পার্থসারথি পাণ্ডা:
ফরাসি চলচ্চিত্র পরিচালক জর্জ মিলিয়ে উদ্ভাবন করেছিলেন সিনেমাশিল্পের ট্রিক ফটোগ্রাফি আর স্পেশ্যাল এফেক্ট। তাঁর উদ্ভাবনী প্রতিভার পথ ধরেই সিনেমায় এলো ম্যাজিক। তিনি ১৯০২তে সেই ম্যাজিক দেখালেন ‘এ ট্রিপ টু দ্য মুন’ ছবিতে। নির্বাক স্বল্পদৈর্ঘ্যর এই ছবিতে তিনি ঘটিয়েছিলেন ড্রামা ও ফ্যান্টাসির এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন। এতেই মুগ্ধ হয়েছিল বিশ্বের তাবৎ সিনেমাপ্রেমীরা, সেইসঙ্গে এই ছবির মধ্য দিয়েই ক্যামেরার মাধ্যমে কী করে গল্প বলতে হয়, তাও তিনি শিখিয়ে দেন নানান দেশের ছবি করিয়েদের।
মিলিয়ের এই ছবি বানানোর দশ বছর পর ভারতে তৈরি হল দেশের প্রথম চলচ্চিত্র। তাতেও কিন্তু ওই ট্রিক ফটোগ্রাফি আর স্পেশ্যাল এফেক্টের ম্যাজিক দেখা গেল, পাওয়া গেল একটি নিটোল গল্প। ছবিটি বানালেন নাসিকের এক মারাঠি ভদ্রলোক, নাম ধুন্দিরাজ গোবিন্দ ফালকে। লোকে অবশ্য তাঁকে দাদা সাহেব ফালকে নামেই চেনে বেশি। ফালকে মিলিয়ের ছবি দেখেছিলেন কিনা জানিনা, তবে তিনি যে ‘ দ্য লাইফ অব জিসাস ক্রাইস্ট’ ছবিটি দেখেছিলেন, সে কথা অবশ্য জানা যায়। ছবিতে যিশুর জীবনককাহিনী দেখে তাঁর ইচ্ছে জাগে ভারতীয় পুরাণকাহিনী সিনেমার পরদায় তুলে ধরার। তিনি যে যিশুর কাহিনীনির্ভর ছবিটি দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন, সেটি ছিল একটি ফরাসি ছবি, মুক্তি পেয়েছিল ১৯০৩ সালে।
যাইহোক, ছবি বানানোর কথা যখন ফালকে ভাবছেন, তখন তাঁর কাজ কর্মের অবস্থা খুবই বেহাল। ছবি আকা শেখানো, ড্রাফটসম্যানের কাজ, প্রিন্টিংএর ব্যবসা সব লাটে উঠে গেছে তখন, হাতে পড়ে আছে সামান্য কটা টাকা। সে কটা টাকা সম্বল করেই ১৯১২-তে সিধে ইওরোপ পাড়ি দিলেন। ফিরলেন একখানা ক্যামেরা, কিছু র ফিল্ম এবং আরও কিছু যন্ত্রপাতি নিয়ে। তাতেই তাঁর পুঁজি যা ছিল শেষ হয়ে গেল। বিদেশে যাবার আগে অবশ্য আত্মীয়স্বজনেরা পইপই করে বারণ করেছিল, বাধা দিয়েছিল তাঁকে। কিন্তু অসম্ভব জেদি মানুষ ফালকে তাদের কথা কানে তোলার লোকই ছিলেন না। সত্যি বলতে কি, এই সময় তাঁর ছবি বানানোর ব্যাপারে কোন ধারণাই ছিল না। তবু এই কাজে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন শুধুমাত্র তাঁর ওই অসম্ভব জেদের বশেই। তবে এই সিনেমা বানানোর স্বপ্নের পথে তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁর স্ত্রী।
স্ত্রী তাঁর সমস্ত গয়না নির্দ্বিধায় তুলে দিয়েছিলেন ফালকের হাতে। কারণ, ক্যামেরা কেনার পর ফালকের হাতে আর কিছুই ছিল না, যা সম্বল করে তিনি শ্যুটিং এ নামতে পারেন। গয়না বিক্রি করেও এমন কিছু টাকা পাওয়া গেল না, যা দিয়ে শ্যুটিং শুরু করা যায়। তাই সিনেমা বানানোর জন্য টাকা দেবে এমন লোকের সন্ধান করতে বিদেশ থেকে কিনে আনা ফিল্মে তিনি ডেলি লাইফের ফুটেজ তুলে বেশ কয়েকজন মহাজনকে দেখালেন। ফুটেজ দেখে তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ রাজি হলেন ফালকের ছবিতে টাকা ঢালতে। ফলে শুরু হল শ্যুটিং। নির্মিত হল চলচ্চিত্র ‘রাজা হরিশ্চন্দ্র’। সালটা ১৯১৩। এবছরই এক বাঙালি দেশকে প্রথম নোবেল পুরস্কার এনে দিয়েছিলেন, আর এক মারাঠি দেশের মাটিতে প্রথম সম্পূর্ণ চলচ্চিত্র সৃষ্টি করেছিলেন। ভারতীয় চলচ্চিত্রের এই পথপ্রদর্শক ও জনক দাদাসাহেব ফালকের আজ জন্মদিন।

ফালকের ছবি ‘রাজা হরিশ্চন্দ্র’ প্রথম মুক্তি পেয়েছিল ১৯১৩-র এপ্রিল মাসে বম্বের করোনেশন সিনেমাহলে। মুক্তির অল্পদিনের মধ্যেই দর্শকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠল ছবিটি। এতে দাদাসাহেব যেমন ছবি নির্মাণে উত্সাহী হলেন, তেমনি দেশের আরও অনেকেই এগিয়ে এলেন চলচ্চিত্রনির্মাণের পথে। এখান থেকেই ধীরে ধীরে চলচ্চিত্র হয়ে উঠল চলচ্চিত্রশিল্প— আর্ট ও ইন্ডাস্ট্রি দুই অর্থেই।
বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
https://www.youtube.com/channelhindustan
https://www.facebook.com/channelhindustan
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news