সৈকত ঘোষ:
সিনেমা:বুড়ো সাধু
অভিনয়ে: ঋত্বিক চক্রবর্তী, চিরঞ্জিৎ, ইশা সাহা, মিশমি দাস, অমিত সাহা
পরিচালনা: ভিক
দেখা এবং না দেখার মধ্যে একটা রহস্যময় দূরত্ব থাকে। সিলভার লাইন ক্রস করলে বোঝা যায় কীভাবে জীবন নির্ভেজাল শিকারি হয়ে ওঠে। শিকার সে নিজেই। মুহূর্ত জুড়ে জুড়ে তৈরি হয় না লেখা শিরোনাম। এভাবেই ছেঁড়া ছেঁড়া অতীত গুলে নেয় প্রেজেন্ট কন্টিনিউয়াস। এভাবেই অজান্তে একটা সম্পর্ক থেকে আর একটা সম্পর্কে, এক অন্ধকার থেকে আর একটা অন্ধকারে ঢুকে যাই আমরা। আলো-অন্ধকার, অন্ধকার-আলো চেসবোর্ডে মুখোমুখি যেন! এবং আয়না খুলে রাখে নিজের মুখোশ। ডুবতে ডুবতে, ভাসতে ভাসতে, ধাক্কা খেতে খেতে এক সময় সব থিতিয়ে যায়। প্রতিটা হেরে যাওয়া জন্ম দেয় চিরহরিৎ আলোর। কে বলেছে পৃথিবী থেকে জোনাকিরা হারিয়ে গেছে! এখনও কিছু মানুষ স্বপ্ন দেখে, স্বপ্ন দেখাতে পারে। ঘষা কাচের ওপারে জমাট বাঁধে দানা দানা স্বপ্ন। আর এখান থেকেই জন্ম নেয় ‘বুড়ো সাধু’র গল্প।

এ ছবির পরতে পরতে লেপটে আছে মধ্যবিত্ত জীবনের আলো-বাতাস। আবীর (ঋত্বিক চক্রবর্তী)-কে ঘিরে এ ছবির গল্প এগোয়, সময়ের সানগ্লাসে ফ্যাকাশে হয় অতীত। বাবা-মার সম্পর্কের সমীকরণ, সেখান থেকে সব ছেড়ে ভাঙা আয়নার মতো দাদুর বাড়িতে বেড়ে ওঠা তারপর বদলে যাওয়া ক্যানভাসে বদলে যায় চেনা সম্পর্কের রং। পুরনো আসবাবের মতো পুরনো বাবাকে রিপ্লেস করে মায়ের নতুন স্বামী।
‘বুড়ো সাধু’ আসলে বিষাদের আরশি নগর। যেখানে আবীরের শৈশব ঝিরঝিরে ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট টিভির মতো মাঝে মাঝে এক অদ্ভুত হ্যালুসিনেশন সবকিছু ঘেঁটে দেয়। আবীর নিজের মধ্যে নিজেকে ভাঙতে থাকে। ছিপি খোলে বোতলবন্দি মনখারাপ। নীলাঞ্জনার (মিশমি দাস) সঙ্গে তার ব্যর্থ প্রেম এবং অবশ্যই প্রতারণা—কোথাও গিয়ে চেনা ফ্রেমে জানা জীবনের গল্পই। তবু, বন্ধু বাঞ্ছার (অমিত সাহা) উপস্থিতি আবীরের জীবনের গতিপথ বদলায়। এরপর আবীরের নিশ্বাসে ঢুকে পড়ে মেগাসিরিয়াল। ছেঁড়া ছেঁড়া স্বপ্নেরা আবার জমাট বাঁধতে শুরু করে। আলো জ্বলে ওঠে ফ্রেমে। আর এই আলোর মতোই আবীরের জীবনে এসেছে শ্বেতা (ইশা সাহা)। যার উপস্থিতি হয়ে ওঠে নিরাময়। ক্ষতচিহ্নে ভালোবাসার প্রলেপ পরে। অনুভবে বেজে ওঠে ধ্রুপদী পূর্বরাগ। কিন্তু বাস্তব চেসবোর্ডের মতো, পলকে বদলে যায়। একদিকে রিয়ালিটির চার দেয়াল, অন্যদিকে ভুলে থাকার প্রবল চেষ্টা, এই আলো-অন্ধকার সেল্ফ ডেস্ট্রাকশনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মুদ্রার একদিকে সাফল্য অন্যদিকে মৃত্যু, একদিকে প্রেম অন্যদিকে ডিপ্রেসন— গোটা ছবি জুড়ে লতায় পাতায় এক অব্যর্থ আচ্ছন্ন কাহিনি বোনেন পরিচালক। শেষ পর্বে চিরঞ্জিতের উপস্থিতি যেন মহেন্দ্র সিংহ ধোনির ফিনিশিং টাচ! ক্যামিও হলেও শেষ বলে ছয়টা কিন্তু মেরেছেন চিরঞ্জিৎই।

অমিত সাহা এবং ইশা সাহার অভিনয় মনে দাগ কাটার মতো। এ ছবির অলিন্দ যদি হন ঋত্বিক চক্রবর্তী তবে নিলয় অবশ্যই পরিচালক ভিক। দুজনেই একে অন্যকে দারুণ ভাবে কমপ্লিমেন্ট করেছেন। তাদের কমরেডশিপ তারিফযোগ্য। প্রথম ছবিতেই ভিক বুঝিয়ে দিয়েছেন তিনি লম্বা রেসের ঘোড়া।
ক্যামেরায় সঞ্জীব ঘোষ এবং সম্পাদনায় অর্ঘ্যকমল মিত্রকে চোখ বুজে লেটার মার্কস দেওয়া যায়। প্রাঞ্জল দাসের সুর ছবির জন্য মানানসই। তিমির বিশ্বাসের গলায় ‘নয়ন তোমার’ গানটি শুনতে শুনতে গায়ে কাঁটা দেয়। এ গানের মায়াবী পিকচাররাইজেশনটিও অনবদ্য। তিমিরের এই গান বারবার শুনতে ইচ্ছে করে।
এক কথায় ‘বুড়ো সাধু’ হচ্ছে যন্ত্রণার মায়াবী পালক। যার অ্যালগোরিদম দর্শককে ধাক্কা দেয়, চশমায় লেগে থাকে মন কেমনের অক্ষর!
………………….
সৈকত ঘোষ ‘কলকাতার সেলফি’, ‘জরাসন্ধের বিছানা’ সহ একাধিক বই লিখেছেন। পেশায় শিক্ষক। ইন্ডাস্ট্রির পরিচিত মুখ। স্ক্রিপ্ট ও লিরিক রাইটার। নিয়মিত ভাবে বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় সিনেমা নিয়ে লেখালিখি করে থাকেন। পছন্দ—জীবনকে নানা আঙ্গিকে খুঁজে বেড়ানো। নেশা—কবিতা এবং সিনেমা।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news