বিভাস রায়চৌধুরী
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী সেই বিরল জাতের কবি, যাঁর কবিতা অসম্ভব জনসংযোগ গড়ে তুললেও তা কখনও বিশুদ্ধ কাব্যধর্ম থেকে বিচ্যুত হয়নি। বিষয়টি খেয়াল করার মত। এই প্রসঙ্গে আরও কিছু বলার আছে, তবে তার আগে একটা সৌভাগ্যের কথা না বললেই নয়। ‘কলকাতার যিশু’র কবি দীর্ঘায়ু হওয়ায় আমাদের বিশেষ লাভ হয়েছে। এর ফলে আমরা, পরবর্তী প্রজন্ম তাঁকে কাছ থেকে পেয়েছি। দেখেছি, শুনেছি। সামনে থেকে এমন এক মহৎ কবির কবিতাপাঠ ও প্রজ্ঞাময় বক্তৃতা শোনার ভাগ্য সব সময় হয় না।
একথা সকলেই জানেন যে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ছিলেন ছন্দের মাস্টার। সেই তিনি-ই সহজ গদ্য ভাষায় কী অসামান্য সব কবিতা লিখেছেন! এই কথাটি-ই বলবার— যে ‘উলঙ্গ রাজা’, ‘অমলকান্তি’র মতো তাঁর বহু কবিতা একদিকে যেমন মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে, তেমনি তিনি নিটোল কবিতাই লিখেছেন, কবিতার মান বজায় রেখেছেন আজীবন। ব্যক্তিগতভাবে বলব, আর পাঁচজন নাগরিক কবির মতো নাক-উঁচু ছিলেন না নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। একথা বলতে পারছি কমবেশি তাঁর সান্নিধ্য পেয়েছি বলেই। দেখেছি আমরা যারা কলকাতা থেকে দূরে থাকি। যারা ‘প্রান্তের’ কবি তাদের সঙ্গে এই কবি কোনওরকম ব্যবধান রেখে মিশতেন না কখনওই। মেকি আভিজাত্যের মোড়কে ঢেকে রাখতেন না নিজেকে।
আমার মনে হয়, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর একের পর এক অবিস্মরণীয় কবিতা তথা কবিতা-পংক্তি রচনার পেছনের কারণ, চারপাশটার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক। সমাজ, সভ্যতা, সর্বোপরি মানুষের সঙ্গে এই কবির চূড়ান্ত আন্তরিক সংযোগ ছিল। তাই খেটে খাওয়া, ছাপোষা মানুষের সহজ ও জটিল মনস্তত্ব ব্যঞ্জনাময় ভাষায় ধরা দিল তাঁর কাব্যে। মনে রাখতে হবে, এই কবিই কিন্তু ব্যাকরণ শিক্ষিত। শাস্ত্রীয় শিক্ষায় শিক্ষিত মননের অধিকারি। তথাপি কবিতা লেখার সময়ে তিনি তাঁর পাণ্ডিত্য বা ব্যাকরণ শিক্ষাকে কবিতার পিঠে চেপে বসতে দেননি। মনে হয়, কবিতা লেখার সময় অন্তরচর্চাকেই অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন কবি। তা-ই হয়তো প্রকৃত কবির ধর্ম।
শেষে আরেকটি বিষয় না বললেই নয়, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী কবিতা অতি অতি অতি জনপ্রিয় হওয়া সত্ত্বেও, তাঁর অনেকানেক কবিতা দুর্দান্ত জনসংযোগ তৈরি করলেও তা মুহূর্তের স্ফুলিঙ্গ হয়ে হারিয়ে যায়নি। অনেকের কবিতা নিয়ে একটা সময় খুব হইচই হয়েছে। তারপর একদশক কাটতে না কাটতেই সেই কবি ও কবিতাকে নির্মম পাঠকের স্মৃতি মুছে ফেলেছে। সেখানে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কবিতা আজ ৩০, ৪০, ৫০ বছর পরও একইরকম জনপ্রিয়। আজও বাঙালির প্রিয় কবিতার তালিকায় রয়েছে তাঁর একাধিক কবিতা। এই কাজ কঠিন। সবার দ্বারা সম্ভব নয়।

উলঙ্গ রাজা
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
সবাই দেখছে যে, রাজা উলঙ্গ, তবুও
সবাই হাততালি দিচ্ছে।
সবাই চেঁচিয়ে বলছে; শাবাশ, শাবাশ!
কারও মনে সংস্কার, কারও ভয়;
কেউ-বা নিজের বুদ্ধি অন্য মানুষের কাছে বন্ধক দিয়েছে;
কেউ-বা পরান্নভোজী, কেউ
কৃপাপ্রার্থী, উমেদার, প্রবঞ্চক;
কেউ ভাবছে, রাজবস্ত্র সত্যিই অতীব সূক্ষ্ম, চোখে
পড়ছে না যদিও, তবু আছে,
অন্তত থাকাটা কিছু অসম্ভব নয়।
গল্পটা সবাই জানে।
কিন্তু সেই গল্পের ভিতরে
শুধুই প্রশস্তিবাক্য-উচ্চারক কিছু
আপাদমস্তক ভিতু, ফন্দিবাজ অথবা নির্বোধ
স্তাবক ছিল না।
একটি শিশুও ছিল।
সত্যবাদী, সরল, সাহসী একটি শিশু।
নেমেছে গল্পের রাজা বাস্তবের প্রকাশ্য রাস্তায়।
আবার হাততালি উঠছে মুহুর্মুহু;
জমে উঠছে
স্তাবকবৃন্দের ভিড়।
কিন্তু সেই শিশুটিকে আমি
ভিড়ের ভিতরে আজ কোথাও দেখছি না।
শিশুটি কোথায় গেল? কেউ কি কোথাও তাকে কোনো
পাহাড়ের গোপন গুহায়
লুকিয়ে রেখেছে?
নাকি সে পাথর-ঘাস-মাটি নিয়ে খেলতে খেলতে
ঘুমিয়ে পড়েছে
কোনো দূর
নির্জন নদীর ধারে, কিংবা কোনো প্রান্তরের গাছের ছায়ায়?
যাও, তাকে যেমন করেই হোক
খুঁজে আনো।
সে এসে একবার এই উলঙ্গ রাজার সামনে
নির্ভয়ে দাঁড়াক।
সে এসে একবার এই হাততালির ঊর্ধ্বে গলা তুলে
জিজ্ঞাসা করুক:
রাজা, তোর কাপড় কোথায়?
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news