছিল না। তারা এত শক্তিশালী ছিল না। শক্তপোক্ত নির্বাচন কমিশন ছিল না। সিঙ্গুর বা নন্দীগ্রামও ছিল না। সেই সময়ের ভোটের লড়াইটা ছিল হেলমেট ছাড়া ডেনিস লিলির মুখোমুখি হওয়া গাওস্কারের সামিল! কিংবা হ্যারল্ড লারউডের বডি লাইন রুখে দেওয়া স্যর ডন ব্র্যাডম্যানের সমতুল! আপাত অসাধ্য কাজটা করে দেখিয়েছিলেন তথাকথিত সিপিএমের বি-টিমের সর্বাধিনায়ক সোমেন মিত্র।
এরপর শিয়ালদার বৈঠকখানা বাজারে কত লরি এসেছে ও গেছে। কালীঘাটে গঙ্গার খাল দিয়ে বয়ে গেছে কত জল। যে মহল তৃণমূলে যোগ দিয়ে সোমেনের সাংসদ হওয়াকে কটাক্ষ করতে চাইছে সে মহল ভুলে গেছে কিংবা চেপে যাচ্ছে মমতার সিঙ্গুর আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে বাস্তবিক রাজার মতো জীবনযাপনে অভ্যস্থ সোমেন টাটা প্রোজেক্টের সামনে দিনের পর দিন পড়ে ছিলেন রাস্তার ওপর। সে সময় আজ যাঁরা মমতার দলের ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মুখ তাঁরা আলগোছে আন্দোলনে থেকে নিজেদের আরামদায়ক জীবন বেছে নিয়েছিলেন। দলের বড় নেতা, যিনি আজ মন্ত্রীও বটে তিনি নিজের গাড়িতে বসে কুকিজ্ খেয়ে রাতের দিকে মমতার চোখের আড়াল হলে বাড়ি ফিরে যেতেন। আর একজন মমতার অতি ঘনিষ্ঠ নেতা ও মন্ত্রী (আর একটি পরিচয়ও আছে ) নিজের গাড়িতে সারা রাত এসি চালিয়ে জ্বালানীর শ্রাদ্ধ করে নিদ্রা যেতেন। সোমেন খড়ের বিছানায় শুয়ে গণ আন্দোলনে সামিল হতেন। আর সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পরেও যিনি একা নিজের টেন্টে জেগে বসে থাকতেন, তিনি মুকুল রায়।
সোমেন প্রথম তৃণমূলের মঞ্চে ওঠার আগে নিজের শক্তি দেখিয়েছিলেন শহীদ মিনার ভরিয়ে, ২০০৮ এর ২১শে এপ্রিল। ইন্দিরা কংগ্রেসের পক্ষে মমতার মঞ্চে উঠে বলেছিলেন, “যতদিন পর্যন্ত না মমতা রাইটার্সে পৌঁছয় ততদিন মমতার সঙ্গে আছি।” ছিলেনও। তৃণমূলে গিয়ে সোমেন ঠিক বা ভুল কি করেছিলেন তা নিয়ে আলোচনা হয়তো আজও হতে পারে রাজনৈতিক পর্যালোচনার খাতিরে। কিন্তু ফরমায়েশী প্রচারে পর্যালোচনা, সঠিক মূল্যায়ন, এসব আশা করা ভুল। এক্ষেত্রে বাবু যেমন চান বান্দা তেমন নাচেন! তৃণমূলে থাকাকালীন সোমেনই সেই সাংসদ যিনি চিটফান্ডের বিরুদ্ধে প্রথম মুখ খুলেছিলেন। তাঁর তৃণমূল জীবনে সরাসরি মমতার সঙ্গে কোনও সংঘাত হয়নি তাঁর। বা তিনি সংঘাতে যাননি। তৃণমূল ছেড়ে এসে আবার কংগ্রেসে ফিরেছিলেন। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে কলকাতা উত্তর থেকে লড়ে হেরেছিলেন। মমতার বর্ধিত প্রচার মহল সে কথা বিদ্রুপের সুরে প্রচারও করেছে। এক্ষেত্রেও যে কথাটি চেপে যাওয়া হয়েছে তা হল সেবারের নির্বাচনে বিরোধী প্রার্থীরা এক একটি বুথে এত কম ভোট পেয়েছিলেন যে নির্বাচন কমিশন বলতে বাধ্য হয়েছিল এই প্রকার প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা অস্বাভাবিক। সোমেনের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছিল।
সেইসব দিনও আজ অতীত। রাজ্যে এখন মাথা তুলেছে বিজেপি। এই পরিপ্রেক্ষিতে সোমেন রাহুলকে গিয়ে বলে এসেছেন জিততে চাইলে তৃণমূল , দল বাঁচাতে চাইলে বাম। আর বলেছেন মমতার কংগ্রেস ভাঙানোর কাহিনী।
সে কাহিনী রাহুলের কী অজানা! মোদি নিধনের মরিয়া চেষ্টার মধ্যে রাহুল কী চাইবেন এখনই মমতাকে চটাতে! এসব প্রশ্নের উত্তর সময়ে পাওয়া যাবে। আপাতত প্রশ্ন হচ্ছে নতুন করে সোমেনের ওপর কেন চটল মমতার বর্ধিত প্রচার মহল! দল হিসেবে কংগ্রেস নয়, ব্যক্তি সোমেনের পুনরুত্থান কী কোথাও পরিলক্ষিত হল! অন্তত তার সামান্যতম আভাসটুকুও! সোমেনকে খুব গুরুত্বহীন ভাবেই দেখিয়েছে মমতার প্রচার যন্ত্র। প্রশ্ন উঠেছে এ হেন গুরুত্বহীনের জন্য এত শব্দ খরচ কেন? তাহলে কী রাজ্য রাজনীতির আকাশে, কোনও এক কোণে, কেউ সিঁদুরে মেঘ দেখছে! কংগ্রেসের অনেক নেতা তৃণমূলের পকেটে ঢুকলেও এখনও বহু কর্মী সমর্থক আছেন যাঁরা লড়তে চান। হারেন বা জেতেন, অন্তত তৃণমূলের সঙ্গে লড়ার গৌরবটুকু পেতে চান তাঁরা। যে অস্ত্রে তৃণমূল কাটবে সেই অস্ত্রেই ধার দেব। এমন মনোভাব ইতিমধ্যেই ছেয়ে গেছে কংগ্রেস কর্মী সমর্থকদের একটি বড় অংশে।
ব্যক্তি সোমেন এই অংশকে সঙ্গী করে যদি সত্যিই যে অস্ত্রে তৃণমূল কাটবে সেই অস্ত্রে শাণ দেন! এমন আশঙ্কাতেই কী রৈ রৈ করে কলম চালাচ্ছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বর্ধিত প্রচার কমিটি!
বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
https://www.youtube.com/channelhindustan
https://www.facebook.com/channelhindustan
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news